জ্বালানি ব্যয়ের বাড়তি চাপ, দুর্বল বৈশ্বিক চাহিদা এবং রাজস্ব ঘাটতির ত্রিমুখী সংকটে দেশের অর্থনীতি এখন এক অস্বস্তিকর ভারসাম্যে দাঁড়িয়ে। সরকারের সাধারণ অর্থনীতি বিভাগ (জিইডি) প্রকাশিত ‘অর্থনৈতিক হালনাগাদ ও পূর্বাভাস: এপ্রিল ২০২৬’ প্রতিবেদনে মার্চ পর্যন্ত সাম্প্রতিক সূচক বিশ্লেষণে এই চিত্র উঠে এসেছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, কিছু খাতে আংশিক স্বস্তি এলেও মৌলিক ঝুঁকিগুলো এখনো দৃঢ়ভাবে বহাল রয়েছে।
মূল্যস্ফীতির ক্ষেত্রে সামান্য উন্নতির ইঙ্গিত মিলেছে। মার্চে সার্বিক মূল্যস্ফীতি কমে দাঁড়িয়েছে ৮.৭১ শতাংশে, যা ফেব্রুয়ারিতে ছিল ৯.১৩ শতাংশ। নতুন মৌসুমের ধান, আমদানি এবং বাজারে সরবরাহ বৃদ্ধির ফলে খাদ্য মূল্যস্ফীতি কমে ৮.২৪ শতাংশে নেমে এলেও তা পুরো অর্থনীতিকে স্বস্তি দিতে পারছে না।
বাস্তবতা হলো, ভোক্তার ঝুড়িতে শুধু চাল নেই। সবজি, মাছ ও মাংসের দাম এখনো উচ্চপর্যায়ে রয়ে গেছে। এ ছাড়া খাদ্যবহির্ভূত খাতেও চাপ কমেনি। মার্চে খাদ্যবহির্ভূত মূল্যস্ফীতি ৯.০৯ শতাংশে প্রায় অপরিবর্তিত রয়েছে। আবাসন, বিদ্যুৎ, পরিবহন ও সেবা খাতে ব্যয় বৃদ্ধি এর প্রধান কারণ। ফলে বাজারে গিয়ে সাধারণ মানুষ যে স্বস্তি অনুভব করবে, সেই জায়গা এখনো তৈরি হয়নি।
আয়ের দিকেও স্বস্তি নেই। মার্চে মজুরি বৃদ্ধি হয়েছে ৮.০৯ শতাংশ, যা মূল্যস্ফীতির নিচে অবস্থান করছে। ফলে বাস্তব আয় কমে যাওয়ায় মানুষের ক্রয়ক্ষমতা চাপে রয়েছে। এই প্রবণতা অব্যাহত থাকলে অভ্যন্তরীণ চাহিদাও ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।
জ্বালানির উচ্চমূল্য উৎপাদন ও পরিবহন খরচ বাড়ায় এর সরাসরি প্রভাব পড়ছে রপ্তানি খাতে। বাড়তি উৎপাদন ব্যয়ের পাশাপাশি কারণে বৈশ্বিক চাহিদা দুর্বল হয়ে পড়ায় আন্তর্জাতিক বাজারে এখন রপ্তানি খাতের প্রতিযোগিতা ধরে রাখা কঠিন হয়ে উঠছে।
অর্থনীতির আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো সরকারি আর্থিক ব্যবস্থাপনা, যেখানে চাপ ক্রমেই স্পষ্ট হচ্ছে। রাজস্ব আদায়ে বড় ঘাটতি সরকারের ব্যয় পরিচালনাকে কঠিন করে তুলছে। লক্ষ্যমাত্রা পূরণ না হওয়ায় বাজেট বাস্তবায়নে অনিশ্চয়তা তৈরি হচ্ছে। মার্চে রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রা ছিল ৫৩,২৯০ কোটি টাকা, কিন্তু আদায় হয়েছে ৩৩,৫২১ কোটি টাকা—অর্জন মাত্র ৬২.৯০ শতাংশ।
একই সঙ্গে উন্নয়ন ব্যয়েও ধীরগতি দেখা গেছে। জুলাই থেকে মার্চ সময়ে এডিপি ব্যয় কমে দাঁড়িয়েছে ৭৫,৬০৭ কোটি টাকা, যা আগের অর্থবছরের একই সময়ে ছিল ৮২,৮৯৪ কোটি টাকা। প্রশাসনিক জটিলতা, ক্রয়প্রক্রিয়ায় বিলম্ব এবং অর্থায়ন সংকট এই ধীরগতির পেছনে কাজ করছে।
ব্যাংকিং খাতেও একটি ভারসাম্যহীন প্রবণতা দেখা যাচ্ছে। আমানত বাড়লেও সরকারি ঋণ দ্রুত বৃদ্ধি পাচ্ছে, যা বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবাহকে সীমিত করে দিতে পারে। ইতিমধ্যে বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধির ধীরগতি সেই ইঙ্গিতই দিচ্ছে। এতে নতুন বিনিয়োগের গতি কমে যাওয়ার ঝুঁকি রয়েছে।
মার্চে সরকারি ঋণ বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৬ লাখ ২৭ হাজার ৭৯৩ কোটি টাকায়, যার প্রবৃদ্ধি ২৯.৬১ শতাংশ। বিপরীতে বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধি মাত্র ৬.০৩ শতাংশ, যা বিনিয়োগের গতি কমার ইঙ্গিত দেয়।
বৈদেশিক খাতে আপাত স্থিতিশীলতা থাকলেও ঝুঁকি রয়ে গেছে। মার্চে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ দাঁড়িয়েছে ৩৪.১২ বিলিয়ন ডলারে। তবে মূলধনি যন্ত্রপাতি আমদানি কমে যাওয়ায় বিনিয়োগে সতর্কতার ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে। পাশাপাশি টাকার অবমূল্যায়ন রপ্তানিতে কিছুটা সহায়ক হলেও আমদানি ব্যয় বাড়িয়ে মূল্যস্ফীতির ওপর নতুন চাপ তৈরি করতে পারে।
সব মিলিয়ে অর্থনীতির বর্তমান চিত্রে আংশিক স্বস্তি ও গভীর ঝুঁকি পাশাপাশি অবস্থান করছে। এই বাস্তবতায় কার্যকর নীতি সমন্বয় ও দ্রুত সিদ্ধান্তই নির্ধারণ করবে, অর্থনীতি কতটা স্থিতিশীল পথে ফিরতে পারবে।