হোম > সারা দেশ > নওগাঁ

সৌদিতে আগুনে ১৬ জনের মৃত্যু: আত্রাইয়ের গ্রামে গ্রামে স্বজনহারার আহাজারি

সুমন আলী, নওগাঁ

সৌদি আরবের সোফা কারখানায় আগুনে দুই ছেলে হারানো মা ময়না খাতুনের আহাজারি। গতকাল নওগাঁর আত্রাই উপজেলার গন্ডগোহালী গ্রামে। ছবি: আজকের পত্রিকা

‘বড় ছাওয়াল গেছে সাত বছর হচ্ছে, আর মেজো ছাওয়াল গেছে দুই বছর। কোনোদিনও ছুটিতে আসেনি। ছাওয়ালটা বলছিল, “মা, কষ্ট করে খেয়ে দেনা শোধ করছি কেবল। বাড়ির কাজটা শুরু করছি, বাড়ি এসে বিল্ডিংয়ের কাজটা শেষ করব।” আমার বাবার আর বাড়ি আসা হলো না। কী সর্বনাশ হলো বাবা আমার।’

এসব কথা বলে আহাজারি করছিলেন নওগাঁর আত্রাই উপজেলার গন্ডগোহালী গ্রামের ময়না খাতুন। তাঁর দুই ছেলে—সুমন ও মোহন সৌদি আরবে সোফা কারখানায় আগুনে পুড়ে মারা গেছেন। তাঁকে সান্ত্বনা দেওয়ার ভাষা খুঁজে পাচ্ছেন না স্বজন ও প্রতিবেশীরা।

ওই অগ্নিকাণ্ডে গন্ডগোহালী গ্রামের আরও দুজনের মৃত্যু হয়েছে। স্থানীয় সূত্রে পাওয়া সর্বশেষ খবরে জানা গেছে, আগুনে নওগাঁ জেলার ১৩ জন এবং নাটোরের তিনজনসহ ১৬ জন মারা গেছেন। গত রোববার সৌদি আরবের রিয়াদের শিফা থানা এলাকার একটি সোফা তৈরির কারখানায় আগুন লাগে।

মাঝে মাঝে কান্না থামিয়ে দুই ছেলের সঙ্গে কথোপকথন তুলে ধরে ময়না খাতুন বলেন, ‘কালকে মেজো ব্যাটার সঙ্গে সকালে কথা কইছি। বলে, “ভালোই আছি মা, তুমি ভাত খাও, সুস্থ থাকো।” যখন আগুন লাগছে, তখন ফায়ার সার্ভিস আসছিল না। ছাওয়াল ভয়েস মেসেজ দিছে। দিয়ে বলে মারে, দুইডা কথা কমু মা, আমি আর কথা কমু না নে মা। আগুন লেগে পুড়ে যাচ্ছি মা, মরে যাচ্ছি।’

সুমন ও মোহনের মা আরও বলেন, ‘আমার দুই বাবাকে আমার বুকে অ্যানা দেও বাবা। আমার বাবাদের দেখে আমি কলিজা শান্ত করমু। বড় কষ্টের ছাওয়াল, আমার দুই ধনক আমার বুকে অ্যানা দে বাবা রে...।’

নওগাঁর জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ সাইফুল ইসলাম জানান, আগুনে পুড়ে এখন পর্যন্ত নওগাঁর আত্রাই উপজেলার ১২ জনের এবং সদরের একজনের মৃত্যুর খবর নিশ্চিত হওয়া গেছে। মরদেহ ফিরিয়ে আনতে প্রবাসীকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে সমন্বয় করা হচ্ছে।

নিহত ব্যক্তিদের মধ্যে আত্রাই উপজেলার চারজন একই গ্রামের বাসিন্দা। তাঁরা হলেন উপজেলার কালিকাপুর ইউনিয়নের গন্ডগোহালী গ্রামের মোহন প্রামাণিক (২২), তাঁর ছোট ভাই সুমন প্রামাণিক (১৬), একই গ্রামের রুবেল প্রামাণিক (৩০), কলিমুল্লাহ প্রামাণিক (৩৫)। এই উপজেলার নিহত অন্যরা হলেন উপজেলার সাদনগর গ্রামের সাগর (৩৮), খরস্রোতা গ্রামের মজিদুল (৩৪) ও আব্দুল জলিল (৪৮), উজানপৈ গ্রামের ফরিদ শেখ (৩২), ডুবাই গ্রামের সুমন (৩১) ও হাসিবুল হাসান শুভ (৩৭), বোয়ালা গ্রামের হৃদয় (৩২), মধ্য বোয়ালিয়া গ্রামের মিনহাজ (৩০) এবং নওগাঁ পৌরসভার পার-নওগাঁ এলাকার শাহিন (৩৮)।

গতকাল গন্ডগোহালী, উজানপৈ ও ডুবাই গ্রামে গিয়ে দেখা যায়, নিহত ব্যক্তিদের বাড়িতে কান্নার রোল। কেউ বুক চাপড়ে বিলাপ করছেন, কেউ প্রিয়জনের ছবি বুকে জড়িয়ে অঝোরে কাঁদছেন। তাঁদের কেউ আবার বারবার মূর্ছা যাচ্ছেন। তাঁদের আহাজারিতে সান্ত্বনা দিতে আসা মানুষগুলোরও চোখ ভিজে যাচ্ছে।

গন্ডগোহালী গ্রামের নিহত রুবেলের বাবা মোহাম্মদ সাইদুর বলেন, ‘আমার তো আর দুনিয়ার বুকে কেউ থাকল না বাবা। আমার নাতনি হছে, কেবল ১৪ দিন হচ্ছে। দুনিয়ার বুকে তো আমাক আর দেখার মতো কিছু থাকল না বাবা।’

