মার্কিন সুপ্রিম কোর্টের সাম্প্রতিক ৬-৩ ব্যবধানের বিভক্ত বেঞ্চের রায় কেবল ডোনাল্ড ট্রাম্পের একটি বাণিজ্য নীতিকেই ধাক্কা দেয়নি, বরং এটি হোয়াইট হাউসের একচ্ছত্র ক্ষমতার ওপর বিচার বিভাগের এক শক্তিশালী নিয়ন্ত্রণরেখা টেনে দিয়েছে। ট্রাম্পের ‘লিবারেশন ডে’ শুল্কনীতি অবৈধ ঘোষিত হওয়ার পর বিশ্ববাণিজ্য ও মার্কিন অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে এখন প্রশ্ন—বিনিয়োগকারী ও সাধারণ মানুষের পকেট থেকে যাওয়া কোটি কোটি ডলারের ভবিষ্যৎ কী?
কেন আদালতে হারলেন ট্রাম্প?
আদালতের মূল পর্যবেক্ষণে প্রধান বিচারপতি জন রবার্টস জানিয়েছেন, ১৯৭৭ সালের ‘ইন্টারন্যাশনাল ইমার্জেন্সি ইকোনমিক পাওয়ারস অ্যাক্ট’ প্রেসিডেন্টকে কোনো দেশ বা গোষ্ঠীর সম্পদ বাজেয়াপ্ত বা নিষেধাজ্ঞা দেওয়ার ক্ষমতা দিলেও ‘শুল্ক’ বা ‘ট্যাক্স’ বসানোর ক্ষমতা দেয় না। আদালত স্পষ্ট করে বলেছেন, সংবিধানে এই ক্ষমতা একমাত্র কংগ্রেসের হাতে ন্যস্ত।
ট্রাম্পের মনোনীত তিন বিচারকের মধ্যে দুজন—অ্যামি কোনি ব্যারেট ও নিল গোরসাফ—প্রেসিডেন্টের বিপক্ষে ভোট দিয়ে আইনি নিরপেক্ষতার এক বড় নজির স্থাপন করেছেন। তাঁরা প্রধান বিচারপতি রবার্টসের সঙ্গে একমত হয়ে বলেছেন, ‘প্রেসিডেন্ট যুদ্ধের সময় বা জরুরি অবস্থার অজুহাতে জনগণের ওপর কর চাপাতে পারেন না।’
১৩০ বিলিয়ন ডলারের রিফান্ড বিতর্ক
আদালতের রায়ের পর সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে গত এক বছরে সংগৃহীত ১৩০ বিলিয়ন ডলার বা প্রায় ১০ লাখ কোটি টাকার এখন কী হবে।
তবে এই রায়ে ব্যবসায়ীদের মধ্যে স্বস্তি দেখা যাচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্রের হাজারো ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা এই রায়কে ‘বুকের ওপর থেকে ১০০০ পাউন্ডের পাথর সরে যাওয়া’র মতো মনে করছেন।
তবে টাকা ফেরতের প্রসঙ্গ আসতেই জেদ করে বসে আছেন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প। তিনি সাফ জানিয়ে দিয়েছেন, সহজে এই অর্থ ফেরত দেবেন না। লিটিগেশনের মাধ্যমে এই প্রক্রিয়াকে তিনি বছরের পর বছর ঝুলিয়ে রাখার পরিকল্পনা করছেন।
তবে এই রায়ে ভিন্নমত পোষণকারী বিচারক ব্রেট কাভানো তাঁর ৬৩ পাতার দীর্ঘ নোটে সতর্ক করেছেন, এই রিফান্ড প্রক্রিয়া একটি ‘বিরাট বিশৃঙ্খলা’ তৈরি করবে। কারণ, অনেক ব্যবসায়ী ইতিমধ্যে শুল্কের খরচ পণ্যের দাম বাড়িয়ে সাধারণ ক্রেতাদের থেকে তুলে নিয়েছেন। এখন রিফান্ড দিলে তা ব্যবসায়ীদের জন্য ‘ডাবল প্রফিট’ হবে কি না, তা নিয়ে বিতর্ক তৈরি হয়েছে।
সেকশন ১২২: নতুন অস্ত্র শাণাচ্ছেন ট্রাম্প
সুপ্রিম কোর্টের রায়ের কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই ট্রাম্প ১৯৭৪ সালের ট্রেড অ্যাক্টের ‘সেকশন ১২২’ প্রয়োগ করেছেন। তিনি এরই মধ্যে সব দেশের ওপর হরেদরে ১০ শতাংশ শুল্ক আরোপের আদেশে স্বাক্ষর করেছেন এবং বলেছেন, শিগগির এই আদেশ কার্যকর হবে। সামনে আরও বিকল্প নিয়ে তিনি ভাবছেন বলেও জানিয়েছেন। এই আইনের আশ্রয় কেন নিলেন ট্রাম্প—
১. ক্ষমতার সীমা: এই আইনে ট্রাম্প সর্বোচ্চ ১৫ শতাংশ পর্যন্ত শুল্ক বসাতে পারেন।
২. সময়সীমা: এটি কেবল ১৫০ দিনের জন্য কার্যকর থাকে। এরপর এটি চালিয়ে নিতে হলে কংগ্রেসের ভোটাভুটির প্রয়োজন হবে।
৩. উদ্দেশ্য: ট্রাম্প এটিকে আমেরিকার ‘ব্যালেন্স অব পেমেন্ট’ বা বাণিজ্যিক ঘাটতি কমানোর মোক্ষম অস্ত্র হিসেবে দাবি করছেন।
বিশ্ববাজারের প্রতিক্রিয়া
২৪ ফেব্রুয়ারি থেকে কার্যকর হতে যাওয়া এই নতুন ১০ শতাংশ শুল্ক থেকে ভারত, ব্রিটেন ও ইউরোপীয় ইউনিয়ন রেহাই পাচ্ছে না। তার মানে হলো, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাণিজ্য চুক্তি হলেও তাদের পণ্য এখন এই নতুন শুল্কের আওতায় পড়বে। হোয়াইট হাউস জানিয়েছে, মিত্রদেশগুলোর সঙ্গে আগে হওয়া বাণিজ্য চুক্তিগুলোর চেয়ে এই নতুন ‘গ্লোবাল ট্যারিফ’ বেশি গুরুত্ব পাবে। তবে ইউএসএমসিএ চুক্তির কারণে কানাডা ও মেক্সিকো আপাতত বড় ক্ষতির হাত থেকে বেঁচে যাচ্ছে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, ট্রাম্পের এই পাল্টা চাল মার্কিন অর্থনীতিতে মূল্যস্ফীতির ঝুঁকি আরও বাড়িয়ে দিতে পারে। ফেব্রুয়ারি মাসের শেষে এই নতুন শুল্ক চালুর পর মার্কিন বাজার এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে কী ধরনের অস্থিরতা তৈরি হয়, এখন সেদিকেই তাকিয়ে আছে বিশ্ব।