শীতকালে যখন আমরা কাঁচা খেজুরের রস আর পিঠা-পুলির উৎসবে মেতে উঠি, ঠিক তখনই এক অদৃশ্য ঘাতক আমাদের দোরগোড়ায় কড়া নাড়ে। একজন চিকিৎসক এবং সেই সঙ্গে অণুজীববিজ্ঞানী হিসেবে এই ভাইরাসের ভয়াবহতা আমাদের শিহরিত করে। তাই নিপাহ ভাইরাস সম্পর্কে বিভিন্ন তথ্য এবং এর থেকে বাঁচার উপায়গুলো সম্পর্কে আমাদের জেনে রাখা খুব গুরুত্বপূর্ণ।
নিপাহ ভাইরাস একটি পরিচিত, কিন্তু ভয়ংকর এক নাম। নিপাহ একটি ‘জুনাটিক’ ভাইরাস, অর্থাৎ এটি প্রাণী থেকে মানুষের দেহে ছড়ায়। ১৯৯৮ সালে মালয়েশিয়ায় প্রথম এই ভাইরাসের প্রাদুর্ভাব দেখা দিলেও বাংলাদেশে এর উপস্থিতি ধরা পড়ে ২০০১ সালে, মেহেরপুরে। তারপর থেকে প্রায় প্রতিবছর শীতকালে দেশের বিভিন্ন স্থানে নিপাহ ভাইরাসের সংক্রমণ দেখা দেয়।
এর ভয়াবহতার প্রধান কারণ হলো উচ্চ মৃত্যুহার। এক পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, আক্রান্ত ব্যক্তির মৃত্যুর হার ৪০ থেকে ৭৫ শতাংশ পর্যন্ত হয়, যা অনেক ক্ষেত্রে ইবোলার চেয়ে বিপজ্জনক।
সংক্রমণের উৎস ও বিস্তার
নিপাহ ভাইরাসের প্রধান বাহক হলো ‘টেরোপাস’ প্রজাতির বাদুড়, যা আমাদের দেশে বড় বাদুড় বা গেছো বাদুড় নামে পরিচিত।
এই বাদুড় যখন খেজুরগাছে হাঁড়ি থেকে রস খাওয়ার চেষ্টা করে, তখন তাদের লালা, প্রস্রাব বা মল রসের সঙ্গে মিশে যায়। সেই কাঁচা রস যখন মানুষ পান করে, তখন ভাইরাসটি সরাসরি মানুষের শরীরে ঢোকে। তবে সংক্রমণটি এখানেই থেমে থাকে না। এটি অত্যন্ত সংক্রামক এবং মানুষ থেকে মানুষে ছড়িয়ে পড়তে পারে। আক্রান্ত রোগীর সেবা প্রদানকারী আত্মীয়স্বজন বা স্বাস্থ্যকর্মীরা সঠিক সুরক্ষাব্যবস্থা না নিলে খুব সহজে সংক্রমিত হতে পারেন।
উপসর্গ
ভাইরাসটি শরীরে প্রবেশের ৫ থেকে ১৪ দিন পর উপসর্গ দেখা দিতে শুরু করে। তবে শুরুতে এটি সাধারণ জ্বরের মতো মনে হতে পারে:
কিন্তু দ্রুতই এটি ভয়াবহ রূপ নেয় এবং মস্তিষ্কে প্রদাহ কিংবা ‘এনসেফালাইটিস’ সৃষ্টি করে। এতে রোগীর মানসিক বিভ্রান্তি, খিঁচুনি হতে পারে এবং একপর্যায়ে রোগী কোমায়ও হয়তো চলে যায়। মাইক্রোবায়োলজিস্ট হিসেবে আমরা যখন রোগীর লালা বা রক্ত পরীক্ষা করি, তখন আরটি-পিসিআর পদ্ধতিতে ভাইরাসের জেনেটিক ম্যাটেরিয়াল শনাক্তের চেষ্টা করি। এটি অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ কাজ। কারণ, সামান্য অসাবধানতায় নিজেরাও আক্রান্ত
