চিকিৎসাসেবার অপ্রতুলতা তো রয়েছেই। সেই সঙ্গে কিশোরগঞ্জের হাওর এলাকাগুলোতে দরিদ্র মানুষের বসবাস নিত্য প্রাকৃতিক প্রতিকূলতা, অশিক্ষা আর অসচেতনতার বৃত্তে। এমনি সামাজিক বাস্তবতায় সবচেয়ে বেশি মূল্য দিতে হয় নারীদের। তবে এরই মধ্যে কিছু ঘটনা, কিছু মানুষের পেশাদারত্ব আর দায়িত্বশীল আচরণ বদলে দিচ্ছে অনেকের জীবন। হাওর অধ্যুষিত নিকলী উপজেলার নয়াপাড়া গ্রামের জাইতুনের ক্ষেত্রেও ঘটেছিল ঠিক এমনটিই—যেখানে চিকিৎসকদের সম্মিলিত প্রচেষ্টায় মৃত্যুর দুয়ার থেকে ফিরে এসেছে মা ও নবজাতক।
নয়াপাড়া গ্রামের এক সাধারণ পরিবারের অল্পবয়সী বধূ জাইতুন। প্রসবের সম্ভাব্য তারিখের প্রায় দেড় মাস অবশিষ্ট থাকতেই হঠাৎ দেখা দেয় তীব্র শ্বাসকষ্ট। বাতাস ভরা এই পৃথিবীতে নিজের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখতে তখন হাঁসফাঁস করছিলেন তিনি। গ্রামীণ জনপদের প্রথাগত ধারণার বশে নিয়মিত চিকিৎসকের কাছে না যাওয়ার খেসারত হিসেবে অল্প সময়ের মধ্যেই পরিস্থিতি চলে যায় চরম বিপর্যয়ের মুখে।
গত ২৪ অক্টোবর কিশোরগঞ্জের শহীদ সৈয়দ নজরুল ইসলাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি হওয়ার পর যখন তাঁকে গাইনি ইমার্জেন্সিতে আনা হয়, তখন ফুসফুস জলপূর্ণ এবং অক্সিজেন মাস্কের সর্বোচ্চ ব্যবহারেও স্যাচুরেশন টিকিয়ে রাখা যাচ্ছিল না। শুরু হয় চিকিৎসকদের প্রাণান্ত চেষ্টা।
রোগীর অবস্থা বেগতিক দেখে মেডিসিন, আইসিইউ এবং অ্যানেসথেসিয়া বিভাগ অবিলম্বে সমন্বিত পদক্ষেপ নেয়। ইন্টার্ন চিকিৎসকদের অনেকেই জাইতুনকে আপনজন ভেবে তার পাশে ঢাল হয়ে দাঁড়ান। ত্রাতা হিসেবে এগিয়ে আসেন ক্রিটিক্যাল কেয়ার স্পেশালিস্ট চিকিৎসক অনুপম কুমার দাস। মুমূর্ষু রোগীকে তাৎক্ষণিকভাবে আইসিইউতে স্থানান্তর করে শুরু করা হয় বাইপ্যাপ ভেন্টিলেশন।
চিকিৎসার সেই ২৪ ঘণ্টা কয়েকজন ইন্টার্ন চিকিৎসক রোগীর পাশে ছিলেন অতন্দ্র প্রহরীর মতো। তখনো কোনো চূড়ান্ত রোগনির্ণয় হয়নি। তবে চিকিৎসকেরা নিশ্চিত ছিলেন যে রোগীর হার্ট, কিডনি ও ফুসফুস একসঙ্গে অকার্যকর হয়ে পড়েছে। শুধু সচল ছিল তার মস্তিষ্ক আর বেঁচে থাকার তীব্র আকাক্ষা।
অবস্থা কিছুটা স্থিতিশীল হলে এবং অঙ্গ-প্রত্যঙ্গগুলো সাড়া দিতে শুরু করায় শিশুটিকে পৃথিবীতে এনে মা-বাচ্চা উভয়কে বাঁচানোর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। আইসিইউ ইনচার্জসহ চিকিৎসক ও নার্সদের তত্ত্বাবধানে জাইতুনকে নেওয়া হয় অপারেশন থিয়েটারে (ওটি)।
গত ২৭ অক্টোবর গাইনি বিভাগের প্রধান চিকিৎসক জাহিরুন নেছা রেনু ও অ্যানেসথেসিয়া বিভাগের প্রধান চিকিৎসক সোহেলের উপস্থিতিতে শুরু হয় অস্ত্রোপচার। সঙ্গে ছিলেন সহযোগী অধ্যাপক শাহানাজ বেগম, সহকারী অধ্যাপক আয়েশা সিদ্দিকা ও শাহানা জামান পলি। স্বল্প সময়ের এই সিজারিয়ানের মাধ্যমে ১.৮ কেজি ওজনের একটি প্রিম্যাচিউর নবজাতক পৃথিবীতে আসে। নবজাতককে শিশু বিভাগে এবং মাকে আইসিইউতে পাঠানোর পর চিকিৎসকদের বুক থেকে নামে এক বিশাল পাথর।
