অ্যাডভেঞ্চার বললেই একসময় চোখের সামনে ভেসে উঠত শেকলটন, হিলারি কিংবা চ্যাটউইনের মতো পুরুষ অভিযাত্রীদের মুখ। কিন্তু বর্তমান যুগে সেই সংজ্ঞা আমূল বদলে দিচ্ছেন একদল সাহসী নারী। তাঁরা কেবল রেকর্ড গড়ার জন্যই দুর্গম পথ পাড়ি দিচ্ছেন না, বরং তাঁদের প্রতিটি অভিযানের পেছনে রয়েছে নির্দিষ্ট উদ্দেশ্য, মানসিক দৃঢ়তা এবং পরিবেশ রক্ষার অঙ্গীকার।
এখানে সাতজন অদম্য নারীর গল্প বলা হয়েছে, যাঁরা বর্তমানে বিশ্বজুড়ে অ্যাডভেঞ্চারের সীমানা নতুন করে নির্ধারণ করছেন। এই সাতজন নারী প্রমাণ করেছেন, অ্যাডভেঞ্চার কেবল পতাকা ওড়ানো নয়। বরং এর পেছনে থাকা দর্শন এবং পরিবেশের ওপর ইতিবাচক প্রভাব হলো আসল উদ্দেশ্য। তাঁদের এই যাত্রা ভবিষ্যৎ প্রজন্মের হাজার হাজার নারীকে অজানা জানার অনুপ্রেরণা জোগাবে।
খাড়া পাহাড়ের নির্ভীক আরোহী হ্যাজেল
যুক্তরাজ্যের অন্যতম সফল রক ক্লাইম্বার হ্যাজেল ফিনলে। তিনি বিশেষ করে ট্রেড ক্লাইম্বিং বা প্রথাগত আরোহণে বিশ্বজুড়ে সমাদৃত। ২০১১ সালে তিনি প্রথম ব্রিটিশ নারী হিসেবে ই৯ গ্রেডের একটি অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ রুট আরোহণ করে ইতিহাস গড়েন। পরবর্তী সময়ে তিনি এ৯ গ্রেডের পর্বত আরোহণ করেন, যা ছিল সে সময়ের কঠিনতম চ্যালেঞ্জগুলোর একটি। তিনি চারবার ইয়োসেমাইট ন্যাশনাল পার্কের বিখ্যাত এল ক্যাপিটান পাহাড়ের চূড়ায় কোনো যান্ত্রিক সাহায্য ছাড়া আরোহণ করেছেন। পর্বতারোহণের পাশাপাশি তিনি স্ট্রং মাইন্ড নামে একটি প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলেছেন, যা পর্বতারোহীদের ভয় জয় করতে এবং মানসিক স্থিতিস্থাপকতা বাড়াতে প্রশিক্ষণ দেয়।
মরুভূমিতে হাঁটা অ্যালিস মরিসন
অ্যালিস মরিসন সম্প্রতি এক ইতিহাস গড়েছেন। তিনি প্রথম ব্যক্তি হিসেবে সৌদি আরবের উত্তর প্রান্ত থেকে দক্ষিণ প্রান্তে হেঁটে পাড়ি দেওয়ার রেকর্ড গড়েছেন। ১১২ দিনে তিনি ২ হাজার ১৯৫ কিলোমিটার পথ অতিক্রম করেছেন, যা প্রতিদিন গড়ে প্রায় অর্ধেক ম্যারাথনের সমান। এই দীর্ঘ পথে তিনি ধূলিঝড় এবং প্রতিকূল আবহাওয়া মোকাবিলা করে প্রাচীন শিলালিপি ও পাথরের সমাধি দেখেছেন। তিনি প্রথম নারী হিসেবে মরক্কোর ড্রা নদীর উৎস থেকে মোহনা পর্যন্ত হাঁটেন এবং কায়রো থেকে কেপটাউন পর্যন্ত ১২ হাজার কিলোমিটার সাইকেল চালিয়েছেন। তাঁর অভিযানের মূল লক্ষ্য হলো, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবগুলো নিজের চোখে দেখা এবং স্থানীয় মানুষের গল্পগুলো বিশ্ববাসীর কাছে তুলে ধরা।
পরিবেশ রক্ষায় লিজি কার
