সুনামগঞ্জের শাল্লায় একাত্তরের মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলার এক সাক্ষীর বাড়িঘর ও দোকানে হামলা, ভাঙচুর ও লুটপাটের অভিযোগে মামলা হয়েছে। এতে ৩৩ জনের নাম উল্লেখ করে আরও ৭০ থেকে ৮০ জনকে অজ্ঞাতপরিচয় আসামি করা হয়েছে। গতকাল রোববার সন্ধ্যায় শাল্লা থানায় মামলাটি করেন সাক্ষী দুলাল মিয়ার মেয়ে ফরিদা খাতুন। তবে পুলিশের দাবি, ভুক্তভোগী পরিবারের সদস্যদের বিরুদ্ধে মাদক কারবার ও চুরির অভিযোগ রয়েছে। গত কয়েক বছরে তাঁদের বিরুদ্ধে এসব অভিযোগে একাধিক মামলাও হয়েছে।
মামলার বাদী ফরিদা খাতুন উজ্জ্বলা মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলার সাক্ষী আটগাঁও ইউনিয়নের দৌলতপুর গ্রামের মো. দুলাল মিয়ার মেয়ে। মামলার বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন শাল্লা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মোহাম্মদ সোহেল।
মামলার এজাহার ও বাদীপক্ষের অভিযোগ অনুযায়ী, হামলাকারীরা বাড়িঘর ও দোকান ভাঙচুর করে নিত্যপ্রয়োজনীয় আসবাবপত্র, নগদ টাকা ও স্বর্ণালংকার লুট করে নিয়ে গেছে। এতে ৪০ লাখ টাকার বেশি ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে বলে দাবি করেছেন বাদী।
মোবাইল ফোনে উজ্জ্বলা বলেন, ‘আমার বাড়িঘর-দোকানপাট সব তছনছ করে দিয়েছে। পরিবার নিয়ে বেঁচে থাকার মতো পরিবেশ নেই। ঘরের নিত্যপ্রয়োজনীয় আসবাবপত্র, নগদ অর্থ, স্বর্ণালংকারসহ সব লুট করে নিয়ে গেছে দুষ্কৃতকারীরা। হামলাকারীরা ভাঙচুর ও লুটপাটের পাশাপাশি পরিবারের নারী-পুরুষদের মারধর করেছেন। এতে দুলাল মিয়ার ছেলে সাদ্দাম হোসেনের অন্তঃসত্ত্বা স্ত্রী কুলসুমা বেগম (৩২), মেয়ে সেলিনা আক্তার (৩৫), ছোট ছেলে উজ্জ্বল মিয়ার স্ত্রী রোকেয়া বেগম (৩২) এবং উজ্জ্বল মিয়ার ছেলে এলিম মিয়া (৩) আহত হয়েছে।’
মামলার পরদিন আজ সকালেও অভিযুক্তরা তাঁদের বাড়িতে হামলার চেষ্টা করেছেন বলে অভিযোগ করেন উজ্জ্বলা।
তবে অভিযুক্তদের দাবি, মাদক নির্মূল টিম মাদক ব্যবসায় জড়িত ব্যক্তিদের বাড়িঘর ভাঙচুর করেছে। উজ্জ্বলা ও তাঁর পরিবারের সদস্যরাও মাদক ব্যবসার সঙ্গে জড়িত।
উজ্জ্বলার বাবা দুলাল মিয়া মোবাইল ফোনে জানান, ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধের সময় সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধের একটি মামলায় তিনি সাক্ষী ছিলেন। তাঁর বাবা মাহমুদ আলী মুক্তিযুদ্ধের সময় রাজাকারদের হাতে শহীদ হন। তাঁর নিকটাত্মীয় প্রয়াত জমিলা খাতুনও বীরাঙ্গনা ছিলেন। ২০১৬ সালে পেরুয়া গ্রামের বীর মুক্তিযোদ্ধা রজনী দাস আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে একটি মামলা করেন। ওই মামলায় মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগে ১১ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছিল।
দুলাল মিয়ার অভিযোগ, মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় সাক্ষী হওয়ায় তাঁদের পরিবারের ওপর আগে থেকেই একটি পক্ষের ক্ষোভ ছিল। ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর থেকে তাঁরা বেশি হয়রানির শিকার হচ্ছেন।
দুলাল মিয়া জানান, তাঁর মেয়ে সেলিনা আক্তার উজ্জ্বলা ও মেয়ের জামাই হেলাল মিয়া বাড়িতে থাকেন। বাড়ির সামনে তাঁদের একটি দোকান রয়েছে। হামলাকারীরা ওই দোকান ও বাড়ির মালামাল লুট করে নিয়ে গেছে।
তবে মামলার আসামি উজানগাঁও গ্রামের মৃত গনি মিয়ার ছেলে মো. জালাল মিয়া হামলার সঙ্গে নিজের সম্পৃক্ততার কথা অস্বীকার করেন। তিনি বলেন, ‘এলাকার ছেলেপেলে এই হামলা-আক্রমণ করেছে। তাদের অবস্থান মাদকের বিরুদ্ধে। উজ্জ্বলা সপরিবারে মদ ও ইয়াবা ব্যবসার সঙ্গে জড়িত। তারা এলাকার পরিবেশ নষ্ট করছে। সে হিসেবে হামলা-আক্রমণ হয়েছে।’
আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়ার অধিকার তাঁদের নেই—এমন প্রশ্নের জবাবে জালাল মিয়া বলেন, ‘এলাকাবাসী হামলা-আক্রমণ করেছে। এ কর্মকাণ্ডে আমরা একমত না। আমরা এখন মামলার হাজিরা দিতে সুনামগঞ্জে এসেছি। এখন তাঁদের বাড়িতে হামলা-আক্রমণের জন্য কে বা কারা যাচ্ছে, আমি জানি না।’
স্থানীয় ইউপি সদস্য মো. রাসেল মিয়া বলেন, ‘উজ্জ্বলার বাবা দুলাল মিয়া মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলার সাক্ষী ছিলেন, এটা সত্য। তবে মাদকের কারণে নয়, মূলত পূর্বশত্রুতার জেরেই এ হামলার ঘটনা ঘটেছে। উজ্জ্বলার বাড়িতে যা হয়েছে, তা নিন্দনীয়। আমরা চাই, ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত হোক।’
শাল্লা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মোহাম্মদ সোহেল বলেন, বাড়িতে হামলা ও লুটপাটের অভিযোগে উজ্জ্বলা মামলা করেছেন। মামলায় ৩৩ জনের নাম উল্লেখ করে অজ্ঞাতপরিচয় আরও ৭০ থেকে ৮০ জনকে আসামি করা হয়েছে। মামলাটি তদন্তাধীন। এ ঘটনায় আইনগত পদক্ষেপ নেওয়া হবে।