তুরস্কের রাজধানী আঙ্কারার মাঠ। বিস্তীর্ণ দুর্গম এলাকা। হাতে সময় খুবই কম। তবু থামেনি গ্রিন ইউনিভার্সিটি অব বাংলাদেশের (জিইউবি) মার্স রোভার দল ‘ক্ল্যাডোস’। দেড় বছরের প্রস্তুতি শেষে তুরস্কে গিয়ে প্রতিযোগিতার মুখোমুখি হয় দলটি।
শেষ পর্যন্ত সেই লড়াইয়ে এসেছে বড় সাফল্য। আন্তর্জাতিক স্পেস রোবোটিকস প্রতিযোগিতা অ্যানাটোলিয়ান রোভার চ্যালেঞ্জ (এআরসি) ২০২৬-এ এশিয়ার দলগুলোর মধ্যে প্রথম এবং বিশ্বে ষষ্ঠ হয়েছে গ্রিন ইউনিভার্সিটির দল। প্রতিযোগিতাজুড়ে অধ্যবসায়, প্রতিকূল পরিস্থিতিতে মনোবল, সমস্যা সমাধানের দক্ষতা এবং দলগত চেতনার স্বীকৃতি হিসেবে দলটির হাতে উঠেছে ‘মোস্ট রেজিলিয়েন্ট টিম’ সম্মাননা।
গত ২৯ জুলাই থেকে ২ আগস্ট আঙ্কারায় বসে এআরসি ২০২৬-এর বিশ্ব চূড়ান্ত পর্ব। তুরস্কের স্পেস এক্সপ্লোরেশন সোসাইটি এবং স্পেস এজেন্সির সহযোগিতায় আয়োজন করে এই প্রতিযোগিতা। বিশ্বের বিভিন্ন দেশের বিশ্ববিদ্যালয় ও গবেষণাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীরা এতে অংশ নেন। চূড়ান্ত পর্বে ওঠার পথটিও সহজ ছিল না। বিশ্বের ৪০টি বিশ্ববিদ্যালয়ের দলের সঙ্গে প্রতিযোগিতা করে ২০টি দলের মধ্যে জায়গা করে নেয় গ্রিন ইউনিভার্সিটির দল। যোগ্যতা পর্বে ‘ক্ল্যাডোস’ পায় ১০০-এর মধ্যে ৮৮ দশমিক ৪৩ নম্বর। নথি ও ভিডিও উপস্থাপনায় দলটি দেখায়, দুর্গম এলাকায় রোভার চালানো থেকে শুরু করে নির্দিষ্ট স্থানে পেলোড পৌঁছে দেওয়া পর্যন্ত বিভিন্ন কাজের সক্ষমতা। প্যানেল সার্ভিসিং, স্বয়ংক্রিয় চলাচল এবং মাটির নমুনা পরীক্ষা করে বায়োমলিকিউল শনাক্ত করার দক্ষতাও দেখানো হয়। চূড়ান্ত পর্বে ছিল নাইট, অটোনমাস নেভিগেশন, সায়েন্স অ্যান্ড কোলাবোরেশন মিশন। প্রতিটি মিশনে ছিল নতুন পরীক্ষা, সময়ের চাপ আর কারিগরি সমস্যার ঝুঁকি।
গ্রিন ইউনিভার্সিটি মার্স রোভার দলের যাত্রা শুরু ‘লোটাস’ দিয়ে। ২০২৫ সালের এআরসিতে অংশ নিতে দলের প্রতিষ্ঠাতা সদস্যরা মাত্র দুই মাসে তৈরি করেছিলেন প্রথম রোভার। সেই অভিজ্ঞতাই পরে কাজে লাগে দ্বিতীয় প্রজন্মের রোভার তৈরিতে। নতুন রোভারটির নাম ‘ক্ল্যাডোস’। শাখার ধারণা থেকে নামটির ভাবনা আসে। দলের সদস্য, শিক্ষক, সাবেক সদস্য ও পৃষ্ঠপোষকদের মতের ভিত্তিতে এই নাম চূড়ান্ত করা হয়। ক্ল্যাডোস তৈরির পেছনে কাজ করেছেন ইলেকট্রিক্যাল অ্যান্ড ইলেকট্রনিক ইঞ্জিনিয়ারিং (ইইই), কম্পিউটার সায়েন্স অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং (সিএসই) এবং সফটওয়্যার ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের শিক্ষার্থীরা। পুরো দলটি ভাগ হয়েছিল সাতটি বিশেষায়িত উপদলে। কেউ কাজ করেছেন যন্ত্রের নকশায়, কেউ বৈদ্যুতিক ব্যবস্থায়। কেউ সফটওয়্যার ও স্বয়ংক্রিয় পরিচালনায়, কেউ বিজ্ঞান ও ব্যবস্থাপনায়। দলের মেন্টর ও গ্রিন ইউনিভার্সিটির ফ্যাকাল্টি অব সায়েন্স অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের রিসার্চ ইঞ্জিনিয়ার আবদুল্লাহ-আল মাসুদ প্রকল্পটির সমন্বয় এবং কৌশলগত দিকনির্দেশনা দেন। ইইই বিভাগের সহকারী অধ্যাপক সৌরভ বড়ুয়া এবং এম এম নওশাদ আলী ছিলেন দলের উপদেষ্টা। তাঁরা লজিস্টিকসসহ সাংগঠনিক কাজে সহযোগিতা করেন।
