বোয়িং ৭৮৭ ড্রিমলাইনারকে বিমানশিল্পের সবচেয়ে উদ্ভাবনী ও নিরাপদ উড়োজাহাজগুলোর একটি হিসেবে বিবেচনা করা হয়। তবে বিমানটির রয়েছে একাধিক ভয়াবহ দুর্ঘটনার রেকর্ড। গত বছরের ১২ জুন ভারতের আহমেদাবাদ থেকে লন্ডনগামী এয়ার ইন্ডিয়ার একটি ফ্লাইট উড্ডয়নের মাত্র ৩০ সেকেন্ডের মাথায় ৬২৫ ফুট উচ্চতা থেকে সরাসরি আবাসিক এলাকায় বিধ্বস্ত হয়। ওই দুর্ঘটনায় অন্তত ২৪১ জন যাত্রী ও ক্রু নিহত হন। দুর্ঘটনার সঠিক কারণ এখনো অস্পষ্ট। তবে এই মর্মান্তিক ঘটনার পর বোয়িংয়ের এই জনপ্রিয় উড়োজাহাজের নিরাপত্তা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন ওঠে।
দুর্ঘটনার আগে পর্যন্ত ৭৮৭ ড্রিমলাইনার দীর্ঘ ১৫ বছর কোনো বড় ধরনের দুর্ঘটনা বা প্রাণহানির ঘটনা ছাড়াই আকাশে উড়ছিল। বোয়িংয়ের তথ্যমতে, এই সময়ে বিমানটি ১০০ কোটির বেশি যাত্রী বহন করেছে এবং বর্তমানে বিশ্বজুড়ে ১ হাজার ১০০টির বেশি ড্রিমলাইনার সচল রয়েছে।
২০০৯ সালের ডিসেম্বরে সিয়াটলের কাছে পেইন ফিল্ড বিমানবন্দরে এক কুয়াশাচ্ছন্ন সকালে প্রথমবারের মতো যখন এই বিমানের পরীক্ষামূলক উড্ডয়ন হয়, তখন সেটি ছিল কয়েক বিলিয়ন ডলারের বিনিয়োগ ও দীর্ঘদিনের পরিকল্পনার ফসল। নব্বইয়ের দশকের শেষে বোয়িং ‘সোনিক ক্রুজার’ নামে একটি নকশায় কাজ করছিল, যা শব্দের গতির কাছাকাছি গতিতে ২৫০ জন যাত্রী পরিবহনের উপযোগী ছিল। তবে ২০০১ সালের ১১ সেপ্টেম্বরের সন্ত্রাসী হামলার পর বিশ্ব বিমানশিল্পের পরিস্থিতি বদলে যায়।
বিমান সংস্থাগুলো দ্রুতগতির পরিবর্তে জ্বালানি সাশ্রয়ী ও দূরপাল্লার জেটলাইনারের চাহিদা জানায়। ফলে বোয়িং সোনিক ক্রুজার প্রকল্প বাতিল করে ৭৮৭ ড্রিমলাইনারের কাজ শুরু করে। এটি বিমান সংস্থাগুলোর জন্য একটি নতুন ব্যবসায়িক মডেল তৈরি করে, যেখানে বিশাল হাব বিমানবন্দরের ওপর নির্ভর না করে ছোট শহরের মধ্যে সরাসরি কম জনাকীর্ণ রুটে ফ্লাইট পরিচালনা করা সম্ভব হয়।
সে সময় ইউরোপীয় জায়ান্ট এয়ারবাস একদম বিপরীত পথে হাঁটছিল। তারা তৈরি করছিল বিশালাকার এ৩৮০ সুপারজাম্বো, যা বিশ্বের ব্যস্ততম হাবগুলোতে বিপুল যাত্রী পরিবহনের জন্য নকশা করা হয়েছিল। তবে ইতিহাসের বিচারে বোয়িংয়ের ‘পয়েন্ট-টু-পয়েন্ট’ যাত্রার ধারণাটি সঠিক প্রমাণিত হয়।