২৬ বছর বয়সে ক্যানসারে আক্রান্ত হওয়ার পর সুস্থতার অংশ হিসেবে লিজি কার প্যাডেল বোর্ডিং শুরু করেন। ২০১৬ সালে তিনি প্রথম ব্যক্তি হিসেবে ইংল্যান্ডের ৪০০ মাইল দীর্ঘ জলপথ একা পাড়ি দেওয়ার রেকর্ড গড়েন। ২০১৭ সালে তিনি প্রথম নারী হিসেবে প্যাডেল বোর্ডে ইংলিশ চ্যানেল পার হন। তাঁর প্রতিটি অভিযানের একটি মহৎ উদ্দেশ্য থাকে। ইংল্যান্ডের জলপথ ভ্রমণের সময় তিনি ২০ হাজার প্লাস্টিক বর্জ্য নথিবদ্ধ করেছিলেন। এর ফলে তিনি প্ল্যানেট প্যাট্রল নামক একটি অলাভজনক সংস্থা গঠন করেন। এর মাধ্যমে বর্তমানে ৯৮টি দেশের হাজার হাজার স্বেচ্ছাসেবক পরিবেশ থেকে প্লাস্টিক বর্জ্য সরাতে কাজ করছে। ২০২১ সালে পরিবেশগত কাজের জন্য তিনি এমবিই খেতাব পান।
সুমেরু বৃত্তের আলট্রা রানার ইভা
ইভা জু বেক একজন জনপ্রিয় ইউটিউবার এবং ন্যাশনাল জিওগ্রাফিকের উপস্থাপিকা। তিনি দুর্গম এলাকায় দীর্ঘমেয়াদি এবং একক অভিযানের বিশেষজ্ঞ হতে চেয়েছিলেন। তাঁর সবচেয়ে কঠিন অ্যাডভেঞ্চারগুলোর একটি ছিল শীতকালে সুমেরু বৃত্তে ভ্রমণ। সেখানে তিনি ৩২০ মাইল আলট্রা ম্যারাথন দৌড়ান। ১০ দিন ধরে মাইনাস ২০ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রায় তিনি বরফের ওপর দিয়ে স্লেজ টেনে এই পথ পাড়ি দিয়েছিলেন। এ বছরের মে মাসে প্রকাশিত হতে যাচ্ছে ইভার বই ‘দ্য ওয়াইল্ডার ওয়ে’। এতে তিনি তাঁর এই একক অভিযানগুলোর রোমহর্ষক অভিজ্ঞতা তুলে ধরেছেন।
আমাজনজয়ী অভিযাত্রী লুসি
লুসি শেফার্ড একজন তরুণ এক্সপ্লোরার এবং চলচ্চিত্র নির্মাতা। তিনি আমাজন রেইনফরেস্ট থেকে শুরু করে মেরু অঞ্চল পর্যন্ত দুর্গম পথে হেঁটে অভিযান চালান। ২০২১ সালে তিনি গায়ানার দুর্গম কানুকু পর্বতমালা পাড়ি দিতে ৫০ দিনে ৪০০ কিলোমিটার পথ অতিক্রম করেন। তাঁর এই অভিযানের মূল লক্ষ্য ছিল সংরক্ষিত বনভূমি রক্ষার গুরুত্ব প্রচার করা। লুসি তাঁর এই অভিযানগুলো নিজেই ভিডিও করেন, যা চ্যানেল ফোরের ‘সিক্রেট আমাজন: ইনটু দ্য ওয়াইল্ড’ সিরিজে দেখানো হয়েছে।
বরফমানবী বারবারা
চিলির এই সাঁতারু আইস মারমেইড বা বরফ মানবী হিসেবে পরিচিত। বারবারা হার্নান্দেজ হুয়ের্তা কোনো ওয়েটস্যুট ছাড়াই হিমাঙ্কের নিচে থাকা বরফশীতল পানিতে দীর্ঘ দূরত্ব অতিক্রম করেন। তিনি দক্ষিণ আমেরিকার একমাত্র সাঁতারু, যিনি ওশান সেভেন চ্যালেঞ্জ পূর্ণ করেছেন। এ ছাড়া তিনি অ্যান্টার্কটিকা এবং কেপ হর্নের মতো জায়গায় সাঁতার কেটে চারটি গিনেস ওয়ার্ল্ড রেকর্ড গড়েছেন। তাঁর এই হিমশীতল পানিতে সাঁতার কাটার মূল উদ্দেশ্য হলো মেরু অঞ্চলের বরফ গলে যাওয়া এবং সামুদ্রিক বাস্তুতন্ত্রের ধ্বংসের দিকে বিশ্বের দৃষ্টি আকর্ষণ করা।
এক্সট্রিম আলট্রা রানার ইওনা
ইওনা বারবু প্রথম ব্যক্তি হিসেবে এক বছরের মধ্যে ছয়টি বিয়ন্ড দ্য আলটিমেট রেস শেষ করেছেন। এই রেসগুলোতে আর্টিক সার্কেল, আমাজন রেইনফরেস্ট, নামিব মরুভূমি, কিরগিজস্তানের তিয়ান শান পর্বতমালাসহ বিশ্বের চরম ভাবাপন্ন পরিবেশের মধ্য দিয়ে ২৩০ কিলোমিটার দৌড়াতে হয়। তিনি বিশ্বাস করেন, ম্যারাথনের মতো দীর্ঘ দূরত্বের দৌড়ে নারী ও পুরুষের পারফরম্যান্সের ব্যবধান অনেক কমে আসে। ইওনা তাঁর এই দৌড়গুলোর মাধ্যমে যুক্তরাজ্যের বিভিন্ন ছোট দাতব্য সংস্থার জন্য অর্থ সংগ্রহ করেন।
সূত্র: বিবিসি