নীল নির্জন সমুদ্র, স্ফটিকের মতো স্বচ্ছ পানি আর রুপালি বালুচর। চোখ বন্ধ করে আপনি যদি এই দৃশ্য কল্পনা করেন, তাহলে মনের অজান্তে মাথায় আসবে একটি দেশের নাম—মালদ্বীপ। তবে ভ্রমণবিলাসীদের সেই চিরচেনা ধারণাকে একেবারে বদলে দিতে লোহিতসাগরের বুকে গড়ে উঠছে এক অবিশ্বাস্য রূপকথার রাজ্য। এটি হলো সৌদি আরবের দ্য রেড সি প্রজেক্ট।
দেশটির পশ্চিমাঞ্চলীয় উপকূলে প্রায় ২৮ হাজার বর্গকিলোমিটার এলাকাজুড়ে বিস্তৃত এই বিলাসবহুল পর্যটনকেন্দ্র মূলত এক নতুন আন্তর্জাতিক মানদণ্ড তৈরি করতে যাচ্ছে। বহির্বিশ্বের কাছে এটি শুধু একটুকরো দ্বীপের মতো মনে হলেও এর ভেতরে লুকিয়ে আছে নানা ধরনের বৈচিত্র্য—৯০টির বেশি প্রাকৃতিকভাবে গড়ে ওঠা দ্বীপ, দিগন্তজোড়া মরুভূমি, সুউচ্চ পর্বতমালা এবং সুপ্ত আগ্নেয়গিরি।
মালদ্বীপের সঙ্গে দ্য রেড সির মিল শুধু নীল পানি আর বালুচরেই শেষ। তবে রেড সি গ্লোবালের ডেভেলপমেন্ট হেড স্টিফেন চিজব্রোর মতে, ভৌগোলিক বৈচিত্র্যই এই প্রকল্পকে পৃথিবীর আর দশটি বিলাসবহুল দ্বীপ থেকে আলাদা করে তুলেছে। এখানে সূর্য ওঠার সঙ্গে সঙ্গে লোহিতসাগরের প্রবাল প্রাচীরের মাঝে স্কুবা ডাইভিং করে কাটাতে পারেন। একই দিনের বিকেলে পাড়ি জমাতে পারেন ধু ধু মরুভূমির বালিয়াড়িতে। আর দিন শেষে পাহাড়ি চূড়ায় মেঘের ঘ্রাণ নিয়ে সারতে পারেন রাজকীয় নৈশভোজ। খুব কম আন্তর্জাতিক গন্তব্যই একই সীমানায় এত বৈচিত্র্যময় অভিজ্ঞতার সুযোগ এনে দেয়।
মধ্যপ্রাচ্যের তাপমাত্রার কারণে এটি শুধু শীতকালীন গন্তব্য। কিন্তু বছরজুড়ে ১২ মাসই যেন দেশি-বিদেশি পর্যটকেরা এখানে আসতে পারেন, সেভাবেই জায়গাটি প্রস্তুত হচ্ছে। পর্যটকদের যাতায়াত সহজ করতে ইতিমধ্যে চালু হয়েছে রেড সি আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর। ২০৩০ সালের লক্ষ্য অনুযায়ী, এখানে মোট ৫০টি বিলাসবহুল রিসোর্ট, ৮ হাজার হোটেল রুম এবং ১ হাজারের বেশি রাজকীয় বাসস্থান থাকবে। বছরে প্রায় ১০ লাখ পর্যটককে সেবা দিতে এগুলো প্রস্তুত করা হচ্ছে।
বিলাসবহুল রিসোর্ট মানেই পরিবেশের ক্ষতি। এই ধারণাকে সম্পূর্ণ ভুল প্রমাণ করছে প্রজেক্টটি। শুধু পরিবেশ রক্ষা নয়, বরং পরিবেশের মান আরও উন্নত করার রিজেনারেটিভ ট্যুরিজম নীতি বেছে নিয়েছে। ৯০টির বেশি দ্বীপ থাকলেও কঠোর নিয়ম মেনে শুধু ২২টি দ্বীপে অবকাঠামো নির্মাণের অনুমতি দেওয়া হয়েছে। বাকি সব দ্বীপ প্রকৃতি ও সামুদ্রিক জীববৈচিত্র্যের জন্য সংরক্ষিত। পুরো কমপ্লেক্স ও হোটেলগুলো পরিচালিত হবে শতভাগ সৌরশক্তিতে। বর্জ্য পানি পুনর্ব্যবহার এবং পরিবেশদূষণ শূন্যে নামিয়ে আনার প্রযুক্তি ব্যবহৃত হচ্ছে এই প্রকল্পে।
এই প্রজেক্টের মূল কেন্দ্রবিন্দু শুরা আইল্যান্ড। এটি বর্তমানে ১১টি বিশ্বমানের হোটেল পর্যটকদের আতিথেয়তা দিতে প্রস্তুত। সেখানে আন্তর্জাতিক বুটিক শপ, আধুনিক মেরিনা, রেস্তোরাঁ ও ১৮ হোলের চ্যাম্পিয়নশিপ গলফ কোর্সের ব্যবস্থা থাকছে। রোমাঞ্চপ্রিয়দের জন্য তৈরি হচ্ছে অ্যাড্রেনা ডিস্ট্রিক্ট। সেখানে দেশটির বড় সামুদ্রিক সার্ফ পুলসহ ২০টির বেশি ওয়াটার স্পোর্টস ও ট্রেকিংয়ের সুযোগ থাকবে। তবে এটিকে শুধু রিসোর্টে বন্দী থাকার জায়গা হিসেবে দেখা হচ্ছে না, বরং এটি হতে যাচ্ছে পুরো সৌদি আরব আবিষ্কারের এক উন্মুক্ত দুয়ার। এখান থেকে সহজে ঘুরে আসা যাবে জেদ্দা বা ঐতিহাসিক আল-উলা শহর।
সূত্র: ইউরো নিউজ