এদিকে পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম সদস্যকে হারিয়ে চোখে অন্ধকার দেখছেন উজানপৈ গ্রামের ময়েন শেখ ও তাঁর স্ত্রী সাফিয়া খাতুন। পরিবারের বড় ছেলে ফরিদ শেখ দেড় বছর আগে সৌদি আরবে যান। ময়েন শেখ বলেন, ‘ছেলেটাক বিদেশ পাঠাতে হামি অনেক ঋণের মধ্যে পড়ে আছি। ফরিদের পাঠানো টাকা দিয়েই সংসার চলছিল। এখন ঋণ শোধ করমু ক্যামন করে আর সংসার চালামু ক্যামনে?’

পরিবারের উপার্জনক্ষম সদস্যকে হারিয়ে পুরো পরিবার অসহায় হয়ে পড়েছে। নিহত ফরিদের রয়েছে স্ত্রী ও দুই বছর বয়সী মেয়ে।

দুবাই গ্রামের হাসিবুল হাসান শুভর চাচা আনোয়ারুল ইসলাম বলেন, ‘অগ্নিকাণ্ডের সময় ওই কারখানায় থাকা শ্রমিকেরা সবাই ঘুমিয়ে ছিলেন। কারখানার মূল ফটক বাইরে থেকে তালা দেওয়া ছিল। ঘুমন্ত অবস্থায় কারখানায় আগুন লাগায় হাসিবুলসহ সেখানে থাকা সব শ্রমিকের মৃত্যু হয়েছে।’ ওই কারখানার শ্রমিকেরা দিনের বেলায় ঘুমিয়ে থাকতেন এবং রাতে কারখানায় কাজ করতেন বলে জানান।

আনোয়ারুল জানান, হাসিবুল পরিবারের বড় ছেলে। বিএ পাস করে স্থানীয় একটা এনজিওতে চাকরি করতেন। ওই চাকরিটা চলে যাওয়ার পর কিছুদিন বেকার ছিলেন। পরে জীবিকার সন্ধানে এবং পরিবারে আর্থিক সচ্ছলতা আনতে তিন বছর আগে তিনি সৌদি আরবে যান।

৩ জনের বাড়ি নাটোরের নলডাঙ্গায়

নলডাঙ্গা (নাটোর) প্রতিনিধি রানা আহমেদ জানান, নিহত ১৬ বাংলাদেশির মধ্যে তিনজনের বাড়ি নাটোরের নলডাঙ্গা উপজেলার খাজুরা ইউনিয়নে। নিহত ব্যক্তিরা হলেন ইউনিয়নের দীঘির পাড় গ্রামের মো. জাকির আলীর ছেলে মো. শামীম হোসেন (৩৫), খাজুরার শ্রীপুর পাড়ার মো. গোলাম রাব্বানীর ছেলে মো. সাব্বির আহমেদ শুভ (৩০), মহিষডাঙ্গা গ্রামের মো. আসলাম হোসেনের ছেলে মো. রবিউল আউয়াল হৃদয় (২৫)।

খাজুরা ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মো. সোহরাব হোসেন বিষয়টি নিশ্চিত করে জানান, নিহত তিন যুবকই দারিদ্র্যের সঙ্গে লড়াই করে পরিবারের মুখে হাসি ফোটাতে বছরখানেক আগে সৌদি আরবে গিয়েছিলেন।

নলডাঙ্গা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. আল ইমরান খান বলেন, ঘটনাটি অত্যন্ত দুঃখজনক। নিহত ব্যক্তিদের লাশ দ্রুত দেশে ফিরিয়ে আনার জন্য প্রয়োজনীয় কূটনৈতিক ও আইনি প্রক্রিয়া শুরুর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

প্রসঙ্গত, গত রোববার বিকেলে রিয়াদের শিফা থানাধীন মুসা সানাইয়া শিল্প এলাকায় একটি সোফা তৈরির কারখানায় ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে ১৬ বাংলাদেশি নিহত হন।

‘ছেলেরা বারবার হোয়াটসঅ্যাপে কল দিয়েছিল, কথা হয়নি’ গোফফার প্রামানিকের কাছে নেই কোনো সান্ত্বনা

১৩ প্রাণের শোকে স্তব্ধ নওগাঁ, কান্না থামছে না স্বজনদের

এলজিইডির কর্মচারীকে ‘হানি ট্র্যাপে’ ফেলে আপত্তিকর ভিডিও করে অর্থ আদায়, গ্রেপ্তার ৩

‘পুড়ে যাচ্ছি মা, মরে যাচ্ছি’, দেশে ফিরে বিয়ে করার কথা ছিল মোহনের

সৌদিতে আগুনে নিহত ১৬ বাংলাদেশির ১৩ জনই নওগাঁর

সৌদি আরবে কারখানায় অগ্নিকাণ্ডে নওগাঁর ১০ জনের মৃত্যু

সৌদি আরবে আগুনে পুড়ে নওগাঁর ৭ জনের মৃত্যু

মায়ের কোল ফিরে পেয়ে বিশ্বজয়ের হাসি লামিয়ার মুখে

নওগাঁর মান্দায় ট্রাক-মোটরসাইকেল সংঘর্ষে ওষুধ ব্যবসায়ী নিহত

নওগাঁর মান্দায় বৃদ্ধকে ইটভাটায় নিয়ে নির্যাতনের অভিযোগ, অস্বীকার ভাটামালিকের