একই আড্ডায় বা একই ঘরে অনেকে একসঙ্গে বসে আছেন। অথচ দেখা গেল, মশা বেছে বেছে আপনাকেই বেশি কামড়াচ্ছে। এই গরমে এমন পরিস্থিতিতে মাথা ঠান্ডা রাখা দায়। এমন অভিজ্ঞতা হলে নিজেকে ‘মশার চুম্বক’ মনে হওয়া খুব স্বাভাবিক। তবে এটি কোনো কাকতালীয় বিষয় নয়। গবেষকেরা জানিয়েছেন, মশার এই পক্ষপাতের পেছনে সুনির্দিষ্ট কিছু বৈজ্ঞানিক কারণ রয়েছে। মশা মূলত মানবদেহের কিছু প্রাকৃতিক উপাদান ও অভ্যাসের প্রতি বিশেষভাবে আকৃষ্ট হয়।
মশার কামড় কেবল নারী মশাদের কাছ থেকেই আসে। কারণ, ডিম্বাণু উৎপাদনের জন্য মানুষের রক্তের প্রোটিন তাদের প্রয়োজন হয়। আর এই রক্তের ক্ষেত্রে মশার নিজস্ব পছন্দ রয়েছে। যেমন ‘এশিয়ান টাইগার’ মশা ‘ও’ গ্রুপের রক্ত সবচেয়ে বেশি পছন্দ করে। এবি গ্রুপটি আবার ‘মার্শ’ মশাকে বেশি আকর্ষণ করে। প্রায় ৮০ শতাংশ মানুষের শরীর থেকে এমন কিছু রাসায়নিক নিঃসৃত হয়, যা তাদের রক্তের গ্রুপটি মশার কাছে প্রকাশ করে দেয়। ফলে রক্তের গ্রুপ যা-ই হোক না কেন, এই রাসায়নিকের কারণে তারা মশার সহজ লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হয়।
মশারা অনেক দূর থেকেই মানুষের নিশ্বাসের সঙ্গে নির্গত কার্বন ডাই-অক্সাইড শনাক্ত করতে পারে। আপনি যত বেশি কার্বন ডাই-অক্সাইড ছাড়বেন, মশার কাছে আপনি ততটাই আকর্ষণীয় হয়ে উঠবেন। ব্যায়াম করার সময় মানুষ বেশি কার্বন ডাই-অক্সাইড ত্যাগ করে, তাই তখন মশার কামড়ও বাড়ে। মশা যে সময় আমাদের মাথার চারপাশে ওড়ে এবং ভনভন করে, তার কারণ হলো আমাদের নাক ও মুখের কাছে থাকা কার্বন ডাই-অক্সাইডের ঘনত্ব।
নারী মশারা মানুষের শরীরের তাপমাত্রা বা তাপের উৎস নিখুঁতভাবে বুঝতে পারে। গরমের দিনে বা শারীরিক কসরতের সময় যখন দেহের তাপমাত্রা বাড়ে, তখন মশা সহজেই আপনাকে খুঁজে নেয়। এ ছাড়া মানুষের ত্বকের নিজস্ব গন্ধ মশার জন্য বড় আকর্ষণ। যেমন ঘামের মধ্যে থাকা ল্যাকটিক অ্যাসিড এবং অ্যামোনিয়ার গন্ধ মশাকে টানে। ত্বকে থাকা বিভিন্ন ব্যাকটেরিয়া ঘামের সঙ্গে মিশে একটি অনন্য সুবাস তৈরি করে। গবেষণায় দেখা গেছে, যাদের ত্বকে ব্যাকটেরিয়ার বৈচিত্র্য কম কিন্তু পরিমাণ বেশি, মশারা তাদের দিকে বেশি ধাবিত হয়। মানুষের ত্বকে প্রাকৃতিকভাবে তৈরি হওয়া কার্বক্সিলিক অ্যাসিড। এই ফ্যাটি অ্যাসিডটির ঘনত্ব যাদের শরীরে বেশি, মশারা তাদের রক্ত পানের জন্য বেশি ব্যাকুল থাকে। এটি ঘামের সঙ্গে মিশলে মশার আকর্ষণ বহুগুণ বেড়ে যায়।
লোকমুখে প্রচলিত রয়েছে যে মিষ্টি বা নোনতা খাবার মশাকে টানে। তবে বিজ্ঞানীরা পরীক্ষা করে দেখেছেন, ‘কলা’ খাওয়ার ফলে মশার সংস্পর্শে আসার এবং কামড় খাওয়ার ঝুঁকি সত্যিই বেড়ে যায়। গর্ভাবস্থার শেষের দিকে নারীদের শরীরের তাপমাত্রা বৃদ্ধি এবং কার্বন ডাই-অক্সাইড বেশি নির্গত হওয়ার কারণে সাধারণ নারীদের তুলনায় তাঁরা দ্বিগুণ মশা আকর্ষণ করেন।
মশারা শিকার খোঁজার জন্য চোখেরও ব্যবহার করে। তারা প্রায় ১৬ থেকে ৪৯ ফুট দূর থেকেই মানুষকে দেখতে পায়। মশা সাদা বা ধূসর রঙের চেয়ে সবুজ ও কালো রঙের পোশাকের প্রতি বেশি আকৃষ্ট হয়; কারণ, এই রংগুলো তাদের দেখতে সুবিধা হয়।
—মশা কেবল বিরক্তিকরই নয়, এটি ম্যালেরিয়া, ডেঙ্গু, জিকা, ইয়েলো ফিভার, চিকুনগুনিয়া এবং ওয়েস্ট নাইলের মতো মারাত্মক রোগের বাহক।
—বাইরে বের হলে শরীর যতটা সম্ভব ঢেকে রাখা যায় এমন লম্বা হাতার জামা পরুন। মশার নজর এড়াতে কালো বা সবুজের বদলে সাদা, বেইজ বা হালকা প্যাস্টেল রঙের পোশাক বেছে নিন।
—মশা সাধারণত ভোরবেলা এবং সন্ধ্যার সময় সবচেয়ে বেশি সক্রিয় থাকে। এই সময়ে মশাপ্রবণ এলাকায় না যাওয়াই ভালো।
—বাড়ির চারপাশে যাতে পানি জমে না থাকে, সেদিকে খেয়াল রাখুন; কারণ, মশা জমে থাকা পানিতে ডিম পাড়ে। টায়ার বা প্লাস্টিকের খেলনা থেকে বৃষ্টির পানি নিয়মিত পরিষ্কার করুন। ফাউন্টেন বা পাখির স্নানের পাত্রের পানি সপ্তাহে অন্তত একবার পরিবর্তন করুন এবং ছাদের ড্রেন পরিষ্কার রাখুন।
—বারান্দার ঘাস সব সময় ছোট রাখুন। বাড়ির আঙিনায় মশা তাড়াতে সাহায্য করে এমন কিছু গাছ লাগাতে পারেন; যেমন ল্যাভেন্ডার, গাঁদা, লেমনগ্রাস, রোজমেরি, পুদিনা, তুলসী ও সেজ।
সূত্র: হেলথ লাইন, ভেরি ওয়েল মাইন্ড