বাতাসে ভাসছে পোড়া লাশের গন্ধ। আর আহাজারিতে প্রকম্পিত হচ্ছে চারপাশ। কেউ খুঁজছে স্বামীকে, কেউ বাবাকে, কেউ আদরের ছেলেকে। তাঁদের গগনবিদারী চিৎকারে ভারী হয়ে উঠছে সান্তাহার শহরতলির বাতাস।
এই শহরে সম্প্রতি গড়ে উঠেছে প্লাস্টিকের ওয়ান টাইম প্লেট, গ্লাসের কারখানা বিআইআরএস প্লাস্টিক ফ্যাক্টরি।
ফ্যাক্টরির নানা পদে কর্মরত আছেন ৭২ জন কর্মচারী। প্রাপ্তবয়স্ক নারী-পুরুষের পাশাপাশি সহকারী শ্রমিক হিসেবে কিশোররাও কাজ করে এই কারখানায়। তাদেরই একজন দোগাছি মহল্লার নজরুল ইসলামের ছেলে সজিব (১২)। অন্যান্য দিনের মতো এই কিশোরও আজ সকালে কাজে আসে। কিন্তু বাড়ি ফেরা হলো তার।
কারখানার পাশে বসে আহাজারি করছেন তার মা। মায়ের ভয়, হয়তো পুড়ে যাওয়া পাঁচটি লাশের একটি তাঁর ছেলের। কিন্তু চেনার উপায় নেই। কারণ, আগুনে পুড়ে কয়লা হয়ে গেছে লাশগুলো।
আহাজারি করছে সান্তাহার পৌর শহরের ঘোড়াঘাট মহল্লার আব্দুল খালেক (৪৫), শহর কোলের সান্দিড়া গ্রামের শাহজাহানের (৩০) স্বজনেরাও। কারণ, অগ্নিকাণ্ডের পরে নিখোঁজ হয়েছেন এই দুই শ্রমিক।
গতকাল মঙ্গলবার বেলা সাড়ে ১১টায় বগুড়ার আদমদীঘি উপজেলার সান্তাহারে শহরের বিআইআরএস প্লাস্টিক কারখানায় ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে। আগুনে পুড়ে যাওয়া পাঁচজন শ্রমিকের লাশ উদ্ধার করেছে ফায়ার সার্ভিস। প্রাথমিক অবস্থায় উদ্ধার করা লাশের পরিচয় মেলেনি। আগুনে ওই কারখানার সব প্লাস্টিক পণ্য ও মালামাল পুড়ে গেছে। ঘটনা তদন্তে অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট সালাহউদ্দিন আহমেদকে প্রধান করে গঠিত হয়েছে চার সদস্যবিশিষ্ট তদন্ত কমিটি।
শ্রমিকেরা জানান, এদিন বেলা সাড়ে ১১টায় সময় ফ্যাক্টরির একটি মেশিন থেকে আগুনের সূত্রপাত হয়। আগুনের লেলিহান শিখা দেখতে পেয়ে কারখানার ভেতরে কর্মরত শ্রমিকেরা আর্তচিৎকার শুরু করে কারখানার বাইরে দৌড়ে বের হতে থাকেন। এলাকাবাসী ঘটনাটি জানতে পেরে ফায়ার সার্ভিসে খবর দেয়। আদমদীঘি থেকে ফায়ার সার্ভিসের কর্মীরা এসে আগুন নিয়ন্ত্রণে আনার চেষ্টা শুরু করে। আগুনের মাত্রা বাড়তে থাকলে পাশের নওগাঁ জেলা ও বগুড়া সদর থেকে ফায়ার সার্ভিসের টিম এসে যৌথ প্রচেষ্টায় আগুন নিয়ন্ত্রণে আনার কাজ চালাতে থাকে। ফায়ার সার্ভিসের বগুড়া ও নওগাঁর মোট ১২ ইউনিট প্রায় তিন ঘণ্টার চেষ্টায় আগুন নিয়ন্ত্রণে আনে। ততক্ষণে সবকিছু পুড়ে শেষ হয়ে যায়।
সরেজমিনে দেখা যায়, কারখানার দেয়াল ছাড়া অবশিষ্ট কিছুই নেই। আগুন নিয়ন্ত্রণে আসার পর ফায়ার সার্ভিসের কর্মীরা কারখানার ভেতর থেকে পুড়ে অঙ্গার হয়ে যাওয়া পাঁচটি লাশ উদ্ধার করে। ঘটনাস্থলে স্বজন হারানোদের আহাজারি করতে দেখা যায়।
পৌর মেয়র ভুট্টু বলেন, অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় মালামালসহ ৩০ কোটি টাকার ক্ষতি হয়েছে।
ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছেন বগুড়া জেলা প্রশাসক মো. জিয়াউল হক, এসপি সুদীপ কুমার চক্রবর্ত্তী, আদমদীঘি উপজেলা নির্বাহী অফিসার শ্রাবনী রায়সহ পুলিশ এবং প্রশাসনের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা।
জেলা প্রশাসক মো. জিয়াউল হক আজকের পত্রিকাকে বলেন, ঘটনা তদন্তে অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেটকে প্রধান করে চার সদস্য বিশিষ্ট তদন্ত কমিটি গঠিত হয়েছে। তদন্তে কারখানা কর্তৃপক্ষের অবহেলা বা কারও কোনো দায় থাকলে সেই অনুযায়ী আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
এসপি সুদীপ কুমার চক্রবর্ত্তী বলেন, লাশ শহীদ জিয়াউর রহমান মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মর্গে রাখা হয়েছে। পুড়ে বিকৃত হয়ে যাওয়ায় লাশ শনাক্ত করা সম্ভব হচ্ছে না। তাঁদের ডিএনএ পরীক্ষা করে স্বজনদের কাছে হস্তান্তর করা হবে।