গণতান্ত্রিক বিশ্বে বিদেশি গুপ্তচরদের জন্য সম্ভবত সবচেয়ে নিরাপদ পরিবেশ হিসেবে পরিচিত হওয়ার আট দশক পর, জাপান এখন নিজেদের ইন্টেলিজেন্স ও কাউন্টার ইন্টেলিজেন্স সক্ষমতা গড়ে তুলতে দ্রুত পদক্ষেপ নিচ্ছে। দেশটিতে বহু ক্ষেত্রে গুপ্তচরবৃত্তি কৌশলগতভাবে এখনও অবৈধ নয়।
রাশিয়ার ইউক্রেন যুদ্ধের জন্য প্রযুক্তি সংগ্রহে জাপান রুশ গুপ্তচরদের অভয়ারণ্যে পরিণত হয়েছে বলে সাম্প্রতিক সময়ে প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছে। এসব প্রতিবেদন এমন এক সময় সামনে এসেছে যখন টোকিও দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ-পরবর্তী সময়ের সবচেয়ে বড় নিরাপত্তা ও গোয়েন্দা কাঠামো পুনর্বিবেচনার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে।
তাহলে কীভাবে জাপান গুপ্তচরদের জন্য এত সহজ লক্ষ্যবস্তু হয়ে উঠল? আর এখন কি দেশটি সেই দুর্বলতা কাটিয়ে উঠতে পারবে?
আন্তর্জাতিক গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর জন্য দীর্ঘদিন ধরেই জাপানকে একটি ‘সহজ লক্ষ্য’ হিসেবে বিবেচনা করা হতো। ইউক্রেনে রাশিয়ার পূর্ণমাত্রার আগ্রাসনের পর পশ্চিমা দেশগুলো থেকে বিপুলসংখ্যক রুশ গোয়েন্দা কর্মকর্তাকে বহিষ্কার করা হলে তাঁদের অনেকেই জাপানে সক্রিয় হতে শুরু করেন।
জাপানি সংবাদমাধ্যম নিক্কেই বিজনেস ২০২২ সালের আগস্টে জানায়, জাপানে প্রায় ১২০ জন রুশ গোয়েন্দা কর্মকর্তা সক্রিয় ছিলেন। এর আগে জাপানি পুলিশ প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানের কর্মীদের সতর্ক করেছিল যে রুশ গোয়েন্দারা তাঁদের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করছে। নিক্কেই ও জিজি প্রেস উদ্ধৃত সূত্রগুলোর মতে, টোকিওতে রাশিয়ার বাণিজ্য প্রতিনিধিদলের একটি জ্যেষ্ঠ পদে সবসময়ই রুশ গোয়েন্দা সংস্থা এসভিআর–এর একজন কর্মকর্তা থাকেন। এসভিআর সোভিয়েত ইউনিয়নের গোয়েন্দা সংস্থার বিদেশ বিভাগের উত্তরসূরি।
চলতি বছরের জানুয়ারিতে টোকিও মেট্রোপলিটন পুলিশের পাবলিক সিকিউরিটি ব্যুরো জানায়, একটি জাপানি মেশিন-টুল প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠানের এক কর্মী একটি সন্দেহভাজন এসভিআর অপারেটিভের কাছে বাণিজ্যিক গোপন তথ্য সরবরাহ করছিলেন। ওই সন্দেহভাজন ব্যক্তি ইতোমধ্যে জাপান ছেড়ে চলে গেছেন।
এরপর ১২ জুলাই মার্কিন সংবাদমাধ্যম নিউইয়র্ক টাইমসে প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে জাপানকে ‘গুপ্তচরদের আখড়া’ তুলে ধরা হয়। প্রতিবেদনে বলা হয়, রাশিয়ার রাষ্ট্র-নিয়ন্ত্রিত সংখ্যাগরিষ্ঠ মালিকানাধীন বিমানসংস্থা অ্যারোফ্লটের টোকিও অফিসকে কেন্দ্র করে ইউক্রেন যুদ্ধে ব্যবহারের জন্য প্রযুক্তি সংগ্রহের একটি রুশ নেটওয়ার্ক পরিচালিত হচ্ছিল।
