টাঙ্গাইলের সখীপুরে স্বাস্থ্য সহকারী আউয়াল শফীর (৪৫) রহস্যজনক মৃত্যুর ঘটনায় পুলিশের খোঁজা সেই সন্দেহভাজন যুবক শাকিল (১৮) থানায় আত্মসমর্পণ করেছেন বলে তাঁর পরিবারের পক্ষ থেকে দাবি করা হয়েছে। ঘটনার ২১ দিন পর বুধবার (২৩ সেপ্টেম্বর) রাত ৯টার দিকে স্বজনেরা তাঁকে সখীপুর থানায় নিয়ে যান। এ সময় শাকিলের সঙ্গে তাঁর কয়েকজন আত্মীয়স্বজন ছিলেন।
শাকিল টাঙ্গাইলের বাসাইল পৌরসভার বর্ণি কিশোরী গ্রামের আতোয়ার খানের ছেলে। তাঁর খালু শফিকুল ইসলাম বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন। তিনি নিজেও শাকিলের সঙ্গে থানায় গিয়েছিলেন। তবে শাকিলের থানায় আসার বিষয়ে পুলিশ এখনো আনুষ্ঠানিক কোনো বক্তব্য দেয়নি।
এর আগে ৮ সেপ্টেম্বর সখীপুর থানা-পুলিশ সিসিটিভি ফুটেজ থেকে সংগ্রহ করা মোটরসাইকেলসহ এক যুবকের ছবি প্রকাশ করে তাঁর পরিচয় ও সন্ধান চায়। ওই যুবকের সন্ধানদাতাকে পুরস্কার দেওয়ার ঘোষণাও দেওয়া হয়।
তখন সখীপুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. মুরাদ হোসেন জানিয়েছিলেন, পুলিশের কাছে আসা তথ্য অনুযায়ী ওই সন্দেহভাজন যুবককে জিজ্ঞাসাবাদ করা গেলে ঘটনার মূল রহস্য উদ্ঘাটন হতে পারে।
বুধবার রাতে শাকিলের খালু শফিকুল ইসলাম জানান, শাকিল তাঁদের কাছে ঘটনার যে বর্ণনা দিয়েছেন, সে অনুযায়ী ঘটনার দিন তিনি মোটরসাইকেল নিয়ে একটি সিএনজিচালিত অটোরিকশার পেছনে পেছনে নলুয়া থেকে বাসাইলের দিকে যাচ্ছিলেন।
শফিকুল ইসলামের ভাষ্য অনুযায়ী, ঘটনাস্থলে বিপরীত দিক থেকে আসা স্বাস্থ্য সহকারী আউয়াল শফী সিএনজিচালিত অটোরিকশার সঙ্গে ঘেঁষা লেগে মোটরসাইকেল থেকে ছিটকে সড়কে পড়ে যান। এ সময় পেছনে থাকা শাকিলের মোটরসাইকেলটিও নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে সিএনজিচালিত অটোরিকশার সঙ্গে ধাক্কা খায়। এতে শাকিলও সড়কের পাশে ছিটকে পড়েন।
পরে উঠে এসে আউয়াল শফীর অবস্থা দেখে তাঁকে সাহায্য করতে চেয়েছিলেন বলে শাকিল পরিবারের কাছে জানিয়েছেন। তবে সিএনজিচালিত অটোরিকশার চালকের পরামর্শে গণপিটুনির ভয়ে তিনি ঘটনাস্থল থেকে চলে যান বলে দাবি করেন।
শফিকুল ইসলাম বলেন, ঘটনার পর ব্যাপক আলোচনা শুরু হলে পুলিশ শাকিলের বাবার কাছেও তাঁর সম্পর্কে জানতে চায়। পরে পরিবারের সদস্য ও স্বজনেরা শাকিলকে বুঝিয়ে পুলিশের কাছে যাওয়ার জন্য উৎসাহিত করেন।
শফিকুল ইসলামের দাবি, ‘ঘটনাটি মূলত দুর্ঘটনা। ন্যায়বিচারের আশায় শাকিলকে আমরা পুলিশের কাছে দিয়ে গেলাম।’
২ সেপ্টেম্বর বেলা পৌনে ১টার দিকে সখীপুর উপজেলার নলুয়া-বাসাইল সড়কের বাছেত খান উচ্চবিদ্যালয়ের পশ্চিম পাশ থেকে আউয়াল শফীর রক্তাক্ত মরদেহ উদ্ধার করা হয়। তিনি বোয়ালী গ্রামের মোশারফ হোসেনের ছেলে এবং সখীপুর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের স্বাস্থ্য সহকারী ছিলেন।
স্থানীয় সূত্র ও ঘটনাস্থলের বর্ণনা অনুযায়ী, ওই দিন দুপুরে সড়কের ওপর আউয়াল শফীর রক্তাক্ত মরদেহ পড়ে থাকতে দেখে পথচারীরা পুলিশকে খবর দেন। তাঁর মাথায় গুরুতর আঘাতের চিহ্ন ছিল। পাশে তাঁর ব্যবহৃত মোটরসাইকেল পড়ে ছিল।
প্রাথমিকভাবে দ্রুতগতির কোনো যানবাহনের চাপায় তাঁর মৃত্যু হয়ে থাকতে পারে বলে ধারণা করেছিল পুলিশ। তবে নিহতের পরিবার ও স্বজনেরা শুরু থেকেই ঘটনাটিকে দুর্ঘটনা নয়, পরিকল্পিত হত্যাকাণ্ড বলে দাবি করে আসছেন।
নিহতের স্বজনেরা তাঁর শরীরের আঘাতের ধরন দেখে ঘটনাটি স্বাভাবিক সড়ক দুর্ঘটনা নয় বলে সন্দেহ প্রকাশ করেন এবং সুষ্ঠু তদন্তের দাবি জানান।
পরদিন ৩ সেপ্টেম্বর আউয়াল শফীর স্ত্রী তানিয়া আক্তার বাদী হয়ে অজ্ঞাতনামা ব্যক্তিদের আসামি করে সখীপুর থানায় হত্যা মামলা করেন।
মামলার তদন্তে সখীপুর থানা-পুলিশ ঘটনাস্থল ও আশপাশের এলাকার সিসিটিভি ফুটেজ সংগ্রহ করে। পাশাপাশি ওই সময় সড়ক দিয়ে চলাচলকারী কয়েকজন চালক ও যাত্রীকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়।
তদন্তের একপর্যায়ে ৮ সেপ্টেম্বর সিসিটিভি ফুটেজ থেকে মোটরসাইকেল আরোহী এক যুবকের ছবি সংগ্রহ করে তাঁকে সন্দেহভাজন হিসেবে শনাক্ত করে পুলিশ। তাঁর পরিচয় ও অবস্থান সম্পর্কে তথ্য দিতে অনুরোধ করে পুলিশ। তথ্যদাতার পরিচয় গোপন রাখা এবং পুরস্কার দেওয়ার ঘোষণাও দেওয়া হয়।
শাকিলের থানায় আসার বিষয়ে জানতে চাইলে সখীপুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. মুরাদ হোসেন বলেন, ‘এ বিষয়ে এই মুহূর্তে কিছুই বলতে পারছি না। পরিবারের লোকজন আপনাদের কী তথ্য দিয়েছে, সেটা তাঁদের বিষয়। পুলিশের পক্ষ থেকে কিছু বলার থাকলে প্রয়োজনে তা আনুষ্ঠানিকভাবে আপনাদের জানানো হবে।’