জ্বালানি সাশ্রয়ী না হওয়ায় ২০২১ সালে এ৩৮০ উৎপাদন বন্ধ করে দেয় এয়ারবাস। অন্যদিকে, ৭৮৭ ড্রিমলাইনার এই খাতে নিয়ে এসেছিল একটি আমূল পরিবর্তন। এতে অ্যালুমিনিয়ামের বদলে কার্বন ফাইবারের মতো কম্পোজিট উপকরণ ব্যবহার করা হয়, যা ওজনে হালকা ও জ্বালানি সাশ্রয়ী। বোয়িংয়ের দাবি অনুযায়ী, আগের মডেল বোয়িং ৭৬৭-এর চেয়ে এটি ২০ শতাংশ বেশি দক্ষ এবং অনেক বেশি শান্ত বা শব্দহীন।
তবে যাত্রা শুরুর পরপরই বিমানটি গুরুতর সমস্যার মুখে পড়ে। ২০১৩ সালের জানুয়ারিতে বোস্টনের লোগান বিমানবন্দরে দাঁড়িয়ে থাকা অবস্থায় একটি ৭৮৭-এর লিথিয়াম-আয়ন ব্যাটারিতে আগুন ধরে যায়। এক সপ্তাহ পর জাপানে আরেকটি বিমানে একই ধরনের সমস্যার কারণে জরুরি অবতরণ করতে হয়। এর ফলে সারা বিশ্বে ৭৮৭ বহর কয়েক মাসের জন্য গ্রাউন্ডেড (উড্ডয়ন নিষিদ্ধ) করা হয়। পরে ব্যাটারিতে উন্নত ইনসুলেশন ও স্টিল বক্স ব্যবহারের মাধ্যমে সমস্যার সমাধান করা হয়।
শুরুতে কিছু সমস্যা দেখা দিলেও অবশেষে ৭৮৭ ড্রিমলাইনার বেশ ভালোভাবেই চলছিল। কিন্তু এবার সমস্যা দেখা দেয়, বোয়িংয়ের উৎপাদনপ্রক্রিয়ায়। বিশ্লেষকদের মতে, সিয়াটল থেকে দুই হাজার মাইল দূরে দক্ষিণ ক্যারোলাইনার নর্থ চার্লসটনে নতুন কারখানা স্থাপনের সিদ্ধান্তটি ছিল ঝুঁকিপূর্ণ। ২০১৯ সাল থেকে এখানে একের পর এক ত্রুটি ধরা পড়তে শুরু করে। এ সময় বোয়িংয়ের বর্তমান ও সাবেক কর্মীরা নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেন।
কর্মীদের মধ্যে সবচেয়ে আলোচিত নাম প্রয়াত জন বার্নেট। সাউথ ক্যারোলাইনার কারখানায় কাজ করা এই কোয়ালিটি কন্ট্রোল ম্যানেজার ২০১৯ সালে অভিযোগ করেন, দ্রুত উৎপাদনের চাপে নিরাপত্তা ক্ষুণ্ন করা হয়েছে। তিনি দাবি করেন, কারখানার কর্মীরা স্ক্র্যাপ বিন বা পরিত্যক্ত ঝুড়ি থেকে নিম্নমানের যন্ত্রাংশ নিয়ে বিমানে ফিট করেছেন। বিমানের ডেক বা মেঝের নিচে তারের চারপাশে ধাতব কুচি বা ‘মেটাল শেভিং’ রয়ে গেছে, যা তারের ইনসুলেশন ছিদ্র করে শর্টসার্কিট ঘটিয়ে বিপর্যয় ডেকে আনতে পারে।
পরে মার্কিন ফেডারেল অ্যাভিয়েশন অ্যাডমিনিস্ট্রেশনের (এফএএ) অডিটে এসব ত্রুটি ধরা পড়েছিল। কিন্তু যিনি এসব অভিযোগ করেছিলেন, ২০২৪ সালের শুরুতে মামলা চলাকালে তাঁর মরদেহ পাওয়া যায় নিজ গাড়ির ভেতরে। পরে বোয়িং এসব অভিযোগ অস্বীকার করে জানিয়েছিল, তারা সব সমস্যা সমাধান করেছে।
