নিউইয়র্কে সবকিছু যেন ঠিক পথেই এগোচ্ছিল। বড় চাকরি, ব্যস্ত নগরজীবন, ভবিষ্যৎ নিয়ে নানা পরিকল্পনা—সব মিলিয়ে মেইসি স্ট্রামের জীবন ছিল গুছানো। কিন্তু ২০২৩ সালের জানুয়ারির কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই হঠাৎ এক বিচ্ছেদ সবকিছু ওলটপালট করে দেয়। সম্পর্ক ভাঙার ধাক্কা সামলাতে না সামলাতেই মে মাসে আবার চাকরি চলে যায়।
নতুন করে ঘুরে দাঁড়ানোর চেষ্টাও করেছিলেন তিনি। একটি প্রতিষ্ঠানের ভ্রমণ বিভাগ গড়ে তোলার দায়িত্ব নেন। ভেবেছিলেন, এবার হয়তো সব ঠিক হবে। কিন্তু প্রতিদিন ৯০ মিনিটের যাতায়াত, সারা দিন ডেস্কে বসে থাকা আর চাকরির চাপে আরও ভেঙে পড়তে থাকেন। প্রায় প্রতিদিন দুপুরে গাড়িতে বসে কান্নায় ভেঙে পড়া ছিল তাঁর রুটিন।
৩০-এর আগে বিয়ে, বড় বাড়ি, স্থায়ী চাকরি—শৈশব থেকে যে ‘আমেরিকান ড্রিম’ মেইসির মাথায় গেঁথে দেওয়া হয়েছিল, তা যেন ধীরে ধীরে ফাঁদ মনে হতে থাকে। এই জীবনের সঙ্গে নিজের চাওয়া-পাওয়ার কোনো মিলই খুঁজে পাচ্ছিলেন না। এভাবে কি আর চাকরি হয়? বছরের শেষে তাই আবারও ছাঁটাই!
মজার ব্যাপার হলো—দ্বিতীয়বার চাকরি হারিয়ে দারুণ এক স্বস্তি অনুভব করেন তিনি। যেন এক অনাকাঙ্ক্ষিত দৌড় থেকে মুক্তি পেয়ে গেলেন।
২০২৪ সালের শুরুতেই সিদ্ধান্ত নিলেন—নিজের অ্যাপার্টমেন্টটি সাবলেট দেবেন, জিনিসপত্রও কিছু বিক্রি করবেন, আর এপ্রিলের মাঝামাঝিতে একটি টিকিট কেটে এশিয়ায় উড়াল দেবেন। প্রথমে যাবেন দক্ষিণ কোরিয়া। আট মাসের ভ্রমণে এশিয়া ও অস্ট্রেলিয়া ঘুরে দেখবেন। অবশেষে ১৫ এপ্রিল তিনি ফ্লাইটে চড়লেন।
যাত্রাপথে সঙ্গে একজন বন্ধু ছিলেন বটে। দক্ষিণ কোরিয়ার সিউলে বন্ধুর সঙ্গে শুরুটাও নিরাপদ ছিল। কিন্তু বন্ধু যখন যুক্তরাষ্ট্রে ফিরে গেলেন, মেইসি হয়ে গেলে সম্পূর্ণ একা। একাই রওনা হলেন থাইল্যান্ডের পথে। সেখানে পৌঁছে ব্যাংককের খাও সান রোডের তীব্র সংগীত আর ভিয়েতনামে হো চি মিন সিটির অন্তহীন যানজট তাঁর নিঃসঙ্গতাকে আরও বাড়িয়ে তোলে। হোস্টেলের ফিরে কান্না, মোটরবাইকের পেছনে বসে প্যানিক অ্যাটাক—সবই ছিল এই যাত্রার অংশ।
তবে ধীরে ধীরে চারপাশের জীবন তাঁকে অন্য এক বাস্তবতা দেখাতে শুরু করে। উত্তর ভিয়েতনামের বিখ্যাত হা গিয়াং লুপ মোটরবাইক ভ্রমণের সময় তিনি উপলব্ধি করেন—এই পাহাড়ি এলাকায় সাফল্যের মাপকাঠি করপোরেট ডেডলাইন বা ডেস্কের কাজ নয়। এখানে জীবন আবর্তিত হয় পরিবার, দৈনন্দিন রুটিন আর বর্তমান মুহূর্তকে ঘিরে।
মালয়েশিয়ান বোর্নিওর জঙ্গলে এক মার্কিন তরুণীর সঙ্গে তাঁর পরিচয় হয়। বিচ্ছেদের পর তিনিও নিজের জীবন নতুন করে সাজাচ্ছিলেন। তাঁদের দীর্ঘ আলাপ চলতে থাকে কুয়ালালামপুর, পেনাং, এমনকি বালিতেও। বুঝতে পারেন—অনিশ্চয়তা শুধু তাঁর একার নয়; পৃথিবীর নানা প্রান্তে অনেকেই নিজেদের পথ খুঁজছেন।
মেইসির কাছে ভ্রমণ তখন আর বাস্তবতা থেকে পালানো নয়, বরং জীবনের সক্রিয় অংশ হয়ে ওঠে। অনিশ্চয়তা আর ব্যর্থতা সমার্থক মনে হয় না। ভ্রমণ শেষে যুক্তরাষ্ট্রে সংক্ষিপ্ত সময়ের জন্য ফিরলেও পুরোনো জীবনের প্রতি আর টান অনুভব করেননি তিনি। ২০২৫ সালে তিনি ঘুরেছেন ইউরোপের ১৭টি দেশ। বিশেষভাবে ভালোবেসে ফেলেন বলকান অঞ্চলকে। এখন তিনি বসবাস করছেন বসনিয়া ও হার্জেগোভিনার রাজধানী সারাজেভো শহরে। ফ্রিল্যান্স সাংবাদিক হিসেবে কাজ করছেন। এমনভাবে জীবন গড়ছেন যাতে ভ্রমণের স্বাধীনতা অক্ষুণ্ন থাকে।
তাঁর নতুন সাফল্যের সংজ্ঞা আর বড় বাড়ি বা স্থায়ী চাকরির মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। বরং তার কাছে সাফল্য মানে এখন নিজের মতো করে, ভেবে–চিন্তে এবং উদ্দেশ্য নিয়ে বাঁচা। সামনে কী আছে, তা তিনি জানেন না। কিন্তু এখন আর সেই অজানা তাঁকে ভয় দেখায় না—বরং কাছে টানে।
গল্পটি বিজনেস ইনসাইডার থেকে নেওয়া