সোমবার জাপানের প্রধান সরকারি মুখপাত্র মিনোরু কিহারা এই বিষয়ে মন্তব্য করতে অস্বীকৃতি জানান। তবে তিনি স্বীকার করেন, ‘দ্রুত পরিবর্তনশীল নিরাপত্তা পরিবেশে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য চুরিসহ আমাদের জাতীয় নিরাপত্তাকে হুমকির মুখে ফেলা বিদেশি তথ্য-সংগ্রহ কার্যক্রম মোকাবিলার প্রয়োজনীয়তা ক্রমেই বাড়ছে।’
জাপানের আধুনিক রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও আইনি কাঠামোর অনেক কিছুর মতোই এর শিকড় নিহিত রয়েছে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের আগে ও যুদ্ধ চলাকালে ভিন্নমত দমনের নির্মম অভিজ্ঞতায়। যুদ্ধ পরবর্তী সংবিধানে যোগাযোগের গোপনীয়তা এবং মতপ্রকাশের স্বাধীনতা নিশ্চিত করা হয়। এর সঙ্গে নাগরিক সমাজের দীর্ঘদিনের ঐকমত্য মিলিয়ে রাষ্ট্রের অনুমোদিত নজরদারির পরিধি অত্যন্ত সীমিত হয়ে পড়ে।
ফলে সামরিক বাহিনীর সদস্য ও প্রতিরক্ষা ঠিকাদারদের জন্য প্রযোজ্য বিধান ছাড়া জাপানে কার্যত গুপ্তচরবৃত্তিবিরোধী কোনো আইন নেই। গুপ্তচরবৃত্তির একাধিক বিব্রতকর মামলায় দোষীদের তুলনামূলকভাবে হালকা শাস্তি দেওয়ার পর ১৯৮৫ সালে একটি গুপ্তচরবিরোধী আইন আনার চেষ্টা হয়েছিল। সেই আইনে সর্বোচ্চ শাস্তি হিসেবে মৃত্যুদণ্ডের বিধানও ছিল। কিন্তু ব্যাপক জনবিরোধিতার মুখে উদ্যোগটি ভেস্তে যায়।
পরে ‘স্পেশালি ডেজিগনেটেড সিক্রেটস অ্যাক্ট’ নিয়েও প্রবল বিরোধিতা হয়। তারপরও ২০১৩ সালে জাপানের পার্লামেন্ট ডায়েট আইনটি পাস করে। এর সবচেয়ে কঠোর বিধান ছিল রাষ্ট্রের গোপন তথ্য ফাঁস করলে সর্বোচ্চ ১০ বছরের কারাদণ্ড। কিন্তু চলতি বছরের জানুয়ারিতে মেশিন-টুল প্রতিষ্ঠানের প্রকৌশলীকে ব্যবহার করে তথ্য সংগ্রহের ঘটনাটি এই আইনের সীমাবদ্ধতাও প্রকাশ করে দেয়। কারণ পুলিশ মামলাটি গুপ্তচরবৃত্তি হিসেবে নয়, অন্যায্য প্রতিযোগিতা সংক্রান্ত অপরাধ হিসেবে কৌঁসুলিদের কাছে পাঠায়।
দীর্ঘদিন ধরে দেশ-বিদেশে প্রচলিত ধারণা ছিল, যুদ্ধ পরবর্তী জাপানের উল্লেখযোগ্য কোনো গুপ্তচর সক্ষমতা বা গোয়েন্দা সংস্থা নেই। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্রের ন্যাশনাল সিকিউরিটি এজেন্সির (এনএসএ) এর সাবেক ঠিকাদার ও হুইসেলব্লোয়ার এডওয়ার্ড স্নোডেনের ফাঁস করা নথি সেই ধারণা বদলে দেয়। স্নোডেন ২০০৯ থেকে ২০১২ সাল পর্যন্ত জাপানে অবস্থিত একটি মার্কিন সামরিক ঘাঁটিতে এনএসএ-এর ঠিকাদার হিসেবে কাজ করেছিলেন।