এর আগে ২০১১ সালে সিনথিয়া কিচেনস নামের আরেকজন ম্যানেজার একই ধরনের অভিযোগ করেছিলেন। তিনি দাবি করেছিলেন, উৎপাদন সচল রাখতে জেনেশুনে ত্রুটিপূর্ণ যন্ত্রাংশ বোয়িংয়ের বিমানে লাগানো হয়েছে।
গত বছর সিনেট কমিটির সামনে বোয়িংয়ের বর্তমান প্রকৌশলী স্যাম সালেহপুর নতুন করে উদ্বেগের জন্ম দেন। তিনি ‘টারজান ইফেক্ট’-এর বর্ণনা দিয়ে বলেন, বিমানের ফিউজলেজের খণ্ডাংশগুলো জোড়া লাগানোর জন্য কর্মীরা সেগুলোর ওপর লাফালাফি করতেন, কারণ, সেগুলো সঠিকভাবে মিলছিল না। তাঁর দাবি, এক হাজারের বেশি বিমানে এটা করা হয়েছিল।
তবে বোয়িংয়ের দাবি, ৭৮৭-এর কাঠামোগত নির্ভুলতা নিয়ে কখনো কোনো আপস করা হয়নি এবং এটি সম্পূর্ণ নিরাপদ।
বোয়িংয়ের বর্তমান সিইও কেলি অর্টবার্গ কোম্পানির অভ্যন্তরীণ প্রক্রিয়া ও মান নিয়ন্ত্রণব্যবস্থা ঢেলে সাজানোর কাজ করছেন। অ্যাভিয়েশন বিশ্লেষক রিচার্ড আবুলাফিয়ার মতে, ১৬ বছরে ১ হাজার ২০০টি জেট ও এক বিলিয়ন যাত্রীর পথচলায় এয়ার ইন্ডিয়ার ঘটনাটিই সবচেয়ে ভয়াবহ দুর্ঘটনা। যদি বড় কোনো ত্রুটি থাকত, তবে এত দিনে তা প্রকাশ পেত।
২০২৫ সালে বোয়িং ৭৮৭ ড্রিমলাইনারে নিরাপত্তা ত্রুটির যত রেকর্ড
অ্যাভিয়েশন সেফটি নেটওয়ার্কের (এএসএন) তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে প্রযুক্তিগত সমস্যার কারণে এ পর্যন্ত ছয়টি ঘটনা ঘটেছে।
২৪ জানুয়ারি: ইউনাইটেড এয়ারলাইনসের ফ্লাইট-৬১৩ (লেগোস থেকে ওয়াশিংটন) ওঠানামা-সংক্রান্ত সমস্যায় পড়লে একজন গুরুতর আহত হন এবং ১৫ জন সামান্য আঘাত পান।
এপ্রিল মাস: দুটি ফ্লাইট বাতিল করতে বাধ্য হয়। ১৯ এপ্রিল কেবিনে ধোঁয়ার গন্ধ পাওয়ার কারণে ও ২৩ এপ্রিল একটি ইঞ্জিনে সমস্যার কারণে এ ঘটনা ঘটে।
১৭ মে: ব্রিটিশ এয়ারওয়েজ ফ্লাইট বিএ ১৮৭ (লন্ডন থেকে অস্টিন) ১০ হাজার ফুট উচ্চতায় ওঠার পর প্রেশার লস বা বায়ুচাপ হারানোর আশঙ্কায় যাত্রা বাতিল করে।
১২ জুন: এয়ার ইন্ডিয়া ফ্লাইট-১৭১-এর সেই মর্মান্তিক দুর্ঘটনা।
১৬ জুন: লন্ডনের হিথরো ও হংকং থেকে ছেড়ে যাওয়া দুটি ফ্লাইট মাঝপথে ফিরে আসে।
বর্তমানে বিশ্বজুড়ে প্রায় ১ হাজার ১০০টি বোয়িং ৭৮৭ বিমান আকাশে রয়েছে। এই বিপুলসংখ্যক বিমানের তুলনায় বিচ্ছিন্ন কিছু প্রযুক্তিগত সমস্যা ছাড়া বড় ধরনের দুর্ঘটনার সংখ্যা তুলনামূলকভাবে কম। তবু সাম্প্রতিক ঘটনাগুলোর পর এফএএ বোয়িং ৭৮৭ ড্রিমলাইনারের ব্যবহার বা নতুন বিমান ডেলিভারির ওপর এখনো কোনো নতুন স্থগিতাদেশ দেয়নি।
