আসন্ন ঈদুল আজহার আগে পশ্চিমবঙ্গের গবাদিপশুর হাটে ব্যাপক বিশৃঙ্খলা দেখা দিয়েছে। রাজ্যে নবনির্বাচিত বিজেপি সরকার গবাদিপশু জবাইয়ের ওপর কড়া আইনি বিধিনিষেধ আরোপ করায় মুসলিম ক্রেতারা গরু কেনা থেকে প্রায় বিরত থাকছেন। তবে সরকারের এই নতুন নিয়মের কারণে সবচেয়ে বেশি লোকসান ও বিপাকের মুখে পড়েছেন রাজ্যের হাজার হাজার সনাতন ধর্মাবলম্বী (হিন্দু) গবাদিপশু ব্যবসায়ী ও খামারি।
গত ১৩ মে পশ্চিমবঙ্গের নবনির্বাচিত মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর নেতৃত্বাধীন স্বরাষ্ট্র দপ্তর থেকে একটি জরুরি পাবলিক নোটিশ জারি করা হয়। ১৯৫০ সালের ‘বেঙ্গল অ্যানিমেল স্লটার কন্ট্রোল অ্যাক্ট’ এবং ২০১৮ সালের কলকাতা হাইকোর্টের একটি রায়কে হাতিয়ার করে এই নতুন নির্দেশিকা দেওয়া হয়েছে। নির্দেশনায় বলা হয়েছে—কোনো পৌরসভা বা পঞ্চায়েত সমিতির চেয়ারম্যান এবং সরকারি পশু চিকিৎসকের (ভেটেরিনারি সার্জন) যৌথ স্বাক্ষরযুক্ত ‘ফিটনেস সার্টিফিকেট’ ছাড়া কোনো গরু, বলদ বা মহিষ জবাই করা যাবে না।
এই সার্টিফিকেট কেবল তখনই দেওয়া হবে, যখন লিখিতভাবে প্রমাণিত হবে যে পশুর বয়স ১৪ বছরের বেশি এবং সেটি প্রজনন বা হালচাষের সম্পূর্ণ অনুপযুক্ত, অথবা স্থায়ীভাবে পঙ্গু ও মারাত্মক রোগে আক্রান্ত।
এ ছাড়া রাস্তাঘাট বা যেকোনো খোলামেলা স্থানে পশু কোরবানি বা জবাই করা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। কেবল প্রশাসন নির্ধারিত কসাইখানা বা স্লটার হাউসেই জবাই করা যাবে। এই নিয়ম লঙ্ঘন করলে ৬ মাসের জেল, ১ হাজার রুপি জরিমানা অথবা উভয় দণ্ডের বিধান রাখা হয়েছে।
পশ্চিমবঙ্গের মালদা, মুর্শিদাবাদ, নদীয়া, উত্তর ও দক্ষিণ ২৪ পরগনা এবং বীরভূমের মতো জেলাগুলোর কোরবানির হাটগুলো মূলত নিয়ন্ত্রণ করেন হিন্দু খামারি ও ব্যবসায়ীরা। প্রতি বছর কোরবানির ঈদকে কেন্দ্র করে তাঁরা কোটি কোটি টাকার ব্যবসা করেন। কিন্তু এবার চিত্র সম্পূর্ণ উল্টো।
ব্যবসায়ীরা জানাচ্ছেন, কোরবানির জন্য সাধারণত সুস্থ, সবল এবং ২ থেকে ৫ বছর বয়সী তরতাজা গরুর চাহিদা থাকে। কিন্তু সরকারের নতুন নিয়ম অনুযায়ী, সুস্থ গরু তো দূর, ১৪ বছরের কম বয়সী কোনো পশুই কেনাবেচা বা জবাই করা যাবে না। এই আইনি জটিলতা এবং পুলিশের হয়রানির ভয়ে মুসলিম ক্রেতারা এবার হাটে এসে গরু কিনতে চরম অনীহা প্রকাশ করছেন। অনেকে বাধ্য হয়ে ছাগল বা ভেড়ার দিকে ঝুঁকছেন।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দক্ষিণ ২৪ পরগনার এক হিন্দু খামারিকে ক্ষোভ প্রকাশ করে বলতে শোনা গেছে, আমরা সারা বছর ধরে কোরবানির বাজার ধরব বলে লাখ লাখ টাকা ধারদেনা করে গরু লালন-পালন করি। সুস্থ-সবল গরু না হলে তো কোরবানিই হয় না। এখন সরকার বলছে ১৪ বছরের বুড়ো বা পঙ্গু গরু ছাড়া কাটা যাবে না। আমাদের এই তরতাজা গরুগুলো এখন কে কিনবে? আমরা তো ঋণের দায়ে দেউলিয়া হয়ে যাব!