তাঁর ফাঁস করা নথি থেকে জানা যায়, জাপানের ডাইরেক্টরেট ফর সিগন্যালস ইন্টেলিজেন্স (ডিএফএস) ১৯৫০-এর দশক থেকেই এনএসএ-এর সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সহযোগিতায় কাজ করে আসছে। পরে ২০১৭ ও ২০১৮ সালে জাপানের সরকারি সম্প্রচারমাধ্যম এনএইচকে, অনুসন্ধানী সংবাদমাধ্যম দ্য ইন্টারসেপ্টের সহযোগিতায় তদন্ত চালিয়ে জানায়, অন্তত ছয়টি স্থাপনায় প্রায় ১ হাজার ৭০০ জন কর্মী দিনরাত ফোনকল ও ডিজিটাল যোগাযোগে আড়িপাতার কাজ করছেন।
এসব কার্যক্রমের প্রতিবেদন কেবল তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী এবং তাঁর ঘনিষ্ঠ অভ্যন্তরীণ মহলের কাছেই দেওয়া হয়। সংস্থাটির সদরদপ্তর টোকিওর কেন্দ্রস্থল ইচিগায়া এলাকায় প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের কমপ্লেক্সের ভেতরে অবস্থিত সাধারণ দেখতে একটি ভবনে, যার পরিচিতি সি১ নামে। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এনএসএ এবং ডিএফএস-এর সহযোগিতা আরও গভীর হয়েছে। জাপানের মাটিতে এনএসএ অন্তত তিনটি বড় নজরদারি কেন্দ্র পরিচালনা করে। এর মধ্যে ওকিনাওয়ার একটি নজরদারি স্টেশনের ব্যয়ের জন্য জাপান প্রায় ৫০ কোটি ডলার প্রদান করেছে।
এর বিনিময়ে এনএসএ জাপানি গোয়েন্দাদের প্রশিক্ষণ দিয়েছে এবং এক্সকিস্কোরের মতো ব্যাপক ইন্টারনেট নজরদারি প্রযুক্তিও সরবরাহ করেছে বলে স্নোডেনের ফাঁস করা নথিতে উল্লেখ রয়েছে।
জাপানের প্রধানমন্ত্রী সানায়ে তাকাইচির সরকার পার্লামেন্টে নিজেদের শক্তিশালী সংখ্যাগরিষ্ঠতা এবং জাপান যে এখন বাস্তব ভূরাজনৈতিক হুমকির মুখোমুখি, সেই উপলব্ধিকে কাজে লাগিয়ে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ-পরবর্তী সময়ের প্রথম বড় গোয়েন্দা সংস্কার কার্যক্রম এগিয়ে নিচ্ছে। গত মে মাসে পাস হওয়া ন্যাশনাল ইন্টেলিজেন্স কাউন্সিল এস্টাবলিশমেন্ট অ্যাক্টের মাধ্যমে প্রধানমন্ত্রীর নেতৃত্বে একটি ন্যাশনাল ইন্টেলিজেন্স কাউন্সিল এবং ৭০০ সদস্যের ন্যাশনাল ইন্টেলিজেন্স ব্যুরো (এনআইবি) গঠন করা হয়েছে। এই নতুন সংস্থা আগে বিচ্ছিন্নভাবে পরিচালিত বিভিন্ন গোয়েন্দা কার্যক্রমকে একত্রিত করবে।
এনআইবি-কে বিশেষভাবে পাল্টা গুপ্তচর (কাউন্টার ইন্টেলিজেন্স) কার্যক্রমের তদারকির দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি, জাপানে সক্রিয় বিদেশি গোয়েন্দা অপারেটিভদের লক্ষ্য করে নতুন আইন ২০২৬ সালের শেষ নাগাদ সংসদে উত্থাপন করা হবে বলে প্রত্যাশা করা হচ্ছে। ডিএফএস নতুন ব্যুরোর সঙ্গে গোয়েন্দা তথ্য ভাগাভাগি করবে, তবে নিজস্ব কাঠামোতে আলাদাভাবে কাজ চালিয়ে যাবে।
সবচেয়ে যুগান্তকারী পদক্ষেপ হতে যাচ্ছে একটি নতুন বিদেশি গোয়েন্দা সংস্থা প্রতিষ্ঠা, যা অনেকটা যুক্তরাষ্ট্রের সিআইএ বা যুক্তরাজ্যের এমআই৬-এর সমতুল্য হবে। পরিকল্পনা অনুযায়ী, সংস্থাটি ২০২৮ সালের শুরুর দিকেই কার্যক্রম শুরু করবে।
তথ্যসূত্র: দ্য গার্ডিয়ান