রোভার বানানোর স্বপ্ন ছিল। সেই স্বপ্ন বাস্তবায়নের পথে ছিল বিভিন্ন বাধা। দল গঠনই ছিল প্রথম বড় চ্যালেঞ্জ। রোভার তৈরির অনেক প্রযুক্তিও বাংলাদেশে সহজে পাওয়া যায় না। দলের মেন্টর আবদুল্লাহ-আল মাসুদ বলেন, ‘দল গঠনই ছিল আমাদের প্রথম বড় চ্যালেঞ্জ। রোভার তৈরিতে প্রয়োজনীয় অনেক প্রযুক্তিও বাংলাদেশে সহজে পাওয়া যায় না। অর্থায়নও ছিল বড় সমস্যা।’ বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ের গবেষণায় সরকারি সহায়তা বাড়ানোর ওপর জোর দেন তিনি। তাঁর মতে, এতে প্রযুক্তি, প্রকৌশল ও উদ্ভাবনে বাংলাদেশের অবস্থান আরও শক্তিশালী হবে। দলের আর্থিক পৃষ্ঠপোষকতায় সহযোগিতার জন্য ইউএস-বাংলা এয়ারলাইনসকেও ধন্যবাদ জানান তিনি।
তুরস্কের প্রতিযোগিতায় দলের হয়ে মাঠে ছিলেন ছয়জন শিক্ষার্থী। তাঁদের মধ্যে স্টুডেন্ট টিম লিড রেজওয়ান ইনতেসার এবং ম্যানেজমেন্ট সাব-টিম লিড শাহরিয়ার বিন সালাম শিক্ষার্থী পর্যায়ের নেতৃত্ব দেন। তুরস্কে দলের হয়ে অংশ নেন সফটওয়্যার অ্যান্ড অটোনমাস সাব-টিম লিড মইনুল হাসান জিসান, মেকানিক্যাল ডিজাইন সাব-টিম লিড বিবেক দত্ত সর্গ, মেকানিক্যাল ফ্যাব্রিকেশন সাব-টিম লিড বিশাল দত্ত স্বপ্ন এবং ইলেকট্রিক্যাল সাব-টিম লিড মো. শাহরিয়ার মাহমুদ। বাংলাদেশ থেকে দলের কাজে যুক্ত ছিলেন মিডিয়া অ্যান্ড ব্র্যান্ডিং সাব-টিম লিড সাফি আলম এবং সায়েন্স সাব-টিম লিড মোছা. আফরিন আক্তার ইমাসহ অন্য সদস্যরা। তুরস্কে যাওয়ার পরও দলের কাজ থামেনি; বরং সময় তখন আরও কমে আসে। রেজওয়ান ইনতেসার বলেন, ‘আমাদের এই ফল আসে শৃঙ্খলাবদ্ধভাবে কাজ করায়। পূর্ণাঙ্গ মাঠপরীক্ষা ছাড়াই ছয়জন সদস্যকে
১৫ থেকে ২০ জনের সমান দায়িত্ব পালন করতে হয়েছে। কারিগরি ত্রুটি ও কঠিন ভূখণ্ডের মধ্যেও আমরা প্রতিটি মিশন শেষ করেছি।’
প্রতিযোগিতার মাত্র কয়েক দিন আগে ভিসা হাতে পান দলের সদস্যরা। ম্যানেজমেন্ট সাব-টিম লিড শাহরিয়ার বিন সালাম বলেন, ‘গত ২৬ জুলাই ভিসা পাই। এরপর কয়েক ঘণ্টার মধ্যে সবকিছু গুছিয়ে ২৮ জুলাই রাতে তুরস্কে পৌঁছাই।’ সেখানেও আমাদের বিশ্রামের সুযোগ ছিল কম। ‘সারা রাত জেগে রোভারটি সংযোজন করি। পরদিন সেটি উপস্থাপন করি এবং ওই সন্ধ্যায় প্রতিযোগিতায় অংশ নিই।’
প্রায় এক সপ্তাহ পর্যাপ্ত ঘুম ছাড়াই কাজ করতে হয়েছে তাঁদের। ক্লান্তি আর চাপ থাকা সত্ত্বেও একমুহূর্তের জন্য কাজ থামেনি। শেষ পর্যন্ত সেই দৃঢ়তার ফল মিলেছে বিশ্বমঞ্চে।
এই সাফল্যের পেছনে আছে দীর্ঘ প্রস্তুতি। ২০২৫ সালের প্রতিযোগিতার অভিজ্ঞতা থেকে নতুন করে পরিকল্পনা নেয় দলটি। এরপর দেড় বছর ধরে চলে নকশা, পরীক্ষা, সংশোধন আর প্রস্তুতি। রেজওয়ান ইনতেসার বলেন, ‘দেড় বছরের অক্লান্ত পরিশ্রম, বিভিন্ন অনিশ্চয়তা এবং পৃষ্ঠপোষকদের সহযোগিতা আমাদের এই জায়গায় এনেছে।’ তুরস্কের মাঠে প্রথমবার রোভার নিয়ে দাঁড়ানোর মুহূর্তটি তাঁর কাছে ছিল আবেগের। তবে সেই মুহূর্তের পেছনে ছিল দেড় বছরের নিরলস পরিশ্রম।
