শীতের আমেজ নিয়ে আসে হেমন্ত। ফলে দিন ও রাতে আবহাওয়ার পার্থক্য সহজে বোঝা যায়। এ সময়ে ত্বকের স্বাভাবিক আর্দ্রতা কমে গিয়ে মুখ ও শরীর রুক্ষ ও খসখসে হয়ে পড়তে শুরু করে। ত্বকের এই টানটান ভাব দূর করতে গিয়ে স্কিনকেয়ার রুটিনে আমরা এমন অনেক উপাদান বা প্রসাধনী ব্যবহার করে ফেলি, যা উপকারের বদলে ত্বকের প্রাকৃতিক সুরক্ষাকবচ নষ্ট করে দেয়। কসমেটোলজিস্ট ও শোভন মেকওভারের স্বত্বাধিকারী শোভন সাহা জানিয়েছেন, ‘ঋতু পরিবর্তনের সঙ্গে স্কিনকেয়ারসামগ্রীতেও বড় ধরনের পরিবর্তন আনা জরুরি।’ হেমন্তের এই শুষ্ক সময়ে কোমল, সুস্থ ও প্রাণবন্ত ত্বক পেতে কোন প্রসাধনগুলো এড়িয়ে চলা উচিত, তা নিয়েই আজকের আয়োজন।
শোভন সাহা বলেন, ‘গরমকালে ত্বকের অতিরিক্ত তেল ও ঘাম দূর করতে ফোমিং ফেসওয়াশ বেশ কার্যকর হলেও হেমন্তে এটি এড়িয়ে চলাই ভালো।’ সালফেটযুক্ত ফেসওয়াশ বা কেমিক্যাল ক্লিনজার ত্বকের প্রয়োজনীয় প্রাকৃতিক তেল ও আর্দ্রতা একদম শুষে নেয়। ফলে মুখ ধোয়ার পর ত্বক অস্বাভাবিক রকমের টানটান ও খসখসে হয়ে যায়। শীতে ফোমিং ফেসওয়াশের বদলে জেন্টল, ক্রিম-বেসড বা নো-ফোম হাইড্রেটিং ক্লিনজার ব্যবহার করা বুদ্ধিমানের কাজ।
শীতের আগে ও শীতে ত্বকের লোমকূপ ছোট করা বা তেল নিয়ন্ত্রণের জন্য অ্যালকোহলভিত্তিক অ্যাস্ট্রিনজেন্ট বা টোনার ব্যবহার করা বেশ বিপজ্জনক। অ্যাস্ট্রিনজেন্টে থাকা উচ্চমাত্রার অ্যালকোহল ত্বকে তীব্র জ্বালাপোড়া, লালচে ভাব ও শুষ্কতা বাড়িয়ে দেয়। এ সময় অ্যালকোহল-ফ্রি এবং হায়ালুরোনিক অ্যাসিড, গ্লিসারিন বা গোলাপজলের মতো উপাদানযুক্ত হাইড্রেটিং টোনার বেছে নেওয়া উচিত।
হেমন্তকাল থেকে পুরো শীতকালে মরা চামড়া উঠে মুখ কিছুটা খসখসে হতে পারে। তবে এই মরা চামড়া তুলতে গিয়ে শক্ত দানাদার স্ক্রাব বা ফেসওয়াশ দিয়ে শক্ত হাতে মুখ ঘষা যাবে না। শক্ত স্ক্রাব ত্বকে সূক্ষ্ম ক্ষতের সৃষ্টি করে এবং প্রদাহ বাড়িয়ে দেয়। শোভন সাহা জানান, শীতে ফিজিক্যাল স্ক্রাবের পরিবর্তে ল্যাক্টিক অ্যাসিডের মতো মাইল্ড কেমিক্যাল এক্সফোলিয়েন্ট সপ্তাহে এক দিন ব্যবহার করা যেতে পারে।
গ্রীষ্মকালে হালকা ওয়াটার বেসড ময়েশ্চারাইজার ত্বকে সুন্দরভাবে শোষিত হলেও হেমন্ত বা শীতে তা পর্যাপ্ত আর্দ্রতা জোগাতে পারে না। শীতে পাতলা লোশনের বদলে সিরামাইড, শিয়া বাটার, স্কোয়ালেন বা ফ্যাটি অ্যাসিড-সমৃদ্ধ ঘন ক্রিম বেছে নিন। এগুলো ত্বকের ওপর প্রতিরক্ষামূলক আবরণ তৈরি করে আর্দ্রতা ভেতরে আটকে রাখে।
রেটিনল বা রেটিনয়েড ত্বকের সূক্ষ্ম রেখা ও বলিরেখা কমায় ঠিকই, তবে এটি ত্বক অনেকটা শুষ্ক ও সংবেদনশীল করে তোলে। শীতে বাতাস এমনিতে শুষ্ক থাকায় রেটিনলের অতিরিক্ত ব্যবহার ত্বক লাল হওয়া, জ্বালাপোড়া করা ও চামড়া ওঠার বড় কারণ হতে পারে। শীতে রেটিনল ব্যবহারে সতর্ক থাকা জরুরি।
কৃত্রিম সুগন্ধিযুক্ত প্রসাধনী শীতের দিনে সংবেদনশীল ত্বকে দ্রুত জ্বালাপোড়া, লালচে ভাব, অ্যালার্জি কিংবা একজিমা তৈরি করতে পারে। যাঁদের ত্বক অতিরিক্ত শুষ্ক ও পাতলা, তাঁদের জন্য কেমিক্যালযুক্ত কড়া পারফিউম স্প্রে ও ভারী ক্রিম ব্যবহার ক্ষতিকর হতে পারে। শোভন সাহা জানান, এই শুষ্ক আবহাওয়ায় প্রসাধনী বাছাইয়ের সময় যেকোনো জটিলতা এড়াতে ফ্রেগ্র্যান্স-ফ্রি, ক্ষতিকর উপাদানমুক্ত বা ডার্মাটোলজিক্যালি সেফ প্রোডাক্ট দেখে বেছে নেওয়াই নিরাপদ সিদ্ধান্ত।
হেমন্তে ত্বকের সুস্বাস্থ্য বজায় রাখতে প্রয়োজন সঠিক সচেতনতা ও মানানসই প্রসাধনী নির্বাচন। অহেতুক কড়া কেমিক্যালযুক্ত পণ্য ব্যবহার বন্ধ করে ত্বকের সুরক্ষা দেওয়া এবং আর্দ্রতা ধরে রাখাই হেমন্ত ও শীতে মূল লক্ষ্য হওয়া উচিত। ক্ষতিকর প্রসাধনী এড়িয়ে কোমল ও আর্দ্রতাদায়ক প্রসাধন নিয়মিত ব্যবহার করলে পুরো হেমন্ত ও শীতে ত্বক থাকবে উজ্জ্বল, মসৃণ ও প্রাণবন্ত।