নেত্রকোনার হাওর এলাকায় বোরো ধান চাষে জড়িতদের বড় অংশই ভূমিহীন বর্গাচাষি। জমির মালিকানা বা কাগজপত্র না থাকায় এসব কৃষক ব্যাংক থেকে কৃষিঋণ পান না। ফলে অর্থসংকটে দ্বারস্থ হতে হয় এনজিও ও মহাজনের কাছে। সেখান থেকে নিতে হয় চড়া সুদের ঋণ। অন্যদিকে ব্যাংকের কৃষিঋণের বড় অংশ চলে যাচ্ছে জমির মালিকদের হাতে, যাঁরা সরাসরি চাষাবাদে জড়িত নন।
হাওরে এখন পুরোদমে চলছে বোরো ধান কাটা। এই ব্যস্ততার মাঝেই চাষিরা ছোটেন পুঁজির খোঁজে। এর মধ্যে প্রাকৃতিক দুর্যোগ দেখা দিলে কৃষির ওপর চরম প্রভাব পড়ে; যা সাম্প্রতিক সময়ে হাওর এলাকায় অতিবৃষ্টি ও জলাবদ্ধতায় কৃষকদের চরমভাবে ভোগাচ্ছে। ফসল রোপণ করে কেউ এনজিও, কেউ মহাজনের দরজায়। কারণ, ব্যাংকের দরজা তাঁদের জন্য প্রায় বন্ধ।
কৃষি বিভাগ ও কৃষকদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, হাওরের বোরোচাষিদের প্রায় ৬০ শতাংশই ভূমিহীন। স্থানীয়ভাবে ‘জমা’ বা ‘পত্তন’ পদ্ধতিতে তাঁরা জমি বর্গা নিয়ে চাষাবাদ করেন। জমার টাকা, সার, বীজ, সেচসহ সবকিছুর জন্যই নগদ টাকা শুরুতে দরকার। কিন্তু নিজের জমির কাগজ না থাকায় ব্যাংক কৃষিঋণ দেয় না তাঁদের। ফলে ঋণের বোঝা নিয়েই শুরু হয় তাঁদের চাষাবাদ। তার ওপর রয়েছে অকাল বন্যা ও বৈরী আবহাওয়ার ঝুঁকি, নতুন সংকট জলাবদ্ধতা। সব মিলিয়ে হাড়ভাঙা পরিশ্রম করেও লাভ থাকে না এই চাষাবাদে।
মোহনগঞ্জের চানপুর গ্রামের ভূমিহীন কৃষক আব্দুল খালেদ বলেন, ‘ব্যাংকে ঋণ চাইতে গেলে জমির কাগজ দেখাতে বলে। আমরা তো জমির মালিক নই। জমির কোনো কাগজপত্রও নেই। বাধ্য হয়ে মহাজনের কাছ থেকে বা এনজিও থেকে অধিক সুদে টাকা নিতে হয়।’
খালিয়াজুরী সদরের আলয় সরকার বলেন, ‘ফসল ওঠার সঙ্গে সঙ্গে সুদের টাকা পরিশোধ করতে হয়। বর্তমানে ধান চাষে লাভ নেই। সার, কীটনাশকসহ সব কৃষি উপকরণের দাম বেশি। তারপর প্রাকৃতিক দুর্যোগ তো আছেই। অন্যের জমি চাষ করি, তাই জমার টাকা বাদ দিলে কিছুই থাকে না। এবার পানিতে সব তলিয়ে গেছে। নতুন করে সুদে টাকা এনে আগের দেনা শোধ করতে হবে। ব্যাংক থেকে ঋণ পেলে টেনশন একটু কম থাকত।’
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, নেত্রকোনায় মোট কৃষক পরিবার ৪ লাখ ৫২ হাজার ৪৮৪। এর মধ্যে ভূমিহীন ৬৮ হাজার ৯২, প্রান্তিক ১ লাখ ২৪ হাজার ১৫৯ এবং ক্ষুদ্র কৃষক ১ লাখ ৮৮ হাজার ৬৪৩।
মোহনগঞ্জ শাখা কৃষি ব্যাংকের ম্যানেজার কামরুল হাসান বলেন, বর্গাচাষিদের ঋণের প্র্যাকটিস নেই। বর্তমান নিয়ম অনুযায়ী জমির মালিক যদি ভূমিহীন কৃষকের জামিনদার হন, তবেই কৃষিঋণ দেওয়া সম্ভব।
স্থানীয়রা জানান, বাস্তবে এমন জামিনদার পাওয়া যায় না বললেই চলে। তবে বড় কৃষক বা জমির মালিকেরা বলছেন, শ্রমিক সংকট, উচ্চ মজুরি এবং অন্য পেশায় যুক্ত হয়ে পড়ার কারণে তাঁরা নিজেরা আর চাষাবাদ করেন না। তাই এক বছরের জন্য জমি বর্গা দেন।
মোহনগঞ্জ পৌর শহরের বাসিন্দা হাফিজুর রহমান বলেন, ‘হাওরে আমাদের বাবা-চাচাদের অনেক জমিজমা রয়েছে। আমরা সবাই নানা পেশায় যুক্ত, তাই শহরে বসবাস করি। চাষাবাদের লোক নেই। তাই জমি বর্গাচাষিদের দিয়ে রেখেছি। তারাই সেই জমিতে চাষাবাদ করে।’
জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক আমিরুল ইসলাম বলেন, যাঁরা সরাসরি মাঠে নেমে চাষ করেন, তাঁদের সহজ শর্তে কৃষিঋণ দেওয়া জরুরি। পাশাপাশি কৃষকদের শস্যবিমার আওতায় আনা দরকার। তবে নেত্রকোনার হাওর এলাকায় কোনো শস্যবিমা কার্যক্রম নেই।
সোনালী ব্যাংকের নেত্রকোনা শাখার সিনিয়র অফিসার রোকনুজ্জামান রোকন জানান, তাঁদের শাখায় ২০২৫-২৬ অর্থবছরে কৃষিঋণের লক্ষ্যমাত্রা ছিল ১৮ কোটি ৬০ লাখ টাকা। এর মধ্যে ৩১ মার্চ পর্যন্ত বিতরণ হয়েছে ৮০ শতাংশ।
জেলা কৃষি অফিস জানায়, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে জেলায় কৃষিঋণ বিতরণের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে ১২০ কোটি টাকা। এখন পর্যন্ত বিতরণ করা হয়েছে ৬৩ কোটি টাকা। এপ্রিল মাস পর্যন্ত ৫৩ শতাংশ।
জেলা কৃষি ব্যাংকের উপমহাব্যবস্থাপক মৃন্ময় চক্রবর্তী বলেন, যাদের জমির কাগজপত্র আছে, তারা খুব সহজেই কৃষিঋণ পায়। যাদের জমির কাগজ নেই, তাদের বেলায় জমির মালিককে জামিনদার হতে হয়।
এবার জেলায় ১ লাখ ৮৫ হাজার ৫৪৭ হেক্টর জমিতে বোরো আবাদ হয়েছে। উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা ১৩ লাখ ২১ হাজার ৭৩২ টন। এর মধ্যে হাওরে ৪১ হাজার ৬৫ হেক্টর জমিতে বোরো আবাদ করা হয়। উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয় ২ লাখ ৯২ হাজার ৫৯০ টন।