পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভা নির্বাচনে ঐতিহাসিক জয়ের পথে ভারতীয় জনতা পার্টি (বিজেপি)। এখন রাজ্যজুড়ে একটাই আলোচনার বিষয়—কে বসছেন রাজ্যের মসনদে? নির্বাচনী প্রচারণার সময় কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ একাধিকবার বলেছিলেন, ক্ষমতায় এলে বিজেপি একজন বাঙালিকেই রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব দেবে।
তবে বিজেপির কেন্দ্রীয় মন্ত্রী সুকান্ত মজুমদার একবার মন্তব্য করেছিলেন, রাজ্যের পরবর্তী মুখ্যমন্ত্রী ‘আমিষভোজী’ হবেন। মূলত তৃণমূলের প্রচারণার পাল্টা জবাব দিতেই তিনি এমন মন্তব্য করেছিলেন। এবারের নির্বাচনের বিজেপির বিরুদ্ধে তৃণমূলের একটি অস্ত্র ছিল, বিজেপি ক্ষমতায় এলে রাজ্যে মাছ-মাংস নিষিদ্ধ করা হবে।
তাই পশ্চিমবঙ্গে জয়ী হলে স্বাভাবিকভাবেই সবার নজর থাকবে সেই দিকে—মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের স্থলাভিষিক্ত কে হচ্ছেন? আর কখনো মাছ-মাংস খাওয়া হবে?
আঞ্চলিক দলগুলোর বিপরীতে বিজেপি সাধারণত নির্বাচনের আগে মুখ্যমন্ত্রী পদের জন্য কাউকে সরাসরি মুখ হিসেবে তুলে ধরে না। এবারের নির্বাচনেও তার ব্যতিক্রম ছিল না। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি ছিলেন দলের একমাত্র ‘ইউএসপি’। টানা ২০টিরও বেশি জনসভায় মোদি নিজেকে বাংলা ও বাঙালির আবেগের সঙ্গে একীভূত করার আপ্রাণ চেষ্টা করেছেন। ঝালমুড়ি খাওয়া, কালী মন্দিরে পূজা দেওয়া, ফুটবল খেলা কিংবা বাংলায় অডিও বার্তা—সব মিলিয়ে ‘ব্র্যান্ড মোদি’র ওপরই আস্থা রেখেছে বাংলা। কিন্তু এখন সরকার পরিচালনার জন্য প্রয়োজন এমন একজনকে, যিনি এই বিশাল জনরায়কে এগিয়ে নিয়ে যেতে পারবেন।
নির্বাচনী প্রচারণায় বিজেপি নারীর নিরাপত্তাকে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দিয়েছিল। সেই ধারা বজায় রাখতে দলটি একজন নারী মুখ্যমন্ত্রী নিয়োগ করতে পারে। ভারতের কোনো রাজ্যে বর্তমানে বিজেপির নারী মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে কেবল দিল্লির রেখা গুপ্ত আছেন। নারী সংরক্ষণ আইন নিয়ে দীর্ঘ রাজনৈতিক আলোচনার প্রেক্ষাপটে, বিজেপি এই সুযোগকে কাজে লাগিয়ে তাদের ‘নারী-বান্ধব’ ভাবমূর্তি উজ্জ্বল করার সুযোগ নিতে পারে। সে ক্ষেত্রে অগ্নিমিত্রা পাল কিংবা রূপা গাঙ্গুলীর নাম সামনে আসতে পারে।
উল্লেখ্য, রূপা গাঙ্গুলী বিআর চোপড়ার আইকনিক ‘মহাভারত’ ধারাবাহিকে দ্রৌপদী চরিত্রে অভিনয়ের জন্য সারা দেশে পরিচিত।
নারী মুখ্যমন্ত্রীর বাইরেও দলের অন্দরে বেশ কয়েকজনের নাম জোরালোভাবে শোনা যাচ্ছে। এর মধ্যে আছেন শুভেন্দু অধিকারী ও সমিক ভট্টাচার্য।
তৃণমূলের প্রাক্তন হেভিওয়েট নেতা এবং মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের দীর্ঘদিনের সহযোগী শুভেন্দু বর্তমানে বিজেপির সবচেয়ে শক্তিশালী প্রতিযোগী হিসেবে বিবেচিত। মেদিনীপুরসহ রাজ্যজুড়ে তাঁর বিশাল সাংগঠনিক নেটওয়ার্ক এবং তৃণমূলের দুর্বলতা সম্পর্কে তাঁর সম্যক ধারণা রয়েছে। ২০২১ সালে নন্দীগ্রামে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে হারিয়ে তিনি ‘জায়ান্ট কিলার’ হিসেবে খ্যাতি পেয়েছেন। তবে তাঁর রাজনৈতিক ক্যারিয়ারে ‘নারদা স্টিং’ অপারেশনের মতো বিতর্কিত ইস্যুগুলো এখনো আলোচনার কেন্দ্রে রয়েছে।
অন্যদিকে, সদ্য নিযুক্ত রাজ্য বিজেপি সভাপতি সমিক ভট্টাচার্য আরএসএস ঘরানার মানুষ। দলের ভেতর তিনি ‘ঐকমত্যের নির্মাতা’ হিসেবে পরিচিত। নেপথ্যে থেকে কাজ করতে অভ্যস্ত এই নেতা সামাজিক বিভিন্ন গোষ্ঠীর মধ্যে বিজেপির গ্রহণযোগ্যতা বাড়াতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছেন।
এ ছাড়া আলোচনার টেবিলে রয়েছেন নিশীথ প্রামাণিক এবং দীর্ঘদিনের ‘স্ট্রংম্যান’ দিলীপ ঘোষ।
এখন দেখার বিষয়, হাই কমান্ড সবদিক বিবেচনা করে বাংলার মসনদে কাকে বসায়। তবে এটুকু স্পষ্ট, বিজেপি এমন কাউকে খুঁজছে, যিনি মমতা-পরবর্তী বাংলায় দলের আধিপত্য সুসংহত করতে পারবেন।