হয়ে পড়তে পারি।
ল্যাবরেটরিতে রোগনির্ণয় একটি চ্যালেঞ্জ
নিপাহ ভাইরাস শনাক্তকরণে বিএসএল-৪মানের ল্যাবরেটরির প্রয়োজন হয়, যা অত্যন্ত ব্যয়বহুল এবং বিরল। তবে বাংলাদেশে আইইডিসিআর খুব দক্ষতার সঙ্গে এ রোগ শনাক্তে কাজ করছে। দ্রুত রোগনির্ণয় এবং রোগীকে আলাদা করা না গেলে মহামারি ঠেকানো অসম্ভব হয়ে পড়ে।
প্রতিকারের চেয়ে প্রতিরোধ শ্রেষ্ঠ
এখন পর্যন্ত নিপাহ ভাইরাসের কোনো কার্যকর ভ্যাকসিন কিংবা সুনির্দিষ্ট অ্যান্টিভাইরাল ওষুধ আবিষ্কৃত হয়নি। তাই প্রতিরোধ করার কোনো বিকল্প নেই।
এ বিষয়ে কিছু পরামর্শ হলো—
কাঁচা খেজুরের রসকে ‘না’ বলুন: শীতকালীন ঐতিহ্য হলেও কাঁচা খেজুরের রস পান একদম বন্ধ করতে হবে। আপনাকে রস যদি পান করতেই হয়, তাহলে ৭০ ডিগ্রি সেলসিয়াসের বেশি তাপমাত্রায় সেই রস ভালো করে ফুটিয়ে নিতে হবে।
বাদুড়ের খাওয়া ফল বর্জন: গাছে থাকা অবস্থায় কোনো ফল বাদুড় বা পাখি খেয়ে থাকলে তা খাওয়া যাবে না। বিশেষ করে লিচু, বরই বা আম পড়ার পর তা ভালো করে না ধুয়ে খাবেন না।
রোগীর সেবায় সতর্কতা: আক্রান্ত রোগীর পরিচর্যার সময় মাস্ক এবং গ্লাভস ব্যবহার অবশ্যই নিশ্চিত করতে হবে। রোগীর ব্যবহৃত পোশাক ও বিছানা আলাদাভাবে পরিষ্কার করতে হবে।
হাত ধোয়ার অভ্যাস: সাবান দিয়ে নিয়মিত হাত ধোয়া নিপাহসহ যেকোনো ভাইরাস প্রতিরোধের সবচেয়ে সহজ এবং কার্যকর উপায়।
জনসচেতনতা: গ্রামীণ এলাকায়, বিশেষ করে যেখানে খেজুরের রস সংগ্রহ করার আধিক্য বেশি, সেখানে মাইকিং এবং লিফলেট প্রচারের মাধ্যমে মানুষকে অবশ্যই সচেতন করতে হবে।
নিপাহ ভাইরাস আমাদের শীতের আনন্দ কেড়ে নিতে পারে নিমেষে। এই ভাইরাস শুধু একটি স্বাস্থ্য সমস্যা নয়, এটি আমাদের অসচেতনতার ফল। মাইক্রোবায়োলজিস্টরা গবেষণাগারে দিনরাত কাজ করে চলেছেন এই ভাইরাসের চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য বোঝার জন্য; কিন্তু সাধারণ মানুষের সচেতনতা ছাড়া এই যুদ্ধ জয় করা মোটেই সম্ভব নয়। মনে রাখা জরুরি, এক গ্লাস কাঁচা খেজুরের রস আপনার কিংবা আপনার প্রিয়জনের জীবনের শেষ পানীয় হতে পারে। তাই সতর্ক হোন, সুস্থ থাকুন।
চিকিৎসকের পরামর্শ: ডা. কাকলী হালদার, এমবিবিএস, এমডি সহকারী অধ্যাপক, মাইক্রোবায়োলজি বিভাগ ঢাকা মেডিকেল কলেজ