বোয়িংয়ের বিরুদ্ধে ফৌজদারি মামলা খারিজ
গত বছরের নভেম্বরে যুক্তরাষ্ট্রের আদালতে বোয়িংয়ের বিরুদ্ধে করা একটি ফৌজদারি মামলা খারিজ হয়। ২০১৮ সালের শেষের দিকে ইন্দোনেশিয়া ও ২০১৯ সালের শুরুতে ইথিওপিয়ায় ৭৩৭ ম্যাক্স উড়োজাহাজের দুটি বড় দুর্ঘটনা ঘটে। ওই দুই দুর্ঘটনায় ৩৪৬ জন নিহত হয়েছিলেন। দুর্ঘটনায় নিহত ব্যক্তিদের পরিবারের সদস্যরা এই মামলা করেছিলেন।
পরে মার্কিন বিচার বিভাগ (ডিওজে) বোয়িংয়ের বিরুদ্ধে জালিয়াতির অভিযোগ আনে। অভিযোগ ছিল, বোয়িং সচেতনভাবে ফ্লাইট কন্ট্রোল সফটওয়্যার সম্পর্কে নিয়ন্ত্রক সংস্থাকে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য গোপন করেছিল, যা দুর্ঘটনার জন্য দায়ী ছিল।
বোয়িং ওই অভিযোগ স্বীকার করে ২০২১ সালে ২৫০ কোটি ডলার জরিমানা ও ক্ষতিপূরণ দিয়ে আইনি ঝামেলা এড়িয়েছিল। তবে ২০২৪ সালের জানুয়ারিতে একটি ৭৩৭-৯ ম্যাক্স উড়োজাহাজ থেকে দরজা খুলে পড়ার ঘটনার পর মামলাটি পুনরায় খোলা হয়। ডিওজে অভিযোগ করে, বোয়িং আবারও সমঝোতার কিছু শর্ত ভঙ্গ করেছে।
পরে বাইডেন প্রশাসনের অধীনে ডিওজে একটি নতুন সমঝোতার প্রস্তাব দেয়, যেখানে বোয়িং দোষ স্বীকার করবে এবং ২৪ কোটি ৩০ লাখ ডলার জরিমানা দেবে। কিন্তু বিচারক রিড ও’কনর ওই বছরের ডিসেম্বরে সেই প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেন।
বিচারক রিড ও’কনর তাঁর রায়ে উল্লেখ করেন, এই মামলা খারিজ করার বিষয়টি তিনি ‘জনস্বার্থের অনুকূলে’ মনে করেন না। তিনি জানান, সরকার যে সমঝোতায় পৌঁছেছে, তা বিমানযাত্রীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার মতো প্রয়োজনীয় জবাবদিহি তৈরি করবে বলে তিনি বিশ্বাস করেন না। বিচারক সরকারের প্রতি কটাক্ষ করে বলেন, মামলাটি বিচারে নিয়ে যাওয়ার ক্ষেত্রে সরকারের উদ্বেগ ছিল ‘গুরুত্বহীন’। তবে বিচারক এও স্বীকার করেন, সরকারের ‘গুড ফেইথ’ বা সদিচ্ছার ওপর তাঁর হস্তক্ষেপ করার আইনগত কোনো ভিত্তি বা কর্তৃত্ব নেই। সবশেষে ২০২৫ সালের নভেম্বরে প্রসিকিউটরদের দাখিল করা নতুন সমঝোতায় ফৌজদারি অভিযোগটিই তুলে নেওয়া হয়, যা বোয়িংয়ের জন্য ছিল বড় স্বস্তি।