গ্রিন ইউনিভার্সিটির এই দলের কাজের সঙ্গে জড়িয়ে আছে গবেষণার ভাবনাও। দলের মডারেটর এম এম নওশাদ আলী বলেন, ‘উচ্চশিক্ষায় উদ্ভাবনের মাধ্যমে পরিবর্তন আনতে চায় গ্রিন ইউনিভার্সিটি। শ্রেণিকক্ষের বাইরেও হাতে-কলমে গবেষণার সুযোগ তৈরি করা হচ্ছে।’ দলের উপদেষ্টা সৌরভ বড়ুয়া বলেন, ‘এই অর্জন শিক্ষার্থী, শিক্ষক ও বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের সম্মিলিত প্রচেষ্টার ফল।’ রোবোটিকস এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাকে ভবিষ্যতের গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র মনে করেন তিনি। তাঁর ভাষায়, বাংলাদেশের তরুণ প্রকৌশলীরা আন্তর্জাতিক পর্যায়ের প্রতিযোগিতায় ভালো করতে পারেন—এই সাফল্য তারই প্রমাণ।
গ্রিন ইউনিভার্সিটি অব বাংলাদেশের উপাচার্য অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ শরীফ উদ্দিন এই অর্জনে অভিনন্দন জানিয়ে বলেন, ‘আজকের এই অর্জন শুধু গ্রিন ইউনিভার্সিটির নয়, সমগ্র বাংলাদেশের। বিশ্বের অন্যতম মর্যাদাপূর্ণ স্পেস রোবোটিকস প্রতিযোগিতায় বিশ্বে ষষ্ঠ স্থান অর্জন, এশিয়ার সেরা দল হিসেবে স্বীকৃতি এবং “মোস্ট রেজিলিয়েন্ট টিম” সম্মাননা লাভ আমাদের শিক্ষার্থীদের মেধা, অধ্যবসায় ও উদ্ভাবনী শক্তির আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি। ‘আমাদের শিক্ষার্থীরা আবারও প্রমাণ করেছে, সঠিক দিকনির্দেশনা, গবেষণাভিত্তিক শিক্ষা এবং নিরলস পরিশ্রম করলে বাংলাদেশের তরুণেরাও বিশ্বসেরাদের সঙ্গে সমানতালে প্রতিযোগিতা করতে পারে।
আমাদের মার্স রোভার টিমের প্রত্যেক সদস্য, উপদেষ্টা, শিক্ষক এবং সংশ্লিষ্ট সবাইকে আন্তরিক অভিনন্দন। এই সাফল্য ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে বিজ্ঞান, প্রযুক্তি, প্রকৌশল এবং গবেষণায় আরও এগিয়ে যেতে অনুপ্রাণিত করবে।’ উপাচার্য আরও বলেন, ‘গ্রিন ইউনিভার্সিটি অব বাংলাদেশ শুরু থেকে গবেষণা, উদ্ভাবন এবং প্রযুক্তিনির্ভর শিক্ষাকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে আসছে। আমরা বিশ্বাস করি, এই আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি শিক্ষার্থীদের জন্য নতুন সম্ভাবনার দ্বার উন্মোচন করবে। ভবিষ্যতেও বিশ্বমঞ্চে বাংলাদেশের মর্যাদা সমুন্নত রাখতে তারা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। এই সাফল্যের পেছনে উপ উপাচার্য অধ্যাপক খাওজা ইফতেখার উদ্দিন আহমেদের আন্তরিক ও গভীর সহযোগিতা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে।’ ড. মোহাম্মদ শরীফ উদ্দিন আরও বলেন, ‘এই অর্জন শুধু আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতায় সাফল্যই নয়; এটি বাংলাদেশের উচ্চশিক্ষা, প্রকৌশল শিক্ষা ও তরুণ উদ্ভাবকদের সক্ষমতার একটি শক্তিশালী আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি। গবেষণা, রোবোটিকস, উদ্ভাবন আর প্রযুক্তিনির্ভর শিক্ষার বিকাশে গ্রিন ইউনিভার্সিটি অব বাংলাদেশের দীর্ঘদিনের নিরবচ্ছিন্ন প্রচেষ্টারই গৌরবময় প্রতিফলন এই সাফল্য।’