রেস্তোরাঁয় সুস্বাদু খাবার টেবিলে আসার পর খাওয়ার আগে কী করি? হ্যাঁ, ছবি তুলতে ব্যস্ত হয়ে পড়ি। শেষ যেবার সমুদ্রসৈকতের সূর্যাস্ত দেখে ফিরলেন, সেটা কেমন ছিল? খোলা চোখে দেখেছিলেন, নাকি মুঠোফোনের স্ক্রিনে সেই মুহূর্ত ধারণে ব্যস্ত ছিলেন? কিংবা সুন্দর কোনো হাইকিং ট্রেইলে গিয়ে প্রকৃতির আসল সৌন্দর্য উপভোগ করার চেয়ে পারফেক্ট অ্যাঙ্গেলে ছবি বা রিল বানানোর তাগিদ কি বেশি কাজ করে? আজকাল আমাদের জীবন অনেকটাই এমন হয়ে গেছে। খাবার ঠান্ডা হয়ে গেলেও নিখুঁত ছবির চক্করে আমরা ব্যস্ত থাকি। প্রশ্ন হলো, কেন আমরা এমন করি?
আমরা কেন এমন করি—এর উত্তর সহজ। দেখতে চাই এবং দেখাতে চাই। প্রমাণ করতে চাই যে আমরা বেশ ভালো আছি। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের ফিডে অন্যদের সাজানো-গোছানো জীবনের ঝলক দেখে মনে হয়, ‘আমার জীবন কি আদৌ আকর্ষণীয়?’ এই ভাবনা থেকে শুরু হয় লাইক, ভিউ আর ভ্যালিডেশনের ইঁদুরদৌড়। অন্যের সঙ্গে এই অন্তহীন তুলনার প্রতিযোগিতায় নেমে আমরা জীবন উপভোগ করার চেয়ে পারফর্ম করতে শুরু করি বেশি। একসময় জীবন মানেই হয়ে দাঁড়ায় শুধু ডকুমেন্টিং বা নথিভুক্তকরণ। আর এরই ফাঁকে আসল অনুভূতিগুলো হারিয়ে যায় পর্দার আড়ালে।
সোশ্যাল মিডিয়া আমাদের প্রায়ই বোঝাতে চায়, সুখ জনসমক্ষে প্রকাশ করা জরুরি। কিন্তু বাস্তবে সুখের জন্য কোনো দর্শকের প্রয়োজন হয় না। এই ক্লান্তি থেকে এখন অনেকে বেছে নিচ্ছেন জেওএমও। অর্থাৎ জয় অব মিসিং আউট বা কিছু না জানার আনন্দ। এফওএমওর যুগে যেখানে সবকিছু জানার বা দেখানোর একটা অদৃশ্য চাপ থাকে, সেখানে জেওএমও আমাদের শেখায় অন্যের দৈনন্দিন জীবনের হিসাব না রেখে নিজের ভেতরের শান্তিতে মনোযোগ দিতে। দুই হাজার বছর আগে গ্রিক দার্শনিক এপিপ্টেটাসও বলে গেছেন, প্রশিক্ষণ বা সাধনা নিজের জন্য হওয়া উচিত, অন্যকে দেখানোর জন্য নয়। একটি সুন্দর ভ্রমণ বা বড় কোনো অর্জনের সৌন্দর্য কেউ দেখল কি না, তাতে তার প্রকৃত মূল্য কমে যায় না।
সোশ্যাল মিডিয়ায় অনেক সময় দেখা যায়, সুখ একটি পছন্দ। কথাটি ভালো উদ্দেশ্যে বলা হলেও এটি সব বাস্তবতার সঙ্গে মেলে না। সুখ কোনো স্থায়ী বা ইচ্ছেমতো সুইচ অন করার বিষয় নয়। এটি একটি অস্থায়ী আবেগ, যা বিভিন্ন জটিল উপাদানের ওপর নির্ভর করে। বিশেষ করে যাঁরা মেজর ডিপ্রেশন, বাইপোলার ডিসঅর্ডারের মতো মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যায় ভুগছেন, তাঁদের জন্য জোর করে খুশি থাকার সিদ্ধান্ত নেওয়া অসম্ভব ও অবাস্তব। আর্থসামাজিক অবস্থা, শারীরিক স্বাস্থ্য, জিনগত কারণ কিংবা পারিপার্শ্বিক চাপ মানুষের সুখানুভূতির ওপর বড় প্রভাব ফেলে। তাই কাউকে বলা যে তুমি চাইলেই খুশি থাকতে পারো, ওটা ঠিক নয়। কথাটি উল্টো তাঁকে আরও অপরাধবোধে ভোগাতে পারে এবং মানসিক সমস্যার সঠিক চিকিৎসায় বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারে।
সবার সামনে জাহির করার জন্য জীবন নয়। নিজের ভেতরের প্রশান্তির জন্য বাঁচাটাই আসল। আপনার প্রতিটি মুহূর্ত সুন্দর হতে পারে, এমনকি তার কোনো সাক্ষী বা দর্শক না থাকলেও। সুখ যদি হুট করে বেছে নেওয়া না যায়, তবে ছোট ছোট অভ্যাসের মাধ্যমে এটিকে নিজের জীবনে চাষ করে নেওয়া সম্ভব। যেমন—
ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক তৈরি করুন: মানুষের সঙ্গে বাস্তব ও অর্থপূর্ণ যোগাযোগ মানসিক সুস্থতার বড় চাবিকাঠি। পরিবার বা ভালো বন্ধুদের সঙ্গে সময় কাটান।
কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করুন: প্রতিদিন নিজের জীবনে ঘটে যাওয়া ছোট ছোট ভালো বিষয়গুলোর জন্য কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করার অভ্যাস করুন।
মনোযোগ বা মাইন্ডফুলনেস বাড়ান: বর্তমান মুহূর্তে বেঁচে থাকা এবং গভীরভাবে চারপাশ অনুভব করা মনের শান্তি বাড়ায়।
স্ক্রিন টাইম কমান: সোশ্যাল মিডিয়ায় অতিরিক্ত সময় কাটানো বিষণ্নতা ও একাকিত্ব বাড়াতে পারে। তাই অনলাইন দুনিয়া থেকে মাঝেমধ্যে বিরতি নিন।
নিজের যত্ন ও থেরাপি: পর্যাপ্ত ঘুম, স্বাস্থ্যকর খাবার এবং প্রয়োজনে পেশাদার চিকিৎসকের সাহায্য নিতে দ্বিধা করবেন না।
সূত্র: মিডিয়াম, বেটার হেল্প, দ্য চোসুনিলবো