চট্টগ্রাম চেম্বারের সভাপতি মো. আমিরুল হক বলেছেন, গতকাল বৃহস্পতিবার জাতীয় সংসদে উপস্থাপিত ২০২৬-২৭ অর্থবছরের ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকার জাতীয় বাজেট ব্যবসা ও বিনিয়োগবান্ধব। তিনি বলেন, এই বাজেটে সামষ্টিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা, বিনিয়োগ সম্প্রসারণ, উৎপাদন বৃদ্ধি, কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং অন্তর্ভুক্তিমূলক উন্নয়নের ওপর সমন্বিতভাবে জোর দেওয়া হয়েছে।
মো. আমিরুল হক বলেন, শিল্পের কাঁচামাল আমদানির ক্ষেত্রে অগ্রিম আয়কর (এআইটি) নিয়ে ব্যবসায়ীরা দীর্ঘদিন ধরে কথা বলে আসছেন। অনেক সময় এই আয়কর সমন্বয় করার সুযোগ থাকে না। এ কারণে কাঁচামাল আমদানিতে অগ্রিম আয়করের হার ৫ শতাংশ থেকে ১ শতাংশের মধ্যে সীমিত রাখার দাবি ছিল ব্যবসায়ীদের। তিনি বলেন, এবারের বাজেটে এআইটি কমানো হয়েছে এবং এআইটি ফেরত দেওয়ার কথাও বলা হয়েছে, যা ব্যবসায়ীদের জন্য ইতিবাচক সিদ্ধান্ত ও স্বস্তির বিষয়।
বিনিয়ন্ত্রণকরণের (ডিরেগুলেশন) মাধ্যমে সরকারি কাজে বিলম্ব ও অপ্রয়োজনীয় ধাপ পরিহার করে স্বচ্ছ, সহজ ও সাশ্রয়ী ব্যবসাসহায়ক পরিবেশ গড়ে তোলার উদ্যোগকে তিনি সময়োপযোগী সিদ্ধান্ত হিসেবে উল্লেখ করেন।
চট্টগ্রাম চেম্বার সভাপতি বলেন, এবারের বাজেটে অনেক পণ্যের কাঁচামালের ডিউটি কমানো হয়েছে। আরও কিছু কাঁচামালের ডিউটি কমানো প্রয়োজন বলেও তিনি মত দেন। তাঁর ভাষ্য, ফিনিশড প্রোডাক্টের ওপর ডিফারেন্স থাকলে দেশে ভ্যালু অ্যাডিশন বৃদ্ধি পাবে।
রপ্তানি বহুমুখীকরণে নতুন করে বন্ড লাইসেন্স দেওয়ার ঘোষণাকেও ইতিবাচক হিসেবে দেখছেন মো. আমিরুল হক। তিনি বলেন, তৈরি পোশাক খাতের বাইরে নতুন নতুন পণ্যের জন্য বন্ড লাইসেন্স দেওয়া হবে। ভবিষ্যতের আন্তর্জাতিক বাজার আরও প্রতিযোগিতামূলক হওয়ায় নতুন পণ্য রপ্তানির জন্য এ ধরনের লাইসেন্স প্রয়োজন হবে। তিনি মনে করেন, বন্ড লাইসেন্স দেওয়ার এই উদ্যোগ রপ্তানি বহুমুখীকরণে একটি প্লাস পয়েন্ট।
৬০ হাজার কোটি টাকার প্রণোদনা তহবিলের ঘোষণাকে বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবাহে সহায়ক ও সময়োপযোগী পদক্ষেপ বলে মন্তব্য করেন তিনি। তাঁর মতে, আগামী দু-তিন বছর অর্থনীতিতে এটি ভালো ফল দেবে। বৃহৎ শিল্প, সিএমএসএমই, কৃষি এবং রপ্তানি বহুমুখীকরণের জন্য বরাদ্দ, সঙ্গে ৬ শতাংশ সুদ ভর্তুকি, উৎপাদন উৎসাহিত করতে এবং ব্যাপক কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে সহায়তা করবে।
অঞ্চলভিত্তিক সুষম উন্নয়নের অংশ হিসেবে চট্টগ্রামকে দেশের বাণিজ্যিক রাজধানী হিসেবে গড়ে তুলতে বর্তমান সরকারের কৌশলগত উদ্যোগের প্রশংসা করেন চট্টগ্রাম চেম্বার সভাপতি। চট্টগ্রামকে আঞ্চলিক বাণিজ্য কেন্দ্র হিসেবে প্রতিষ্ঠার জন্য বন্দরের আধুনিকায়ন ও সম্প্রসারণের ঘোষণাকে তিনি আন্তরিকভাবে স্বাগত জানান। ঢাকা-চট্টগ্রাম কর্ডলাইন স্থাপনের জন্য বাজেটে প্রস্তাবনা রাখাকে চট্টগ্রামবাসীর জন্য সুখবর বলে উল্লেখ করেন মো. আমিরুল হক।
শিল্পের অবকাঠামো সম্প্রসারণে পটুয়াখালী ও যশোরে নতুন ইপিজেড স্থাপন এবং কুড়িগ্রাম, নীলফামারী, চাঁদপুর ও কুষ্টিয়ায় অর্থনৈতিক অঞ্চলের প্রস্তাবনাকেও তিনি সাধুবাদ জানান। তিনি বলেন, এ উদ্যোগ সুষম আঞ্চলিক উন্নয়নে সহায়ক হবে এবং দেশব্যাপী কর্মসংস্থান সৃষ্টি করবে।
রপ্তানি শিল্পের জন্য প্রস্তাবিত শুল্কমুক্ত আমদানি সুবিধা রপ্তানি পণ্যের ব্যাপ্তি বৃদ্ধি এবং বিশ্ববাজারে প্রতিযোগিতা সক্ষমতা বাড়াতে সহায়তা করবে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
দক্ষতা উন্নয়ন ও কর্মসংস্থান সৃষ্টির লক্ষ্যে এমপ্লয়মেন্ট এক্সচেঞ্জ, এসআইসিআইপি প্রশিক্ষণ কর্মসূচি এবং উন্নত ওয়ার্কার ওয়েলফেয়ার ব্যবস্থার উদ্যোগের প্রশংসা করেন চট্টগ্রাম চেম্বার সভাপতি। বৈদেশিক আয়ের স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে রেমিট্যান্স প্রণোদনা এবং শ্রমবাজার সংস্কারের ওপর গুরুত্বারোপকেও তিনি গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করেন।
বাজেটে ইভিতে (বৈদ্যুতিক গাড়ি) শুল্ক কমানোকে ইতিবাচক দিক হিসেবে উল্লেখ করে মো. আমিরুল হক বলেন, এতে একদিকে জ্বালানি আমদানির নির্ভরতা কমবে, অন্যদিকে পরিবেশও উপকৃত হবে। শুল্ক কমানোর ফলে সোলার বিদ্যুতের খরচও কমবে বলে তিনি মন্তব্য করেন। শিক্ষা খাতে বড় বরাদ্দ দেওয়াকেও তিনি বিশেষভাবে স্বাগত জানান। তাঁর মতে, এই বরাদ্দ থেকে কারিগরি শিক্ষায় সবচেয়ে বেশি ব্যয় করা দরকার।