ফ্যাশন বরাবরই সমাজের দর্পণ। এটিকে সংস্কৃতি, ব্যক্তিত্ব এবং আমাদের আত্মপ্রকাশের পছন্দের উপায়ও বলা চলে। তবে এতকাল ফ্যাশন শিল্প লম্বা, স্লিম ও নিখুঁত ফরসা রংকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা সৌন্দর্যের ধারণাকে ধন্য ধন্য করেছে। কিন্তু সময় বদলাচ্ছে। নতুন ফ্যাশনবিদেরা বিশ্বাস করতে শুরু করেছেন, কোনো নির্দিষ্ট মাপকাঠি সৌন্দর্যের মানদণ্ড হতে পারে না। বরং যেকোনো অবস্থায় নিজের প্রতি সদয় ও সচেতন হওয়ার কথা মনে করিয়ে দেয়। এর মধ্য দিয়ে ফ্যাশনের ক্ষেত্রে শরীর নিয়ে ইতিবাচক মনোভাব গড়ে তোলার আন্দোলন এখন প্রচলিত নিয়মগুলোকে নতুন করে লিখছে।
অন ক্লাউড নাইন অ্যান্ড হাফ ফ্যাশন উদ্যোগের স্বত্বাধিকারী আফরিন আহমেদ বলেন, ‘বডি পজিটিভিটি শুধু একটি ট্রেন্ড নয়; বরং এটি জীবনযাপনের এক পদ্ধতি, যা মানুষকে তাদের শরীরের স্বাভাবিক আকার ও আকৃতিকে সম্মান করতে অনুপ্রাণিত করে। এর মূলকথা হলো, এমনভাবে পোশাক পরা, যা নিজেকে স্বাচ্ছন্দ্য, আনন্দ এবং আত্মবিশ্বাস এনে দেয়।’ অর্থাৎ আপনার উচ্চতা, শরীরের আকার কিংবা রং যেমনই হোক না কেন, নিজেকে প্রকাশ করার ক্ষেত্রে তার কোনো সীমাবদ্ধতা নেই।
বডি পজিটিভিটি মানে, নিজের স্বাভাবিক গড়ন নিয়ে ইতিবাচক ও আত্মবিশ্বাসী থাকা। প্রত্যেক মানুষের উচ্চতা, শরীরের রং এবং আকার প্রাকৃতিকভাবে আলাদা। এই বৈচিত্র্যকে স্বীকার করে নিয়েই আমাদের এগিয়ে যেতে হবে। নিজের উচ্চতা, শরীরের আকার বা ত্বকের রং—সবকিছুকে মেনে নিয়ে পোশাক পরতে হবে—এটাই এখনকার ফ্যাশনের মূলমন্ত্র।
ওয়্যারহাউসের স্বত্বাধিকারী তাসনিম ফেরদৌস বলেন, ‘আগে নারী র্যাম্প মডেল বলতেই লোকে বুঝত, যার শরীরের মাপ ৩৬–২৪–৩৬। অথচ এখন ম্যাগাজিনের কভার থেকে শুরু করে রানওয়ে, এমনকি বিশ্বের বিভিন্ন সৌন্দর্য প্রতিযোগিতায় জায়গা করে নিচ্ছেন যেকোনো শারীরিক আকৃতির এবং ওজনের নারীরা। আজকাল ফ্যাশন ক্যাম্পেইনগুলোতে সব আকারের, রঙের এবং বয়সের নারীদের দেখানো হয়; যা প্রমাণ করে, স্টাইল কোনো একটি নির্দিষ্ট শারীরিক গড়নের জন্য নয়।’
