শরীরের বিভিন্ন স্থানে জখম নিয়ে কোনো এক বিদ্যালয়ের রক্তাক্ত সিঁড়ির সামনে মাঠে বসে আছেন এক যুবক। কখনো হাঁটুতে মাথা গুঁজে দিচ্ছেন, কখনো হাত ছড়িয়ে দিয়ে হাঁসফাঁস করছেন, চিৎকার করছেন। তাঁর ঘাড়ে ও পায়ে গুরুতর জখম থেকে গড়িয়ে পড়ছে রক্ত। একপর্যায়ে শরীর নিস্তেজ হয়ে পড়লে মাটিতে লুটিয়ে পড়েন! অন্যদিকে চারদিকে কয়েক গজ দূরত্বে দাঁড়িয়ে এই দৃশ্য দেখছিলের এলাকার বাসিন্দারা। যে যেভাবে পারছেন ভিডিও করছেন; কিন্তু ওই ব্যক্তিকে হাসপাতালে নিতে এগিয়ে যাচ্ছেন না কেউই!
এমন একটি ভিডিও ছড়িয়ে পড়েছে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে। ভিডিওর ক্যাপশনে অধিকাংশই গুরুতর আহত মানুষকে হাসপাতালে না নিয়ে ভিডিও করা ‘অমানবিকতা’ বা ‘মানবিক অবক্ষয়’-এর দৃষ্টান্ত বলে ইঙ্গিত করছেন। সেসব ভিডিওতে মন্তব্যের ঘরেও অধিকাংশের মন্তব্য তা-ই।
জানা গেছে, নিহত যুবক দুপুর থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত ওই মাঠে পড়ে ছিলেন। পরে পুলিশ তাঁকে উদ্ধার করে হাসপাতালে নিলে চিকিৎসক মৃত ঘোষণা করেন। অতিরিক্ত রক্তক্ষরণ মৃত্যুর প্রধান কারণ হিসেবে উল্লেখ করেছেন চিকিৎসক।
ছড়িয়ে পড়া ভিডিওর ঘটনাটি ঘটেছে গতকাল শুক্রবার কিশোরগঞ্জের কটিয়াদী উপজেলায়। মাঠটি লোহাজুরী ইউনিয়নের পূর্বচর পাড়াতলা উচ্চবিদ্যালয়ের।
নিহত ব্যক্তির নাম আনোয়ার হোসেন (৩৫)। তিনি ওই গ্রামের সাফি উদ্দিনের ছেলে। আর এই ঘটনায় অভিযুক্ত তাঁরই চাচা মরম আলী ও সহযোগীরা। ঘটনার পর থেকে তাঁরা পলাতক রয়েছেন।
আজ শনিবার নিহত যুবকের মা শিরিনা আক্তার বাদী হয়ে ৯ জনের নাম উল্লেখ করে মামলা দায়ের করেছেন। জমি নিয়ে দীর্ঘদিনের বিরোধের জেরে হত্যাকাণ্ড ঘটেছে বলে অভিযোগ করা হয়েছে।
পুলিশ ও স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, মরম আলী ও তাঁর ভাতিজা আনোয়ার হোসেনের পরিবারের মধ্যে দীর্ঘদিন ধরে জমি নিয়ে বিরোধ চলছিল। এ নিয়ে স্থানীয়ভাবে একাধিকবার সালিস-দরবার হলেও কোনো সমাধান হয়নি। শুক্রবার দুপুরে তুচ্ছ বিষয় নিয়ে তাঁদের মধ্যে আবার বাগ্বিতণ্ডা হয়। একপর্যায়ে মরম আলী ও তাঁর লোকজন আনোয়ারকে ধারালো অস্ত্র দিয়ে কুপিয়ে গুরুতর জখম করেন। এরপর গুরুতর আহত অবস্থায় আনোয়ারকে পূর্বচর পাড়াতলা উচ্চবিদ্যালয়ের মাঠে দেখেন স্থানীয় বাসিন্দারা। খবর পেয়ে সন্ধ্যায় পুলিশ গিয়ে তাঁকে উদ্ধার করে।
নিহত যুবকের মা শিরিনা আক্তার অভিযোগ করে বলেন, ‘আমরা দুপুরে বাড়িতে ছিলাম না। এই সুযোগে মরম আলী লোকজন নিয়ে আমার ছেলেকে কুপিয়ে আহত করে এবং ঘরের দরজা আটকে রাখে। পরে স্কুলের বারান্দায় ফেলে রেখে মৃত্যু নিশ্চিত করে। দীর্ঘ সময় তারা পাশে দাঁড়িয়ে থেকে কাউকে কাছে আসতে দেয়নি।’
নিহত যুবকের বোন সালমা আক্তারের অভিযোগ, তাঁর ভাইকে পরিকল্পিতভাবে কষ্ট দিয়ে মৃত্যুর দিকে ঠেলে দেওয়া হয়েছে।
এদিকে গুরুতর আহত এক ব্যক্তিকে স্থানীয় বাসিন্দারা কেন বাঁচাতে এগিয়ে গেলেন না, এ প্রশ্নের জবাবে তাঁরা জানান, আনোয়ার হোসেনের কর্মকাণ্ডে ‘অতিষ্ঠ’ ছিলেন তাঁরা।
নাঈম নামে এক স্থানীয় বাসিন্দা আজকের পত্রিকাকে বলেন, ‘এলাকায় আনোয়ার “আগুন মিস্ত্রি” নামে পরিচিত। উনি নিয়মিত গাঁজা সেবন করতেন, মাদকাসক্ত ছিলেন। এলাকার কারও সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক ভালো ছিল না।’
নাঈম আরও বলেন, ‘আনোয়ারের সঙ্গে কোনো কারণে কারও দ্বন্দ্ব হলে তাঁর ক্ষতি করার জন্য বাড়িঘরের কোথাও না কোথাও আগুন লাগায়ে দিতেন। তিনি একাধিক লোকের খড়ের গাদা, গোয়ালঘরে আগুন দিছেন। সেই আগুনে একজনের গরু পুড়ে মারা গেছে। তাঁর নামে একাধিক মামলাও আছে।’
এ বিষয়ে কটিয়াদী মডেল থানার পরিদর্শক (তদন্ত) শ্যামল মিয়া বলেন, ‘মরদেহ উদ্ধার করে ময়নাতদন্ত শেষে পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে। আজ (শনিবার) নিহত যুবকের মা বাদী হয়ে ৯ জনকে আসামি করে মামলা দায়ের করেছেন। আসামিদের গ্রেপ্তারে পুলিশের অভিযান চলছে।’
পুলিশের এই কর্মকর্তা আরও বলেন, ‘নিহত আনোয়ারের বিরুদ্ধে হত্যাসহ একাধিক মামলা ছিল।’