দীর্ঘ দুই দশক পেরিয়ে গেলেও মাগুরার আঞ্চলিক মসলা গবেষণা কেন্দ্রের জন্য ঘোষিত ২০ একর জমি অধিগ্রহণ কার্যক্রম আজও সম্পন্ন হয়নি। শুরুর দিকে জমি অধিগ্রহণের ঘোষণা দিয়ে প্রক্রিয়া চালু হলেও তা এখন পর্যন্ত শেষ হয়নি। এতে ভূমির মালিকেরা নিজেদের প্রয়োজনে জমি ক্রয়-বিক্রয় বা হস্তান্তরও করতে পারছেন না। দীর্ঘসূত্রতার বেড়াজালে অনিশ্চয়তায় ভুগছেন তাঁরা। ভুক্তভোগীরা চান, সরকার দ্রুত জমি অধিগ্রহণ সম্পন্ন করুক নয়তো ঘোষণাটি বাতিল করে জমি স্থায়ীভাবে ব্যবহারের সুযোগ দেওয়া হোক।
এদিকে অধিগ্রহণ প্রক্রিয়া সম্পন্ন করার আশ্বাসে অতীতে গবেষণা কেন্দ্রের এক সাবেক কর্মকর্তা বিভিন্ন সময় ভূমি মালিকদের কাছ থেকে অবৈধ আর্থিক সুবিধা নিয়েছেন বলেও অভিযোগ উঠেছে।
জেলা প্রশাসন ভূমি অধিগ্রহণ-সংক্রান্ত শাখা সূত্রে জানা গেছে, ‘স্থাবর সম্পত্তি অধিগ্রহণ ও হুকুমদখল আইন, ২০১৭’ অনুযায়ী নোটিশ জারির পর নির্দিষ্ট সময়সীমার মধ্যে প্রক্রিয়া সম্পন্ন করা বাধ্যতামূলক। নোটিশ জারির ৯০ দিনের মধ্যে অধিগ্রহণ শেষ করে ক্ষতিপূরণ প্রদানের কথা বলা হয়েছে। কিন্তু বাস্তবে দেখা যাচ্ছে, গবেষণা কেন্দ্রের ক্ষেত্রে এই আইনি প্রক্রিয়া মানা হয়নি।
জানা গেছে, জেলা মসলা গবেষণা কেন্দ্রটি ১৯৯৬ সালে প্রতিষ্ঠিত হয়। পরবর্তী সময় বাংলাদেশ পরমাণু গবেষণা ইনস্টিটিউটের (বিনা) মৌলিক গবেষণা প্রকল্প সম্প্রসারণের আওতায় ভূমি অধিগ্রহণের প্রয়োজন দেখা দেয়। ২০০৬ সালে মসলা গবেষণা কেন্দ্র সম্প্রসারণের জন্য পৌরসভার দুটি মৌজায় ২০ একর জমি অধিগ্রহণের কার্যক্রম শুরু হলেও পরবর্তীকালে তা থেমে যায়। এরপর নানা মহলের চিঠিপত্রের আদান-প্রদানের পর ২০১৫ সালে ভূমি মালিকদের নোটিশ জারি করা হয়। নোটিশ অনুযায়ী ৩৬ জন ভূমি মালিকের জমি অধিগ্রহণের ঘোষণা দেয় সংশ্লিষ্ট দপ্তর। কিন্তু সময় গড়িয়ে ২০২৬ সালে এসে দেখা যায়, প্রায় ১১ বছর পেরিয়ে গেলেও এখনো সেই অধিগ্রহণ প্রক্রিয়া চূড়ান্ত হয়নি। এই দীর্ঘসূত্রতায় নানাভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন ভূমি মালিকেরা। এ ছাড়া দ্রুত ভূমি অধিগ্রহণ কার্যক্রম সম্পন্ন হবে—এমন আশ্বাসে অনেক ভূমি মালিক সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাকে অবৈধ আর্থিক সুবিধা দিয়েছেন। এসব অভিযোগ করেছেন আঞ্চলিক মসলা গবেষণা কেন্দ্রের সাবেক প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ড. মো. মনিরুজ্জামানের বিরুদ্ধে।
ভূমি মালিক আশরাফুল ইসলাম অভিযোগ করে বলেন, অধিগ্রহণের নোটিশ জারি হওয়ার পর থেকে নিজেদের জন্য একটা স্থায়ী বাড়ি নির্মাণ করতে পারছেন না। এ ছাড়া দীর্ঘমেয়াদি কৃষিতে বিনিয়োগ করাও অনিশ্চিত। ভুক্তভোগীদের এভাবে বছরের পর বছর ঝুলিয়ে রেখে সরকার নিজেই আইন লঙ্ঘন করছে।
অন্য ভূমি মালিক আব্দুল খালেক বলেন, নিজেদের প্রয়োজনে জমি ক্রয়-বিক্রয় বা হস্তান্তর করতে পারছেন না। সরকার যেন দ্রুত জমি অধিগ্রহণ সম্পন্ন করে, নইলে ঘোষণাটি বাতিল করে জমি ব্যবহারের পূর্ণ স্বাধীনতা দেওয়ার দাবি জানান তিনি।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে একাধিক ক্ষতিগ্রস্ত ভূমি মালিক জানান, দ্রুত ভূমি অধিগ্রহণের আশ্বাস দিয়ে মোটা অঙ্কের অর্থ গ্রহণ করেছেন আঞ্চলিক মসলা গবেষণা কেন্দ্রের সাবেক প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ড. মো. মনিরুজ্জামান।
এ বিষয়ে ড. মনিরুজ্জামানের সঙ্গে মোবাইল ফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলে সেটি বন্ধ পাওয়া যায়। হোয়াটসঅ্যাপে খুদে বার্তা পাঠিয়েও কোনো সাড়া মেলেনি।
বর্তমান প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ড. মো. আশরাফুল আলম আজকের পত্রিকাকে বলেন, তিনি ভূমি অধিগ্রহণের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট দপ্তরের পরিকল্পনা শাখার সঙ্গে যোগাযোগ করেছেন। তিনি আশা করেন, নতুন সরকার অধিগ্রহণের বিষয়টি দেখবে। এদিকে ভূমি মালিকদের কাছ থেকে আর্থিক লেনদেনের বিষয়ে মৌখিকভাবে কিছু শুনেছেন বলেও জানান তিনি। বিভিন্ন অভিযোগের ভিত্তিতে তদন্ত করে প্রমাণ পাওয়ায় ইতিমধ্যে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তার বিরুদ্ধে ঊর্ধ্বতন অফিস ব্যবস্থা গ্রহণ করেছে।