সভ্যতার পদচিহ্নে বিশ্বকাপ
‘এস্তাদিও আজতেকা’র অর্থ অ্যাজটেক স্টেডিয়াম। এবারের বিশ্বকাপ ফুটবলের আসর শুরু হবে মেক্সিকোর এই স্টেডিয়াম থেকে। মেক্সিকো আর অ্যাজটেক শব্দ দুটি শুনলে মনে ভাসে ‘অ্যাপোক্যালিপ্টো’ সিনেমাটির কথা। মনে আছে নিশ্চয়, সেই অপার্থিব নিসর্গের মাঝে নরবলির বীভৎসময় সিনেমাটির কথা। সেসব ভিন্ন গল্প।
শুধু তো আর অ্যাজটেক সভ্যতা নয়। মূলত মেক্সিকো ছিল ওলমেক, মায়া, তেওতিহুয়াকান, তোলতেক এবং অ্যাজটেক সভ্যতার দেশ। যেগুলোকে একত্রে বলে মেসো-আমেরিকান সভ্যতা। মিসরের বাইরে এই মেসো-আমেরিকান সভ্যতার অঞ্চলগুলোতে; বিশেষ করে মেক্সিকোতে আছে প্রাচীন পিরামিড। সেসব গল্প আমরা জানি। কিন্তু এবারের গল্প ফুটবল।
শুধু একটি ক্রীড়া আসর নয়, এটি বিশ্ব সংস্কৃতি, ইতিহাস ও আবেগেরও মিলনমেলা। এ বছরের ফিফা বিশ্বকাপের উদ্বোধনী ম্যাচ অনুষ্ঠিত হবে মেক্সিকো সিটির কিংবদন্তি এস্তাদিও আজতেকায় অর্থাৎ অ্যাজটেক স্টেডিয়ামে। এই স্টেডিয়াম শুধু ফুটবলের ইতিহাসের অংশ নয়; এটি এমন এক ভূখণ্ডে দাঁড়িয়ে আছে, আগেই বলেছি, সেখানে হাজার বছরের পুরোনো মেসো-আমেরিকান সভ্যতা। আজও সেই ভূখণ্ডে সেসব সভ্যতার স্মৃতি জীবন্ত।
মেক্সিকোকে প্রায়ই বলা হয় আমেরিকার প্রাচীন সভ্যতার জন্মভূমি। খ্রিষ্টপূর্ব যুগে ওলমেকরা এখানে প্রথম বড় আকারে নগর সভ্যতার ভিত্তি গড়ে তোলে। পরে মায়ারা জ্যোতির্বিজ্ঞান, গণিত ও স্থাপত্যে বিস্ময়কর উন্নতি ঘটায়। তেওতিহুয়াকান নগরী একসময় ছিল বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ নগর কেন্দ্র। এরপর তোলতেকরা সামরিক ও সাংস্কৃতিক শক্তির উত্থান ঘটায়। সবশেষে অ্যাজতেকা মেক্সিকো উপত্যকায় প্রতিষ্ঠা করে শক্তিশালী সাম্রাজ্য, যার রাজধানী টেনোচটিটলান ছিল বর্তমান মেক্সিকো সিটির পূর্বসূরি।
এই ইতিহাসের ধারাবাহিকতায় দাঁড়িয়ে এস্তাদিও আজতেকা যেন আধুনিক যুগের এক নতুন পিরামিড, যেখানে ধর্মীয় আচার নয়, মানবসমাজের বড় ক্রীড়া উৎসবের উদ্বোধন হতে যাচ্ছে ১১ জুন।
মেক্সিকো যখন ১৯৭০ সালের ফিফা বিশ্বকাপ আয়োজন করার প্রস্তুতি নিচ্ছিল, তখন আন্তর্জাতিক মানের একটি স্টেডিয়ামের প্রয়োজন দেখা দেয়।
আর সেই আকাঙ্ক্ষা থেকে জন্ম নেয় এস্তাদিও আজতেকা।
স্টেডিয়ামটির নকশা করেন মেক্সিকান স্থপতি পেদ্রো রামিরেস ভাসকেস এবং রাফায়েল মিজরাহি। তাঁদের লক্ষ্য ছিল এমন একটি স্থাপনা নির্মাণ করা, যা শুধু দর্শক ধারণক্ষমতার দিক থেকে নয়, স্থাপত্যগত দিক থেকেও বিশ্বের উল্লেখযোগ্য স্টেডিয়ামগুলোর একটি হবে।
নির্মাণকাজ শুরু হয় ১৯৬২ সালে। আগ্নেয়গিরির পাথরসমৃদ্ধ মাটির ওপর বিশাল কাঠামো নির্মাণ ছিল বড় প্রকৌশলগত চ্যালেঞ্জ। হাজার হাজার শ্রমিক ও প্রকৌশলীর নিরলস পরিশ্রমে চার বছরের মধ্যে এর নির্মাণকাজ সম্পন্ন হয়। ১৯৬৬ সালের ২৯ মে আনুষ্ঠানিকভাবে এর উদ্বোধন করা হয়।
