বাতাস যেখানে ইতিহাসের দীর্ঘশ্বাস বয়ে নিয়ে বেড়ায়, আর পাথরে পাথরে জমে থাকে সুপ্রাচীন সভ্যতার স্মৃতি, সেই তুরস্ক-আর্মেনিয়া সীমান্তের নিঃসঙ্গ প্রান্তরজুড়ে দাঁড়িয়ে আছে ‘আনি’ প্রত্নতাত্ত্বিক এলাকা। আরপাচাই নদীর দুই গহিন উপত্যকার মাঝে গড়ে ওঠা শতাব্দীর প্রাচীন এই ঐতিহাসিক সীমান্তে একসময় মাথা উঁচু করে বাঁচত ২৩টি পৃথক সভ্যতা। সেখানে সময়ের থাবায় ক্ষয়ে যাওয়া প্রাচীন পাথরের মাঝে আজও এক অপার্থিব সৌন্দর্যের প্রতীক হয়ে টিকে আছে ‘মেনুচেহর মসজিদ’। আনাতোলিয়ার বুকে তুর্কিদের নির্মিত প্রথম এই মসজিদ এটি।
১০৬৪ খ্রিষ্টাব্দে বাইজেন্টাইনদের থেকে আনি নগরীর পতন ঘটে সেলজুক সুলতান আল্প আরসালানের হাতে। এই জয় আনাতোলিয়া জয়ের এক ঐতিহাসিক প্রবেশদ্বার উন্মুক্ত করে দেয়। পরে সেলজুক সুলতান মালিকশাহের নির্দেশে এবং শাদ্দাদি বংশের স্থানীয় গভর্নর মেনুচেহর বিন শাবুরের তত্ত্বাবধানে ১০৭২ থেকে ১০৯২ খ্রিষ্টাব্দের মধ্যবর্তী সময়ে নির্মিত হয় এই ঐতিহাসিক মসজিদটি।
মসজিদের বাঁ পাশের দেয়ালে খোদাই করা প্রাচীন কুফি লিপির শিলালিপিতে আজও খোদিত রয়েছে সেই ঐতিহাসিক সাক্ষ্য—‘পরম করুণাময় মহান আল্লাহর নামে। আমাদের মহান অভিভাবক, আরব ও পারস্যের শাসক, পূর্ব ও পশ্চিমের অধিপতি সুলতান মালিকশাহ ইবনে আল্প আরসালানের শাসনকালে এই মসজিদ ও মিনার নির্মাণের নির্দেশ দেন মহান আমির আবু সুজা মেনুচেহর বিন শাবুর।’
আনি গ্র্যান্ড মসজিদ নামেও পরিচিত এ ঐতিহাসিক স্থাপনাটি আনাতোলিয়ায় তুর্কি-ইসলামি স্থাপত্যের প্রথম প্রোটোটাইপ বা প্রাথমিক রূপরেখা হিসেবে গণ্য করা হয়।
আনি খননকাজের প্রধান গবেষক মুহাম্মদ আরসালানের মতে, মধ্য এশিয়ার ঐতিহ্যবাহী স্থাপত্য ও সেলজুকশৈলীর এক অপূর্ব সমন্বয় ঘটেছে এতে। থার্ড আইলবিশিষ্ট এই মসজিদের ছাদের ওপর রঙিন পাথরের জ্যামিতিক নকশা এবং গম্বুজবিশিষ্ট মিহরাবের বিন্যাস সত্যিই বিস্ময়কর। পরে আনাতোলিয়ার ঐতিহাসিক ‘দিভরিগির গ্র্যান্ড মসজিদ’-এর মতো বিশ্বখ্যাত স্থাপত্যগুলোর মূল প্রেরণা ছিল এই মেনুচেহর মসজিদ।
মসজিদের অন্যতম আকর্ষণীয় দিক হলো এর অষ্টভুজাকৃতির অনন্য মিনার, যার শৈলী মধ্য এশিয়ার কারাখানিদ স্থাপত্যের কথা মনে করিয়ে দেয়। মিনারের গায়ে এখনো স্পষ্ট করে খোদাই করা আছে আরবি বর্ণে লেখা ‘আল্লাহ’ শব্দটি, যা যুগ যুগ ধরে আকাশে হেলে পড়া এক পরম বিশ্বাসের প্রতীক।
মসজিদটি শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে যে বহু সংস্কৃতি ও বহুভাষিক ঐতিহ্যের সাক্ষী ছিল, তার বড় প্রমাণ এর দেয়াল। এতে একসময় ফারসি, জর্জীয় ও আর্মেনীয় ভাষায় ১২৩৮ সালের একটি অনন্য ত্রিপক্ষীয় শিলালিপি এবং পরে ১৩১৯ সালের মঙ্গল ইলখানাতদের কর-সংক্রান্ত একটি ফরমান খোদিত ছিল।
সময়ের আবর্তে বহু ইতিহাসের সাক্ষী এই মসজিদটির ওপর দিয়ে বয়ে গেছে দুর্যোগের ঝড়। ১৮৭৭-৭৮ সালের উসমানীয়-রুশ যুদ্ধ চলাকালীন মসজিদটি ভীষণভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এর পর থেকেই ধীরে ধীরে এটি পরিত্যক্ত হয়ে পড়ে। শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে ধূসর বাতাসে ঘেরা আনি প্রান্তরে নিস্তব্ধতা গ্রাস করেছিল এই পবিত্র প্রাঙ্গণকে। প্রখ্যাত ইউনেসকো ওয়ার্ল্ড হেরিটেজের অংশ হয়েও এটি দাঁড়িয়ে ছিল এক মূক সাক্ষী হয়ে।
কিন্তু ইতিহাস কখনো হারিয়ে যায় না। ২০২২ সালে ‘সেরহাত উন্নয়ন সংস্থা’র উদ্যোগ ও অর্থায়নে মসজিদটিতে প্রথম অস্থায়ী সংস্কারকাজ সম্পন্ন করা হয়। জানালা-দরজা সুরক্ষিত করে, মেঝেতে গালিচা বিছিয়ে একে আবার ইবাদতের উপযোগী করে তোলা হয়।
দীর্ঘ শতবর্ষের নীরবতার পর যখন প্রথম আজানের ধ্বনি বাতাসের তরঙ্গে ছড়িয়ে পড়ে, তখন যেন প্রাচীন আনি নগরীর পাথরগুলোও এক অপূর্ব আধ্যাত্মিক সুখে কেঁপে ওঠে। পাঁচ ওয়াক্ত আজানের সেই আহ্বানে সেখানে ফিরে আসে হারানো প্রাণস্পন্দন।
ডেইলি সাবা অবলম্বনে