জীবনটা যেভাবে বাঁচতে চাই, সেই সিদ্ধান্ত নেওয়ার স্বাধীনতা কি আমার আছে? জীবনের অনেক ক্ষেত্রেই এই প্রশ্ন মানুষ নিজেকে করেন। একটি সাধারণ প্রশ্ন, কিন্তু এর উত্তরই নির্ধারণ করে মানুষের সুখ, মানসিক স্বাস্থ্য এবং জীবন যাপনের ধরণ। বৈশ্বিক পরিসংখ্যান থেকে শুরু করে মনোবিজ্ঞানের গভীর গবেষণা। সবখানেই দেখা গেছে, নিজের জীবনের ওপর নিয়ন্ত্রণ থাকার অনুভূতিই মানুষের সুস্থতার মূল চাবিকাঠি।
যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক প্রতিষ্ঠান গ্যালাপের জনমত জরিপ অনুযায়ী, বিশ্বজুড়ে গড়ে ৮২ শতাংশ মানুষ তাদের জীবনযাত্রার সিদ্ধান্ত নেওয়ার স্বাধীনতায় সন্তুষ্ট—যা গ্যালাপের জরিপের ইতিহাসে এক অনন্য রেকর্ড। তবে চিত্রটি সব দেশে একরকম নয়।
শীর্ষে নর্ডিক দেশসমূহ: ২০২৫ সালের ওয়ার্ল্ড হ্যাপিনেস রিপোর্টে টানা অষ্টমবারের মতো বিশ্বের সবচেয়ে সুখী দেশ নির্বাচিত হয় ফিনল্যান্ড। এরপরই রয়েছে ডেনমার্ক ও আইসল্যান্ড। সামাজিক সুরক্ষা, পারস্পরিক বিশ্বাস ও ব্যক্তিগত স্বাধীনতার চমৎকার মেলবন্ধনই তাদের এই সাফল্যের চাবিকাঠি।
লাতিন আমেরিকা ও মধ্য এশিয়া: কেবল ধনী দেশগুলোই সুখী এমন ধারণা ভুল প্রমাণ করেছে লাতিন আমেরিকার দেশ কোস্টারিকা এবং মেক্সিকো। পরিবার ও সামাজিক বন্ধন তাদের অর্থনৈতিক সীমাবদ্ধতাকে পেছনে ফেলে শীর্ষে নিয়ে গেছে। অন্যদিকে মধ্য এশিয়ায় টানা আঞ্চলিক শীর্ষস্থান ধরে রেখেছে উজবেকিস্তান।
নিজেকে স্বাধীনতার প্রতিকৃতি দাবি করা যুক্তরাষ্ট্রে কেবল ৭২ শতাংশ মানুষ এই স্বাধীনতায় সন্তুষ্টি প্রকাশ করেছেন। এটি বৈশ্বিক গড় থেকে ১০ শতাংশ কম। ওয়ার্ল্ড হ্যাপিনেস রিপোর্ট ২০২৫-এ যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থান নেমে দাঁড়িয়েছে ২৪তম স্থানে। তালিকার একদম শেষে—১৪৭টি দেশের মধ্যে ১৪৭তম স্থানে রয়েছে আফগানিস্তান। বিশেষ করে নারীদের শিক্ষা ও কাজের স্বাধীনতা মারাত্মকভাবে খর্ব হওয়ায় দেশটি সুখ ও স্বাধীনতার বিপরীত মেরুতে অবস্থান করছে।
পরিসংখ্যানের বাইরে গিয়ে মনোবিজ্ঞানীরা এই স্বাধীনতা বা নিয়ন্ত্রণ অনুভূতির ব্যাখ্যা দিয়েছেন। ১৯৫৪ সালে মনোবিজ্ঞানী জুলিয়ান রটার ‘লোকাস অব কন্ট্রোল’ ধারণাটি সামনে আনেন এবং ১৯৬৬ সালে তা বিস্তারিত প্রকাশ করেন।
