বয়স বাড়ে আর আয়নায় প্রথম বয়সের ছাপ বা পাকা চুলটা আবিষ্কার করার মুহূর্তটিতে কিন্তু কারওরই মন সায় দিতে চায় না! সময়ের কাঁটা থামানো আর কাঙ্ক্ষিত তারুণ্যকে চিরতরে ধরে রাখা মানবধর্মের এই এক চিরন্তন বাসনা। কিন্তু জীববিজ্ঞানের এক অদ্ভুত নিয়মে নির্দিষ্ট সময় পর তারুণ্য একসময় ঠিকই হাতছাড়া হয়ে যায়। তবে ভেবে দেখুন তো, যদি হুট করে সেই হারানো তারুণ্যের চাবি আপনার হাতে এসে পৌঁছায়? গল্প বা রূপকথা নয়, বিজ্ঞানের নতুন এক এআই বা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ম্যাজিকে বয়স রিভার্স করার সেই স্বপ্নই এবার বাস্তবে রূপ নিতে চলেছে।
বয়স বাড়িয়ে দেওয়া সময়ের নিয়ম হলেও বিজ্ঞান যেন তাতে ব্রেক কষতে শুরু করেছে। নোবেলজয়ী শিনিয়া ইয়ামানাকার ‘ইয়ামানাকা ফ্যাক্টর’ নিয়ে গবেষণার কথা মনে আছে? চারটি জিন ব্যবহার করে কোষের বয়স কমানোর কৌশল আবিষ্কার হলেও বড় সমস্যা ছিল একটিই—কোষগুলো নিজেদের পরিচয় হারিয়ে ফেলত এবং ক্যানসারের ঝুঁকি বেড়ে যেত। তবে এবার বিজ্ঞানীরা আর পুরোনো পথে হাঁটেননি। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই (AI)-কে কাজে লাগিয়ে আবিষ্কার করেছেন এমন এক জিনের যা কোষকে ক্যানসারের ঝুঁকিতে না ফেলে এবং তার নিজস্ব পরিচয় বজায় রেখেই ফিরিয়ে আনবে তারুণ্য।
হার্ভার্ড মেডিকেল স্কুলের অধ্যাপক জর্জ চার্চ এবং ওয়াইস ইনস্টিটিউটের বিজ্ঞানী অ্যালেক্স প্লেসার নেতৃত্বে একদল গবেষক প্রথমে তৈরি করেন চমৎকার একটি এআই অ্যালগরিদম। বয়স নির্ধারণের প্রচলিত ব্যয়বহুল পদ্ধতিগুলোর বদলে এই মেশিন লার্নিং মডেলটি ৪৬৪টি ত্বকের ফাইবারোব্লাস্ট কোষের জিন এক্সপ্রেশন (জিনগত তথ্য) বিশ্লেষণ করে মানব কোষের সঠিক ‘বায়োলজিক্যাল বয়স’ মেপে ফেলে। এই ডিজিটাল বয়সের ঘড়িকে ভিত্তি করেই বিজ্ঞানীরা নির্দিষ্ট কিছু জিনের ওপর পরীক্ষা শুরু করেন, যাতে খুঁজে পাওয়া যায় বয়সের চাকা পেছনে ঘোরানোর আসল চাবিকাঠি।
হাজারো জিনের মধ্য থেকে এআই স্ক্রিনিংয়ের মাধ্যমে একটি জিন শীর্ষ স্থান দখল করে, যার নাম এসআরএসএফ ১। এটি মূলত প্রোটিন তৈরির জিনগত তথ্য প্রক্রিয়াকরণ বা ‘আরএনএ স্প্লাইসিং ফ্যাক্টর’ হিসেবে কাজ করে। বয়স্ক মানুষের ত্বকের কোষে যখন এই এসআরএসএফ ১ জিনটি সক্রিয় বা ওভার-প্রকাশ করা হলো, তখন দেখা গেল এক জাদুকরী পরিবর্তন। কোষগুলো তাদের স্থায়ী রূপ বা পরিচয় না হারিয়েই কমে গেল কোষের বয়ঃবৃদ্ধি, প্রোটিনের ভারসাম্যহীনতা এবং পুরোনো প্রদাহ। একই সঙ্গে উন্নত হলো ডিএনএ মেরামতের কাজও।
গবেষণাগারে মানব কোষে সফলতার পর বিজ্ঞানীরা আদতে দেখতে চাইলেন এর কার্যকারিতা কেমন। তারা অ্যাডেনো-অ্যাসোসিয়েটেড ভাইরাসকে ভেক্টর হিসেবে ব্যবহার করে প্রবীণ বা বয়স্ক ইঁদুরের শরীরে এসআরএসএফ ১ জিনটি প্রয়োগ করেন। জিনটি প্রধানত ইঁদুরের লিভারে জমা হলেও এর সুদূরপ্রসারী প্রভাব পড়ে পুরো শরীরে। চিকিৎসা পাওয়া ইঁদুরগুলোর বার্ধক্যজনিত শারীরিক দুর্বলতা ও অবনতির গতি ৪৪ শতাংশ পর্যন্ত কমে যায় এবং সাধারণ ইঁদুরের তুলনায় এদের গড় আয়ু ১৪ শতাংশ বৃদ্ধি পায়। বিজ্ঞানীরা ধারণা করছেন, লিভারে আসা এই পরিবর্তন বার্তা হিসেবে পুরো শরীরে ছড়িয়ে পড়ে অন্য অঙ্গগুলোর বয়স কমাতেও ভূমিকা রেখেছে।
প্রখ্যাত জার্নাল ‘নেচার এজিং’-এ প্রকাশিত এই গবেষণাটি এখনো প্রাথমিক পর্যায়ে রয়েছে। এটি বর্তমানে ল্যাবের কোষ ও ইঁদুরের মধ্যেই সীমাবদ্ধ। মানুষের শরীরে নিরাপদে এবং সঠিক মাত্রায় এই প্রযুক্তি পৌঁছে দেওয়া পরবর্তী বড় চ্যালেঞ্জ। তবুও গবেষকদের মতে, এটি কেবল বয়স কমানো নয়, বরং মানুষকে দীর্ঘদিন রোগমুক্ত রেখে স্বাস্থ্যকর জীবন উপহার দেওয়ার এক যুগান্তকারী পদক্ষেপ।
সূত্র: নেচার এজিং, হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের ওয়াইস ইনস্টিটিউট