অ্যাজটেকদের স্মরণে স্টেডিয়ামের নামকরণ করা হয় ‘আজতেকা’। স্প্যানিশ উপনিবেশ স্থাপনের আগে মধ্য মেক্সিকো অঞ্চলে অ্যাজটেক সাম্রাজ্যের প্রভাব ছিল সর্বাধিক। নামটি শুধু একটি ঐতিহাসিক জাতিগোষ্ঠীকে স্মরণ করে না; এটি মেক্সিকোর জাতীয় পরিচয়, গর্ব, একই সঙ্গে সাংস্কৃতিক উত্তরাধিকারের প্রতীকও।
যখন দর্শকেরা স্টেডিয়ামের গ্যালারিতে বসে খেলা উপভোগ করেন, তখন তাঁরা এমন এক ভূমিতে অবস্থান করেন, যেখানে শত শত বছর আগে অ্যাজটেকযোদ্ধারা তাদের সাম্রাজ্যের স্বপ্ন দেখেছিল।
এস্তাদিও আজতেকাকে অনেকে ‘ফুটবলের ক্যাথেড্রাল’ হিসেবে অভিহিত করেন। এর অন্যতম কারণ, বিশ্বের আর কোনো স্টেডিয়াম দুটি পুরুষ বিশ্বকাপের ফাইনাল ম্যাচ আয়োজনের গৌরব অর্জন করতে পারেনি।
১৯৭০ সালের বিশ্বকাপ ফাইনালে এখানে ব্রাজিল ইতালিকে হারিয়ে তৃতীয়বারের মতো শিরোপা জয় করে। সেই ম্যাচে ফুটবলের রাজা পেলে তাঁর ক্যারিয়ারের শেষ বিশ্বকাপ জয় উদ্যাপন করেছিলেন।
১৯৮৬ সালের বিশ্বকাপেও ইতিহাস রচিত হয় এই মাঠে। ফাইনালে আর্জেন্টিনা পশ্চিম জার্মানিকে পরাজিত করে চ্যাম্পিয়ন হয়। একই টুর্নামেন্টে কোয়ার্টার ফাইনালে ম্যারাডোনার বিখ্যাত ‘হ্যান্ড অব গড’ এবং ‘গোল অব দ্য সেঞ্চুরি’—দুটি ঘটনাই ঘটে এই স্টেডিয়ামে।
ফলে এস্তাদিও আজতেকা শুধু একটি মাঠ নয়; এটি ফুটবল ইতিহাসের জীবন্ত জাদুঘর।
এ বছর মেক্সিকো, যুক্তরাষ্ট্র ও কানাডা যৌথভাবে বিশ্বকাপ আয়োজন করছে। এর মধ্য দিয়ে এস্তাদিও আজতেকা বিশ্বের প্রথম স্টেডিয়াম হিসেবে তিনটি পৃথক বিশ্বকাপের ম্যাচ আয়োজনের বিরল রেকর্ড গড়তে যাচ্ছে।
এ উপলক্ষে স্টেডিয়ামে ব্যাপক সংস্কারকাজ করা হয়েছে। আধুনিক প্রযুক্তি, উন্নত দর্শকসেবা, নিরাপত্তাব্যবস্থা এবং পরিবেশবান্ধব অবকাঠামো এতে যোগ করা হয়েছে। তবে সংস্কারের মধ্যেও
এর ঐতিহাসিক চরিত্র অক্ষুণ্ন রাখার আপ্রাণ চেষ্টা করা হয়েছে।
মেক্সিকো সিটিতে উপস্থিত হবেন বিশ্বের বিভিন্ন দেশের শত শত ফুটবলপ্রেমী। ফুটবলের উদ্বোধনী অনুষ্ঠান এবং ম্যাচ দেখার পর আর কী দেখবেন? সফর সংক্ষিপ্ত হলে দেশটির বিখ্যাত পাঁচটি দর্শনীয় জায়গা দেখতে পারেন।
মায়া সভ্যতার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ প্রত্নতাত্ত্বিক নগরী। এখানকার বিশাল পিরামিড ও জ্যোতির্বৈজ্ঞানিক স্থাপত্য বিশ্বজুড়ে বিখ্যাত।
মেক্সিকোর প্রাচীনতম ও বৃহত্তম নগরীগুলোর একটি। সূর্যের পিরামিড এবং চাঁদের পিরামিড এখানে প্রধান আকর্ষণ।
মেক্সিকো সিটি
মেক্সিকোর রাজধানী। যা ঐতিহাসিক স্থাপনা, জাদুঘর, শিল্পকলা ও আধুনিক নগরজীবনের জন্য বিখ্যাত।
উত্তর মেক্সিকোর বিশাল গিরিখাত অঞ্চল। পাহাড়, বন এবং মনোমুগ্ধকর রেলপথ ভ্রমণের জন্য পর্যটকদের কাছে জনপ্রিয়।
ক্যারিবীয় সাগরের তীরে অবস্থিত প্রাচীন মায়া নগরী। সমুদ্র ও প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শনের অসাধারণ সমন্বয় এখানে দেখা যায়।