শেরপুরের নালিতাবাড়ী উপজেলার সীমান্তবর্তী নয়াবিল ইউনিয়নের রাতকুচি এলাকার বাসিন্দা নুরজাহান বেগম (৭৮)। প্রায় ৪৮ বছর ধরে নিভৃত পাহাড়ি অঞ্চলের নারীদের স্বাভাবিকভাবে সন্তান প্রসবে সহায়তা করে আসছেন তিনি। দীর্ঘদিনের এই সেবার স্বীকৃতিস্বরূপ এলাকায় তিনি ‘জননী’ নামেই পরিচিত।
মাতৃ ও শিশুমৃত্যু হ্রাস, নিরাপদ প্রসব নিশ্চিত করতে নুরজাহান বেগমের মতো ধাত্রীদের গুরুত্বপূর্ণ অবদানকে স্বীকৃতি দিতে প্রতিবছর ৫ মে আন্তর্জাতিক ধাত্রী দিবস পালন করা হয়। দিবসটি স্মরণে কথা হয় এই বৃদ্ধার সঙ্গে।
বয়সের ভারে এখন কিছুটা ব্যস্ততা কমেছে নুরজাহান বেগমের। তবু কোনো প্রসূতির প্রয়োজনে ডাক পড়লে এখনো দিনরাত ছুটে যান দূরদূরান্তে। তবে ধাত্রীসেবা দিতে গিয়ে তিনি বা এলাকার অন্য ধাত্রীরা কোনো অর্থ নেন না।
নুরজাহান বলেন, ‘এখন বয়স অইয়া গেছে, তবু মানুষ ডাহে। রাইত-রিবাইতে আমারে নিবার লাগি আহে। আমিও যাই। কামডা তো ভালা—মানুষের উপকার অয়, মানুষ খুশি অয়।’
প্রায় ৫৮ বছর আগে বিয়ের পর এই এলাকায় আসেন নুরজাহান। শুরুতে এক প্রতিবেশীর সঙ্গে বাড়ি বাড়ি গিয়ে দেখে দেখে শিখে নেন ধাত্রীসেবার কাজ। পরে টাঙ্গাইলের মধুপুরে ব্র্যাকের সহায়তায় দুই দফায় ধাত্রীসেবা বিষয়ে প্রশিক্ষণ নেন তিনি। অভিজ্ঞতার পাশাপাশি এই প্রশিক্ষণ তাঁকে আরও দক্ষ করে তোলে। বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে এখন তিনি এলাকার অন্য নারীদেরও ধাত্রীর কাজ শিখিয়েছেন।
নুরজাহান জাহান, তিনি এ পর্যন্ত আড়াই হাজারের বেশি নারীর স্বাভাবিক সন্তান প্রসবে সহায়তা করেছেন। নিজের পরিবারেও তাঁর এই অভিজ্ঞতার ছাপ রয়েছে—ছেলে ও মেয়ের ঘরের ছয় নাতি -নাতনির জন্মও তাঁর হাত ধরেই হয়েছে। প্রায় এক যুগ আগে স্বামী মারা গেছেন তাঁর। তবে জীবনের এই দীর্ঘ সময়ে মানুষের সেবাকেই তিনি বড় করে দেখেছেন।
নুরজাহান ধাত্রীসেবার জন্য কোনো অর্থ নেন না। তবে গ্রামের প্রচলিত রীতি অনুযায়ী নবজাতককে প্রথমবার আঁতুড়ঘর থেকে বের করার দিন পরিবারটি সাধ্যমতো দাওয়াতের আয়োজন করে। সেখানে ধাত্রীকে আমন্ত্রণ জানানো হয়। অনেকেই খুশি হয়ে তাঁকে নতুন শাড়ি উপহার দেন।
নুরজাহান বলেন, একসময় গ্রামে সন্তান প্রসবে ধাত্রীরাই ছিলেন প্রধান ভরসা। তখন যোগাযোগব্যবস্থা উন্নত না থাকায় উপজেলা বা শহরে যাওয়ার সুযোগও কম ছিল। এখন উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স ও কমিউনিটি ক্লিনিকের মাধ্যমে প্রসূতি নারীরা নানা পরামর্শ পাচ্ছেন। ফলে অনেকেই এখন হাসপাতালে গিয়ে সন্তান প্রসব করছেন।