হাম ও এর উপসর্গে ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ (মমেক) হাসপাতালে প্রায় তিন মাসে ৫০ শিশুর মৃত্যু হয়েছে। অথচ শিশু রোগীদের অবস্থা জটিল আকার ধারণ করলে তাদের নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে (আইসিইউ) নেওয়ার ব্যবস্থা নেই এই হাসপাতালে। তিন মাসেও হাসপাতালটিতে আইসিইউর ব্যবস্থা না হওয়ায় ক্ষোভ জানিয়েছেন শিশু রোগীদের অভিভাবকেরা।
এদিকে আইসিইউর বিকল্প হিসেবে বাবল সিপ্যাপ ব্যবহার করছেন চিকিৎসকেরা। প্লাস্টিকের একটি বোতলের সাহায্যে বিশেষ পদ্ধতিতে যন্ত্রটি তৈরি করা হয়েছে। যন্ত্রটি শিশুর শয্যার নিচে রাখা হয়। বোতলে পানি ও সেটিতে একটি নল লাগানো। যার মাধ্যমে হাসপাতালের কেন্দ্রীয় অক্সিজেন সরবরাহের সঙ্গে সংযোগ দিয়ে শিশুর নাকে মাস্ক পরিয়ে দেওয়া হয়।
হাসপাতালের শিশু বিভাগের সহকারী রেজিস্ট্রার ও হাম আইসোলেশন ওয়ার্ডের দায়িত্বে থাকা চিকিৎসক মাজহারুল আমিন জানান, শিশুদের আইসিইউ না থাকায় হাম আইসোলেশন ওয়ার্ডে চিকিৎসাধীন শিশুদের যখন অতিরিক্ত শ্বাসকষ্ট শুরু হয় এবং আইসিইউতে নিয়ে যাওয়ার মতো অবস্থা সৃষ্টি হয়, তখন বিকল্প হিসেবে বাবল সিপ্যাপ ব্যবহার করা হয়।
মাজহারুল আমিন বলেন, ‘বাবল সিপ্যাপ তৈরিতে সরকার প্রশিক্ষণ দিয়েছে এবং বাবল সিপ্যাপ সরবরাহ করেছে। নির্দেশনা অনুযায়ী যে বাচ্চাদের অতিরিক্ত শ্বাসকষ্ট হচ্ছে, স্বাভাবিক অক্সিজেনে যাদের অক্সিজেন স্যাচুরেশনের মাত্রা কমে যায়, সেই বাচ্চাদের সাধারণত বাবল সিপ্যাপ দেওয়া হয়।’
সম্প্রতি গাজীপুরের শ্রীপুরের গড়গড়িয়া মাস্টারবাড়ির চা দোকানি পারভেজ মোশাররফের সন্তান রাফসানের জ্বর ও নিউমোনিয়া দেখা দিলে শুরু হয় ছোটাছুটি। ২৬ এপ্রিল হামের টিকা দেওয়ার পর ফের তার শারীরিক অবস্থার অবনতি হয়। মাওনা বেসরকারি আল হেরা হাসপাতাল থেকে মমেক হাসপাতালে পাঠানো হয়। এর পর থেকে হাম আইসোলেশন ওয়ার্ডে ছিল শিশুটি। কিন্তু শেষরক্ষা হয়নি।
সন্তান হারানো পারভেজের আর্তনাদে সেদিন ভারী হয়ে উঠেছিল হাসপাতাল চত্বরের পরিবেশ। বিলাপ করে তিনি বলছিলেন, ‘ছেলেকে বাঁচাতে চেষ্টার কমতি রাখিনি। আক্ষেপ শুধু একটাই—যদি একটা আইসিইউ থাকত, তাহলে হয়তো আমার কোল খালি হতো না। বিভাগীয় শহরের হাসপাতালে আইসিইউ থাকবে না, এটা মেনে নেওয়া যায় না।’
মমেক হাসপাতালের সহকারী পরিচালক (প্রশাসন) ডা. মোহাম্মদ মাইনউদ্দিন খান বলেন, হামে আক্রান্ত শিশুদের জীবন বাঁচাতে আমাদের চিকিৎসকেরা সর্বোচ্চ চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন। দুর্ভাগ্যবশত, হাসপাতালে আসা রোগীদের একটি বড় অংশই একদম শেষ মুহূর্তে, যখন পরিস্থিতি অত্যন্ত জটিল হয়ে পড়ে, তখন ভর্তি হচ্ছে। সর্বশেষ মারা যাওয়া শিশুটির ক্ষেত্রেও হামের পাশাপাশি নিউমোনিয়া এবং সেপটিক শকের মতো মারাত্মক জটিলতা ছিল।
শিশুদের তীব্র জ্বর এবং শরীরে র্যাশ বা গুটি দেখা দিলে অবহেলা না করে দ্রুত কাছের স্বাস্থ্যকেন্দ্র বা হাসপাতালে নিয়ে আসার জন্য অভিভাবকদের প্রতি অনুরোধ জানান মোহাম্মদ মাইনউদ্দিন খান।
মমেক হাসপাতালের উপপরিচালক ডা. মো. জাকিউল ইসলাম বলেন, ‘আমরা আইসিইউর জন্য আবেদন করেছি। সরকার থেকে বরাদ্দ পেলেই আইসিইউ স্থাপন করা হবে। তবে, এতে জনবলসংকটসহ বিভিন্ন সমস্যা রয়েছে। তা নিয়ে আমরা কাজ করছি।’
হাসপাতালটিতে হামের উপসর্গে আরও এক শিশুর মৃত্যু হয়েছে। গত শুক্রবার শিশুটির মৃত্যু হয়। এ নিয়ে প্রায় তিন মাসে হাসপাতালটিতে হাম ও উপসর্গে মৃত্যুর সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৫০ জনে। গতকাল দুপুরে ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল থেকে পাঠানো বিজ্ঞপ্তিতে এ তথ্য জানানো হয়।
বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, গত ২৪ ঘণ্টায় মারা যাওয়া শিশুটি ১০ মাস বয়সী ছেলে। তাদের বাড়ি কিশোরগঞ্জের ইটনা উপজেলায়। ২ জুন সন্ধ্যা ৭টা ৩৫ মিনিটে তাকে মমেক হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছিল। টানা ১০ দিন চিকিৎসার পর গত শুক্রবার তার মৃত্যু হয়।
চিকিৎসকদের ডেথ সার্টিফিকেট অনুযায়ী, শিশুটির মৃত্যুর কারণ ‘সাসপেক্টেড হামের পাশাপাশি সেপটিক শক, নিউমোনিয়া এবং বাঁ ফুসফুসে পানি জমেছিল।’
গত ২৪ ঘণ্টায় হাসপাতালে হামের উপসর্গ নিয়ে ১৯ শিশু ভর্তি হয়েছে। তবে এই সময়ে সুস্থ হয়ে বাড়ি ফেরেনি কেউ। বর্তমানে হাম ও উপসর্গে হাসপাতালটিতে চিকিৎসাধীন ১০০ শিশু।
হাসপাতালের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, গত ১৭ মার্চ থেকে গতকাল পর্যন্ত হামে আক্রান্ত ২ হাজার ৬২ রোগী ভর্তি হয়েছে। এর মধ্যে সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরে গেছে ১ হাজার ৯১২ শিশু। আর মৃত্যু হয়েছে ৫০ শিশুর।