আরেকটি ভিডিওতে একজন হিন্দু নারীকে বলতে শোনা গেছে, আমার ৫ লাখ টাকা লোন নেওয়া। আমরা তো অনেক আগে থেকে একসঙ্গে আছি। ওদের (মুসলিম) কোরবানিটা ওদের করতে দাও। ওরা গরু না কিনলে আমাদের কী হবে?
এদিকে পরিস্থিতি আরও জটিল করে তুলেছেন হিঙ্গলগঞ্জের নতুন বিজেপি বিধায়ক রেখা পাত্র। গত শনিবার তিনি লেবুখালি এলাকায় একটি গবাদিপশুবাহী গাড়ি আটকে দাবি করেন, গরু পরিবহনের সময় গরুর ‘বার্থ সার্টিফিকেট’ বা জন্মসনদ দেখাতে হবে।
গণমাধ্যমের মুখোমুখি হয়ে রেখা পাত্র দাবি করেন, অবৈধ গবাদিপশু পাচারকারীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী। সরকারের নতুন নির্দেশিকা অনুযায়ী, ১৪ বছরের কম বয়সী কোনো গরুকে জবাই করা যাবে না।
তিনি আরও বলেন, আমাদের সরকারের নির্দেশনা অনুযায়ী, ১৪ বছরের কম বয়সী গরু জবাইয়ের ওপর কঠোর নিষেধাজ্ঞা থাকবে। যদি কাউকে অবৈধভাবে গরু পরিবহন করতে দেখা যায়, তবে আমরা তাদের আটকাব এবং গরুর ‘বার্থ সার্টিফিকেট’ বা জন্মসনদ দেখাতে বলব। কেউ যদি গরুর জন্মসনদ দেখাতে ব্যর্থ হয়, তবে আইনের প্রচলিত ধারা অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
এই মন্তব্য এবং হাটের নতুন নিয়ম নিয়ে শুরু হয়েছে তীব্র রাজনৈতিক কাদা ছোড়াছুড়ি। বিরোধী দল তৃণমূল কংগ্রেসের বিধায়ক কুণাল ঘোষ একে ‘তুঘলকি নিয়ম’ আখ্যা দিয়েছেন। তিনি বলেন, ‘আমরা মাননীয় বিধায়কের কাছে অনুরোধ করব, বিজেপির শাসনাধীন যেকোনো একটি রাজ্য থেকে গরুর নামে ইস্যু করা একটি বার্থ সার্টিফিকেট এনে দেখান। তাহলে আমাদের সবার জন্য বুঝতে সুবিধা হতো। আর বিজেপি যদি সত্যিই গরুর এমন কোনো বার্থ সার্টিফিকেট দেখাতে পারে, তবে আমাদের এটাও খতিয়ে দেখতে হবে যে এই সার্টিফিকেট দেওয়ার কর্তৃত্ব বা অধিকার কার রয়েছে!’
আইনি কড়াকড়ি এবং রাজনৈতিক টানাপোড়েনের মাঝে পড়ে পশ্চিমবঙ্গের গবাদিপশুর অর্থনীতি এখন ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে। একদিকে মুসলিম সম্প্রদায়ের ধর্মীয় আচার পালনে তৈরি হয়েছে অনিশ্চয়তা, অন্যদিকে অবিক্রীত পশুর বিশাল বহর নিয়ে দিশেহারা হয়ে পড়েছেন সনাতন ধর্মাবলম্বী খামারিরা।