মনোবিজ্ঞানীদের মতে, মানুষের মধ্যে নিয়ন্ত্রণ ভাবনার দুটি রূপ দেখা যায়। একটি হল ইন্টারনাল লোকাস অব কন্ট্রোল অর্থাৎ যারা বিশ্বাস করেন যে তাদের নিজেদের প্রচেষ্টা, পছন্দ ও সিদ্ধান্তই জীবনের ফলাফল নির্ধারণ করে। অন্যটি এক্সটারনাল লোকাস অব কন্ট্রোল। এই ধরণের মানুষেরা মনে করেন তাদের ভাগ্য, কপাল বা চারপাশের পরিবেশের ওপর নিজেদের কোনো হাত নেই। গবেষণায় দেখা গেছে, যাদের ‘ইন্টারনাল লোকাস অব কন্ট্রোল’ বেশি, তারা বিষণ্নতা ও দুশ্চিন্তায় কম ভোগেন এবং তাদের রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা ও আত্মবিশ্বাস বেশি থাকে।
১৯৭৬ সালে ল্যাঙ্গার ও রোডিন একটি বৃদ্ধাশ্রমে ঐতিহাসিক পরীক্ষা চালান। যেসব প্রবীণদের নিজেদের ঘরের আসবাবপত্র সাজানো কিংবা একটি গাছের যত্ন নেওয়ার মতো ছোট ছোট সিদ্ধান্তের নিয়ন্ত্রণ দেওয়া হয়েছিল। ১৮ মাস পর দেখা গেল তারা কেবল মানসিকভাবেই সুখী হননি, তাদের মৃত্যুর হারও অন্য গ্রুপের চেয়ে অনেক কম ছিল। ২০১১ সালে ফিশার ও বোয়ারের ৬৩টি সমাজের ওপর করা একটি মেটা-অ্যানালাইসিসে দেখা যায়, জাতীয় সুখ ও কল্যাণের ক্ষেত্রে জাতীয় সম্পদের চেয়ে মানুষের ব্যক্তিগত স্বায়ত্তশাসন বা স্বাধীনতার অনুভূতি অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ।
রাজনীতি কিংবা অর্থনীতি যেটাই হোক শেষ পর্যন্ত নিজের জীবনের লাগাম নিজের হাতে রাখার অনুভূতির ওপরই নির্ভর করে মানুষের আসল সুখ ও জীবনসংগ্রামের শক্তি। কারণ সব পরিস্থিতি মানুষের নিয়ন্ত্রণে থাকে না। বিশেষ করে আর্থ-সামাজিক প্রতিকূলতায় এটি কঠিন হয়ে পড়ে। তবে মনোবিজ্ঞানীরা জীবনের ওপর নিয়ন্ত্রণ ফিরিয়ে আনতে ৫টি সহজ চর্চার পরামর্শ দেন।
স্পষ্ট সীমানা নির্ধারণ: কর্মক্ষেত্র ও ব্যক্তিগত জীবনে নিজের সীমা ঠিক করা।
ছোট সিদ্ধান্ত নিজে নেওয়া: প্রতিদিনের ছোট ছোট পছন্দের ওপর মালিকানা প্রতিষ্ঠা করা।
মাইন্ডফুলনেস: বর্তমান মুহূর্তে মনোযোগ দেওয়া, যা অসহায়ত্বের অনুভূতি কমায়।
সহায়ক সম্পর্ক: যারা আপনার স্বাধীনতা ও সিদ্ধান্তকে সম্মান করে, তাদের সাথে মেলামেশা।
নিয়ন্ত্রণযোগ্য বিষয়ে নজর দেওয়া: যা পরিবর্তন করা অসম্ভব তা না ভেবে, যা আপনার হাতে আছে সেদিকে নজর দেওয়া।
সূত্র: সাইকোলজি টুডে, সিম্পিল সাইকোলজি, ওয়ার্ল্ড পপুলেশন রিভিউ