বর্তমান পৃথিবীতে ফ্যাশন এই বৈচিত্র্যকেই উদ্যাপন করে। বিভিন্ন আকারের পোশাকসম্ভার দেখলে বোঝা যায়, এই শিল্প ধীরে ধীরে বুঝতে পারছে, প্রত্যেক নারীরই তার কেনা পোশাকে নিজের প্রতিচ্ছবি দেখার অধিকার আছে। এথনিক পোশাকের ব্র্যান্ডগুলোও এই ধারার দিকে এগিয়ে যাচ্ছে এবং এমন কুর্তা, শাড়ি ও স্যুট সেট তৈরি করছে, যা সব ধরনের শারীরিক গড়নে সুন্দর দেখায়।
কিছুদিন আগেও অনেক নারীর জন্য ফ্যাশন আনন্দের চেয়ে চাপের উৎস হয়ে দাঁড়িয়েছিল। শরীরের মাপের কঠোর সাইজ চার্ট এবং অবাস্তব সৌন্দর্যের মানদণ্ড প্রায়ই কেনাকাটাকে দুঃসহ অভিজ্ঞতায় পরিণত করেছে বারবার। বডি পজিটিভিটি আন্দোলন এই ধারণা বদলে দিয়ে মনে করিয়ে দিয়েছে, মানুষের সৌন্দর্য এবং আত্মবিশ্বাস শুধু মেজারিং টেপের ইঞ্চিতে মাপা যায় না।
বডি পজিটিভিটির ধারণা প্রত্যেক মানুষকে জানিয়েছে, সবাই মনোযোগ, সম্মান এবং মার্জিত পোশাক পরার যোগ্য। এটি গুরুত্বপূর্ণ; কারণ, পোশাক শুধু সেলাই করা কাপড় নয়, এগুলো আত্মপ্রকাশের মাধ্যম।
বডি পজিটিভিটির শক্তিশালী দিকগুলোর একটি হলো, এটি ফ্যাশনের ধারণা বদলে দিয়েছে। অন্যদের সঙ্গে মানিয়ে চলার চেষ্টা থেকে সরে এসে স্বকীয়তা গ্রহণ করার দিকে ঝুঁকেছে। অর্থাৎ ‘এটি পরার পর কি আমাকে রোগা রোগা দেখাবে’ জাতীয় মনোভাবকে ‘এটা পরে কি আমার দারুণ লাগছে’—এমন দিকে নিয়ে গেছে।
প্রত্যেকের শরীর নিয়ে ইতিবাচক মনোভাব নিজেকে ভালোবাসার সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে জড়িত। নিজের শরীর নিয়ে সন্তুষ্ট হলে ফ্যাশন সেই সন্তুষ্টির একটি আনন্দময় সম্প্রসারণে পরিণত হয়। বড় আকারের পোশাকের আড়ালে নিজেকে লুকানো কিংবা অস্বস্তিকর পোশাকে নিজেকে গুঁজে দেওয়ার পরিবর্তে, আপনি এমন পোশাক বেছে নিতে শুরু করুন, যা আপনার শারীরিক গঠনকে উদ্যাপন করে।
ডিজাইনাররা বর্তমানে বিভিন্ন আকারের পোশাক নিয়ে কালেকশন তৈরি করছেন। অন্যদিকে বিভিন্ন শারীরিক গঠনের মডেলরা গর্বের সঙ্গে রানওয়েতে হাঁটছেন। সোশ্যাল মিডিয়াও বিশাল এক ভূমিকা পালন করেছে এ ধরনের ক্ষেত্রে।
বডি পজিটিভিটি আমাদের মনে করিয়ে দেয়, ফ্যাশন কোনো প্রতিযোগিতা নয়। এটি ব্যক্তিত্বের উদ্যাপন। দুজন মানুষ একই পোশাক পরলেও তাঁদের দেখতে ভিন্ন মনে হতে পারে। আর এই ভিন্নতাই হলো ফ্যাশনের সৌন্দর্য। আপনার আকার নিজস্ব স্টাইল নির্ধারণ করে না; যা স্টাইলিশ ও উজ্জ্বল করে তোলে, সেটি হলো আপনার আত্মবিশ্বাস, স্বাচ্ছন্দ্য এবং ব্যক্তিত্ব।