পরবর্তী সময়ে রোগীকে ইকোকার্ডিওগ্রাম করানোর পর চিকিৎসকদের আশঙ্কা সত্যি প্রমাণিত হয়। জানা যায়, তিনি ‘পারিপারটম ডাইল্যাটেড কারডিওমায়োপ্যাথি’ বা গর্ভাবস্থাসংক্রান্ত হার্টের জটিলতায় আক্রান্ত। অথচ ঠিক এ সময়ই দীর্ঘদিন উপার্জনহীন থাকা গরিব পরিবারের লোকজনের তাড়া পড়ে প্রসূতিকে নিয়ে বাড়ি ফেরার। চিকিৎসকদের ব্যক্তিগত আর্থিক সাহায্য এবং সরকারি সহায়তার আশ্বাসে বিগত কদিন হাসপাতালে ধরে রাখার পর অবশেষে গতকাল মঙ্গলবার হাসপাতাল থেকে সুস্থ হয়ে রিলিজ পান জাইতুন। তবে এই পুরো ঘটনা দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলের চিকিৎসাব্যবস্থার এক কঠিন চিত্রের কথাই মনে করিয়ে দেয়।
সেদিনের সেই টানটান উত্তেজনার মুহূর্ত ও নিজেদের অনুভূতির কথা জানিয়ে ইন্টার্ন চিকিৎসক মোক্তাদির আল বিরুনী বলেন, ‘রোগীর অবস্থা যখন কন্ট্রোলের বাহিরে চলে যাচ্ছিল, তখন স্বাভাবিকভাবেই সবার মধ্যে একটি শঙ্কা কাজ করেছিল। আমাদের গাইনি ডিপার্টমেন্টের সম্মানিত ম্যাডামগণ—বিশেষ করে আয়েশা ম্যাম ও বিনীতা ম্যাম-এর সময়োপযোগী উৎসাহ ও দূরদর্শিতা আমাদের দারুণ প্রেরণা জুগিয়েছে। গাইনি, মেডিসিন, আইসিইউ, শিশু বিভাগ ও সিসিইউ বিভাগের এই সম্মিলিত প্রচেষ্টা প্রমাণ করে যে, সঠিক টিমওয়ার্ক ও মানসিক জোর থাকলে অনেক কঠিন পরিস্থিতিও সফলভাবে সামলানো সম্ভব।’
মৃত্যুর কোল থেকে ফিরে আসা জাইতুন আবেগাপ্লুত কণ্ঠে বলেন, ‘আমি তো ভেবেছিলাম আমার শেষ সময় এসে গেছে, আর বুঝি বাঁচব না। আইসিইউতে যখন নিশ্বাস বন্ধ হয়ে আসছিল, ডাক্তাররা যেভাবে আমার মাথার কাছে পাহারা দিয়েছেন, তা কোনো দিন ভুলব না। তাঁরা আমার জীবন ভিক্ষা দিয়েছেন।’
তাঁর স্বামী হোসাইন বলেন, ‘আমাদের ঘরে কোনো টাকা-পয়সা ছিল না। বাড়িতে ছোট বাচ্চা আর বউয়ের অসুস্থতার খবর শুনে আমার মাথা কাজ করছিল না। সরকারি হাসপাতালেও যে এভাবে রোগীকে নিজের মানুষের মতো দিনরাত যত্ন করে জীবন বাঁচানো যায়, তা নিজের চোখে না দেখলে বিশ্বাস করতাম না। ডাক্তাররা শুধু চিকিৎসায় নয়, আমাদের সব দিক দিয়ে সাহায্য করেছেন।’
গাইনি বিভাগের সহকারী অধ্যাপক আয়েশা সিদ্দিকা আক্ষেপ প্রকাশ করে বলেন, ‘প্রয়োজনের তুলনায় এক-তৃতীয়াংশ লোকবল নিয়ে চলা বাংলাদেশের প্রতিটি সরকারি হাসপাতালে এমন ঘটনা নিয়মিতই ঘটে। কিন্তু সাধারণ মানুষ তা জানে না। মানুষকে একশ্রেণির অসাধু স্বার্থান্বেষী মহল বুঝিয়ে দিয়েছে যে ডাক্তাররা ‘কসাই’, কারণ এতে কিছু মানুষের ফায়দা লুটতে সুবিধা হয়।’