রংপুরের বদরগঞ্জে কাজ না করে কাগজে-কলমে শতভাগ কাজ বাস্তবায়ন দেখিয়ে এডিপি প্রকল্পের ৩৭ লাখ টাকা তুলে নেওয়ার অভিযোগ উঠেছে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) আঞ্জুমান সুলতানা ও উপজেলা প্রকৌশলী হারুন অর রশিদের বিরুদ্ধে।
জানা গেছে, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে উপজেলায় বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচির (এডিপি) সাধারণ বরাদ্দের আওতায় ৯৮ লাখ ৬৪ হাজার টাকা, উপজেলা উন্নয়ন তহবিলের আওতায় ৮৯ লাখ ও এমপির বিশেষ বরাদ্দে ৩৯ লাখ টাকা পাওয়া যায়। এসব বরাদ্দের বিপরীতে ৪৩টি প্রকল্প হাতে নেওয়া হয়। এর মধ্যে ২২টি প্রকল্প বাস্তবায়ন কমিটির (পিআইসি) মাধ্যমে করা হয়। ৩ লাখ টাকা করে ব্যয়ের এসব প্রকল্পের দায়িত্ব দেওয়া হয় ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান ও মেম্বারদের। ৩ লাখ টাকার বেশি ব্যয়ের প্রকল্পগুলোর টেন্ডার হয়েছিল। এসব প্রকল্প বাস্তবায়নের মেয়াদ ছিল গত ৩০ জুন পর্যন্ত। ওই তারিখের মধ্যে কাগজে-কলমে শতভাগ কাজ বাস্তবায়ন দেখিয়ে সব প্রকল্পের টাকা সরকারের কোষাগার থেকে উত্তোলন করা হয়েছে।
তবে এমপির বিশেষ বরাদ্দের দুটি প্যাকেজে ২৭ লাখ টাকা ও উপজেলা উন্নয়ন তহবিলের একটি প্যাকেজে ১০ লাখ টাকার প্রকল্পের কাজ না করেই টাকা উত্তোলন করা হয়েছে। ২৭ লাখ টাকার দুটি প্যাকেজে ছিল পাঁচটি রাস্তায় এইচবিবিকরণ ও ১০ লাখ টাকার একটি প্যাকেজে ছিল উপজেলার মাধ্যমিক পর্যায়ের বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে স্টিলের আলমারি সরবরাহকরণ।
সরেজমিনে দেখা যায়, এইচবিবিকরণ প্রকল্পের আওতায় থাকা রাধানগর ইউনিয়নের ৪ নম্বর ওয়ার্ডের লালদীঘির বাজার থেকে দক্ষিণ দিকে আনিসুলের বাড়ি থেকে আউয়ালের বাড়ি পর্যন্ত রাস্তায় কাজের কোনো অস্তিত্ব নেই। একই অবস্থা গোপীনাথপুর ইউনিয়নের ৯ নম্বর ওয়ার্ডের হাজীর মোড় থেকে মনো সরদারের ঈদগাহ মাঠ ব্রিজ পর্যন্ত রাস্তার। এ ছাড়া দামোরদরপুর ইউনিয়নের ২ নম্বর ওয়ার্ডের ঢুকঢুকির হাইস্কুল মোড় থেকে সরদার পাড়ার রাস্তার কোনো কাজও করা হয়নি।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, এই তিন রাস্তা ছাড়াও আরও দুটি রাস্তার এইচবিবিকরণের কাজ সম্পন্ন হয়নি। অন্যদিকে ১০ লাখ টাকার প্রকল্পের স্টিলের আলমারি কোনো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানেই সরবরাহ করা হয়নি বলে জানিয়েছেন শিক্ষকেরা। এ ছাড়া এডিপির টাকা পিআইসি করে চেয়ারম্যান-মেম্বারদের মাধ্যমে ৩ লাখ টাকা করে ২২টি প্রকল্প বাস্তবায়নের নামেও নয়-ছয়ের অভিযোগ উঠেছে।
তবে উপজেলা প্রকৌশলী অফিসের দাবি, দুই প্যাকেজের পাঁচটি রাস্তার মধ্যে একটি রাস্তায় এইচবিবিকরণের কাজ সমাপ্ত হয়েছে। স্টিলের আলমারি এখনো কেনা হয়নি। কিন্তু এসব কাজের দায়িত্ব পাওয়া ঠিকাদারদের নাম জানাতে রাজি হননি উপজেলা প্রকৌশলী।
ভুয়া ভাউচার দিয়ে টাকা তোলার অভিযোগ স্বীকার করে উপজেলা প্রকৌশলী হারুন অর রশিদ বলেন, ‘কিছুই করার ছিল না। কাজের মেয়াদ শেষ হওয়ার ৮ দিন আগে বরাদ্দ পেয়েছি। এ কারণে ৩০ জুনের মধ্যে কাজ সমাপ্ত করা সম্ভব হচ্ছিল না। তাই টাকা তুলে বিডি করে রাখা হয়েছে।’
মেয়াদ শেষ হওয়ার প্রায় ৩ মাস পার হলেও কাজ সম্পন্ন না হওয়ার কারণ জানতে চাইলে প্রকৌশলী বলেন, ‘মূল ঠিকাদার কাজ না করে স্থানীয় বিএনপি-সমর্থিত ঠিকাদার রুহুল আমীনের কাছে কাজগুলো বিক্রি করে দিয়েছেন। কিন্তু রুহুল আমিনকে বারবার অনুরোধ করার পরও তিনি কাজ না করে দলের প্রভাব খাটাচ্ছেন।’
এক প্রশ্নের জবাবে উপজেলা প্রকৌশলী বলেন, ‘এসব প্রকল্প আমার নয়, এটার সম্পূর্ণ অথরিটি ইউএনওর। তাঁর কাছে জানতে চান তিনি কেন কাজ করাতে ব্যর্থ হচ্ছেন।’
কাজ কিনে নেওয়ার অভিযোগ অস্বীকার করে বিএনপি নেতা ঠিকাদার রুহুল আমিন বলেন, ‘আমি কেন কাজ কিনে নেব, নিজেই তো কাজ পেয়েছি। আমার কাজ চলমান রয়েছে।’
এক প্রশ্নের জবাবে রুহুল আমিন বলেন, ‘এসব কাজ নিয়ে আপনার মাথাব্যথা উঠেছে কেন? উপজেলায় আরও তো সাংবাদিক আছে, তাঁরা তো এসব কাজ নিয়ে ভাবেন না, আপনি ভাবেন কেন?’
এ বিষয়ে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার কার্যালয়ে গত তিন দিন গিয়ে ইউএনও আঞ্জুমান সুলতানাকে পাওয়া যায়নি। তাঁর মুঠোফোনে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি কল রিসিভ করেননি। খুদেবার্তা পাঠালেও তাঁর কোনো সাড়া মেলেনি।
এ নিয়ে রংপুর-২ আসনের এমপি এ টি এম আজহারুল ইসলাম বলেন, ‘আমি প্রকল্প দিয়েছি, বাস্তবায়নের দায়িত্ব ইউএনও ও উপজেলা প্রকৌশলীর। কেন তাঁরা প্রকল্প বাস্তবায়ন করতে পারেননি, তা খোঁজ নিয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’