পবিত্র ঈদুল আজহা যত ঘনিয়ে আসছে, ততই ব্যস্ততা বাড়ছে সিরাজগঞ্জের পশু খামারিদের। কোথাও গরুর খাবার মাপছেন খামারিরা, কোথাও চলছে গোসল ও পরিচর্যা। সকাল থেকে গভীর রাত পর্যন্ত চলছে কর্মব্যস্ততা। সেই সঙ্গে চলছে লাভ-লোকসানের হিসাব।
জেলা প্রাণিসম্পদ বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, এবার সিরাজগঞ্জে প্রায় ১৭ হাজার খামারে কোরবানির জন্য প্রস্তুত করা হয়েছে ৬ লাখ ১৭ হাজার ৭২৩টি গবাদিপশু। এর মধ্যে প্রায় দুই লাখ ষাঁড় রয়েছে। এসব পশুর সম্ভাব্য বাজারমূল্য ধরা হচ্ছে প্রায় ৩৫০ কোটি টাকা।
খামারিদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, ধানের খড়, সবুজ ঘাস, ভুসি, খৈল ও ভিটামিনসমৃদ্ধ খাবার খাইয়ে প্রাকৃতিক উপায়ে গরু মোটাতাজা করা হচ্ছে। শুধু জেলার চাহিদা পূরণ নয়, প্রতিবছরের মতো এবারও দেশের বিভিন্ন জেলার পশুর হাটে যাবে সিরাজগঞ্জের গরু। ইতিমধ্যে বিভিন্ন এলাকার পাইকারি ব্যবসায়ীরা খামারগুলোতে ভিড় জমাতে শুরু করেছেন।
জেলা প্রাণিসম্পদ কার্যালয় সূত্রে জানা যায়, গবাদিপশুর খামার গড়ে ওঠায় এ খাত এখন জেলার অন্যতম বড় অর্থনৈতিক খাতে পরিণত হয়েছে। দেশীয় জাতের পাশাপাশি শাহিওয়াল, ফ্রিজিয়ান, নেপালি ঘির, রাজস্থানী ও অস্ট্রেলিয়ান জাতের গবাদিপশুও পালন করছেন খামারিরা।
তবে সম্ভাবনাময় এই খাতের বড় দুশ্চিন্তা উৎপাদন ব্যয়। চলতি বছরে গরুর খাদ্যের দাম বেড়ে যাওয়ায় খামারিদের খরচও বেড়েছে উল্লেখযোগ্যভাবে।
বর্তমানে সরিষার খৈল প্রতি কেজি ৪৮ থেকে ৫০ টাকা, গমের ভুসি ৫০ থেকে ৫৫ টাকা, ডাবরি ভুসি ৬০ থেকে ৬৫ টাকা এবং কাঁচা ঘাসের আঁটি বিক্রি হচ্ছে ১০ থেকে ১৫ টাকায়।
শাহজাদপুর উপজেলার ‘ভাই ভাই ডেইরি ফার্মে’র পরিচালক শাহান উদ্দিন জানান, ছয় মাস আগে ৩৪টি গরু কিনে মোটাতাজাকরণ শুরু করেন তিনি। পরিবারের সদস্যদের সহায়তায় গরুর পরিচর্যা করছেন। খাদ্যের দাম বাড়লেও ভালো বাজারমূল্যের আশা করছেন তিনি।
সিরাজগঞ্জের খান অ্যাগ্রোর পরিচালক নির্ঝর খান বলেন, ‘গত বছরের তুলনায় এবার গো-খাদ্যের দাম প্রতি বস্তায় ৩০০ থেকে ৪০০ টাকা বেড়েছে। এতে ষাঁড় মোটাতাজাকরণের ব্যয়ও বেড়েছে। তবে ভালো দাম পেলে লাভ হবে।’ তিনি আশঙ্কা প্রকাশ করে বলেন, ‘ভারতীয় গরু অবাধে বাজারে এলে দেশীয় খামারিরা ন্যায্যমূল্য থেকে বঞ্চিত হতে পারেন।’
উল্লাপাড়া উপজেলার খামারি শহিদুল হক জানান, অনেক ক্রেতা দরদাম চূড়ান্ত হওয়ার পরও গরু খামারেই রেখে যাচ্ছেন। ঈদের দু-এক দিন আগে তারা গরু নিয়ে যাবেন। তাঁর ভাষায়, ‘খামার থেকেই বেশির ভাগ গরু বিক্রি হয়।’
কামারখন্দ উপজেলার আলোকদিয়া এলাকার গোলাম কিবরিয়া গত বছরের অভিজ্ঞতা তুলে ধরে বলেন, একটি ষাঁড় পালনে তাঁর প্রায় ২ লাখ ৬০ হাজার টাকা খরচ হয়েছিল। বাড়িতে ব্যবসায়ীরা ৩ লাখ ৭০ হাজার টাকা দাম বললেও হাটে গিয়ে সর্বোচ্চ ২ লাখ ৭০ হাজার টাকার প্রস্তাব পান। পরে সেই গরু পরিবারের সদস্যদের নিয়ে কোরবানি দেন।
এবার ছোট আকারের গরু পালন করেছেন জানিয়ে তিনি বলেন, ‘গরুর খাবারের দাম অনেক বেড়েছে। বেশি দাম না পেলে লাভ থাকে না। তাই এবার ছোট গরু পালন করছি। দাম হতে পারে এক লাখ থেকে এক লাখ ২০ হাজার টাকা।’
গরুর খাবারের ব্যবসায়ী ফেরদৌস বলেন, ঈদ সামনে থাকায় গরু ও ছাগলের খাবারের চাহিদা বেড়েছে, তাই দামও কিছুটা বৃদ্ধি পেয়েছে।
জেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা ডা. এ কে এম আনোয়ারুল হক বলেন, ‘চলতি বছরে সিরাজগঞ্জে প্রায় ৬ লাখ ১৭ হাজার পশু কোরবানির জন্য প্রস্তুত করা হয়েছে। সম্ভাব্য বাজারমূল্য প্রায় ৩৫০ কোটি টাকা হতে পারে। ঈদকে ঘিরে এখন জেলাজুড়ে উৎসবের আমেজ বিরাজ করছে।’