ঝরনা কিংবা জলপ্রপাতের কথা ভাবলেই আমাদের চোখের সামনে ভেসে ওঠে বিশাল কোনো পাহাড়—যার ওপর থেকে ঝরে পড়ছে পানির অবিরল স্রোতোধারা। কিন্তু এই স্রোতোধারা পানির না হয়ে যদি আগুনের হয়!
এমন দৃশ্য অনেকের কাছেই অবিশ্বাস্য মনে হতে পারে। কিন্তু বাস্তবে প্রতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে এই দৃশ্যের দেখা মেলে যুক্তরাষ্ট্রের ক্যালিফোর্নিয়ার ইয়োসেমিত ন্যাশনাল পার্কে। তবে তা মাত্র কয়েক মিনিটের জন্য। শীতের শেষে প্রকৃতি যেন নিজেই তৈরি করে অতিলৌকিক এক ইলিউশন, যার নাম—ইয়োসেমিত ফায়ারফল।
আছে এক রহস্য
আগুনঝরা এই জলপ্রপাতের রহস্য নিয়ে ‘ন্যাশনাল জিওগ্রাফিক’ লিখেছে—ইয়োসেমিত ন্যাশনাল পার্কে রয়েছে ‘এল ক্যাপিটান’ নামে বিশাল এক গ্রানাইট প্রাচীর। এই প্রাচীরেরই এক কোণে রয়েছে ‘হর্সটেইল ফল’ নামে এক জলপ্রপাত। প্রতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে সূর্যাস্তের সোনালি আভা এসে পড়ে এল ক্যাপিটান-এর গায়ে। সেই আভায় আগুনের মতো ঝলসে ওঠে ‘হর্সটেইল ফল’ হয়ে যায় ‘ইয়োসেমিত ফায়ারফল’। এই দৃশ্যটিই দূর থেকে দেখে মনে হয়, পাহাড়ের বুক বেয়ে নেমে আসছে গলিত লাভা বা আগুনের এক নদী।
অবিশ্বাস্য এই দৃশ্যটি পুরোপুরি নির্ভর করে কয়েকটি প্রাকৃতিক শর্তের ওপর—যেমন পর্যাপ্ত তুষারগলন, পরিষ্কার আকাশ এবং সূর্যের নির্দিষ্ট কোণ। সিয়েরা নেভাদা পর্বতমালার চূড়ায় জমে থাকা বরফ গলতে শুরু করলেই পানি নেমে আসে নিচে। আর নির্দিষ্ট কোণ থেকে প্রতিদিন মাত্র ১০ মিনিটের জন্য সূর্যাস্তের আলো এমনভাবে পড়ে যে, জলপ্রপাতটি আগুনের মতো জ্বলজ্বল করে ওঠে। সূর্য দিগন্তে হারিয়ে গেলে সেই জাদুও মিলিয়ে যায়।
এই বছর অর্থাৎ ২০২৬ সালে আগুনঝরনা দেখার সম্ভাব্য সেরা সময় ধরা হয়েছিল ১০ থেকে ২৬ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত। তবে ভারী তুষারপাত ও প্রতিকূল আবহাওয়া এবার কিছুটা বিঘ্ন ঘটিয়েছে। বাংলাদেশ থেকে কেউ যুক্তরাষ্ট্র ভ্রমণে গেলে এবং ইয়োসেমিতের আগুনঝরনা দেখতে চাইলে সম্ভাব্য এই সময়টিকে মাথায় রাখা উচিত।
এক আলোকচিত্রে বিশ্বজোড়া খ্যাতি
প্রাকৃতিক এই ঘটনা হাজার বছর ধরেই ঘটে আসছে। তবু ১৯৭৩ সালেই প্রথমবারের মতো বন্যপ্রাণ আলোকচিত্রী গ্যালেন রোয়েল-এর তোলা একটি ছবি ইয়োসেমিত ফায়ারফলকে বিশ্বজুড়ে পরিচিতি এনে দেয়। তাঁর ক্যামেরাবন্দী আগুনঝরনা ছড়িয়ে পড়ে সংবাদমাধ্যমে এবং রাতারাতি এই জলপ্রপাত ফটোগ্রাফারদের স্বপ্নের দৃশ্যে পরিণত হয়।
এখন প্রতি ফেব্রুয়ারিতেই হাজার হাজার পেশাদার ও শৌখিন আলোকচিত্রী ছুটে যান সেই কাঙ্ক্ষিত মুহূর্তটি ক্যামেরায় বন্দী করতে।
এই দৃশ্য দেখার জন্য সাধারণত আলাদা কোনো রিজার্ভেশনের প্রয়োজন পড়ে না। তবে প্রস্তুত থাকতে হয় ঠান্ডা আবহাওয়া, দীর্ঘ হাঁটা এবং অপেক্ষার জন্য।
ইয়োসেমিতের ফায়ারফল আমাদের মনে করিয়ে দেয়, প্রকৃতির সবচেয়ে জাদুকরী দৃশ্যগুলো কখনো কখনো সৃষ্টি হয় আলো, পানি আর সময়ের নিখুঁত সমন্বয়ে। কয়েক মিনিটের সেই সোনালি আগুন যেন আমাদের শেখায়, সৌন্দর্য কখনো স্থায়ী নয়—তাই তাকে দেখার মুহূর্তটুকুই সবচেয়ে মূল্যবান।