গাইবান্ধার রংপুর চিনিকলটি আধুনিকায়নের কথা বলে আখমাড়াই বন্ধ ঘোষণা করা হয়। প্রায় ছয় বছর আখমাড়াই বন্ধ থাকায় নষ্ট হচ্ছে মিলের কোটি কোটি টাকার সম্পদ। এদিকে মানবেতর জীবনযাপন করছেন মিলের শ্রমিক-কর্মচারীরা। আর দুর্ভোগে পড়েছেন হাজারো আখচাষি।
সরেজমিনে দেখা যায়, রংপুর চিনিকলটি ৩৫ একর জমিতে। মিল এলাকা জঙ্গলে ভরে গেছে। অযত্ন-অবহেলায় খোলা আকাশের নিচে পড়ে থাকায় আখ পরিবহনের যানবাহনগুলো নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। অন্যদিকে কারখানার ভেতরে চিনি উৎপাদনের কোটি কোটি টাকা মূল্যের যন্ত্রপাতি মরিচা ধরে বিকল হয়ে যাচ্ছে।
সূত্রে জানা গেছে, কৃষি অঞ্চল হিসেবে এ এলাকায় আখ চাষের প্রসার ঘটাতে ১৯৫৪ সালে চিনিকলটি স্থাপিত হয়। লোকসান কমিয়ে আধুনিকায়নের মাধ্যমে লাভজনক প্রতিষ্ঠানে উন্নীত করার লক্ষ্যে ২০২০ সালের ডিসেম্বরে চিনিকলের কার্যক্রম বন্ধ ঘোষণা করা হয়। ২০২১ সালের ৩০ জুন পর্যন্ত চিনিকলটি ৫১৪ কোটি ১১ লাখ টাকা লোকসানের দায় চাপিয়ে দেয় কর্তৃপক্ষ। বাংলাদেশ চিনি ও খাদ্য শিল্প করপোরেশন (বিএসএফআইসি) চিনিকলটি বন্ধ করে দেয়। এতে এ অঞ্চলের কৃষিতে আখ চাষের সম্ভাবনার দুয়ার বন্ধ হয়ে যায়।
অন্যদিকে চিনিকল বন্ধ হয়ে যাওয়ায় সাঁওতালসহ স্থানীয়রা তাদের নিজের বাপ-দাদার সম্পত্তি দাবি করে জোরপূর্বক দখলের চেষ্টা করছে। শিল্পপ্রতিষ্ঠানটির সঙ্গে জড়িয়ে থাকা আখচাষি, শ্রমিক কর্মচারীসহ এর সঙ্গে সম্পৃক্ত প্রায় ৩০ হাজার মানুষের জীবিকার আয় রোজগার বন্ধ হয়ে গেছে।
স্থানীয়রা বলছেন, জেলার মহিমাগঞ্জে অবস্থিত রংপুর চিনিকলকে ঘিরে সাতটি উপজেলার কৃষকেরা ব্যাপকভাবে আখের চাষাবাদ করতেন। তখন এ অঞ্চলের মানুষের আয়ের প্রধান উৎস ছিল আখ চাষ। আখ চাষ লাভজনক হওয়ায় কৃষকেরা অন্যান্য আবাদে তেমন আগ্রহী ছিলেন না। মৌসুমের বেশির ভাগ সময়জুড়ে চলত মাড়াইয়ের কাজ। চিনির কলটি বন্ধ হয়ে যাওয়ায় মিলের আখ চাষের প্রায় ১৮৬৫ একর জমি দখল হওয়ার দ্বারপ্রান্তে।
স্থানীয় জনগণের দাবি, চিনির কলটি বন্ধ হওয়ার কারণে কিছু ভূমিদস্যুসহ সাঁওতালরা দখল করে লিজ দিয়ে খাচ্ছেন। সাঁওতালদের সংখ্যালঘু দেখিয়ে কিছু দেশ ও বাইরে বেসরকারি এনজিও সংস্থাগুলো তাদের পক্ষে নানান যুক্তি স্থাপন করছেন। অন্যদিকে ভূমি দখল করে লিজ দেওয়া নিয়ে ভূমি উদ্ধার কমিটি দুটি অংশে বিভক্ত হয়ে গেছে। দুই অংশের কমিটি পাল্টাপাল্টি কর্মসূচি দিয়ে এলাকাসহ প্রশাসনের মাঝে বিরক্তির পরিবেশ সৃষ্টি করছে।
স্থানীয়দের দাবি, চিনির কলটি চালু করা হোক। নানা কৌশলে বেদখল হওয়া মিলের জমিতে পুনরায় আখ চাষের মাধ্যমে কৃষি অর্থনীতিতে উন্নয়নের দাবি জানান তারা। চিনিকলটি চালু হলে এলাকার অসংখ্য মানুষ বেকারত্বের অভিশাপ হতে মুক্তি পাবে।
সাঘাটার আখচাষি আলতাফ হোসেন বলেন, সে সময় মূলত মিলের কারণেই এ এলাকায় বৃহৎ পরিসরে আখের চাষ হতো। আবারও মিলটি চালু হলে একদিকে যেমন কৃষকেরা লাভবান হবে, এলাকার অর্থনীতিও এগিয়ে যাবে। আরেক আখচাষি আবুল কালাম দ্রুত চিনিকলটি চালু করে সাধারণ কৃষকদের আখ চাষের উদ্বুদ্ধ করার দাবি জানান।
রংপুর চিনিকল শ্রমিক-কর্মচারী ইউনিয়নের সভাপতি মো. আবু সুফিয়ান সুজা বলেন, বর্তমান সরকার এই অঞ্চলের মানুষের আর্থসামাজিক উন্নয়নের কথা বিবেচনা করে এবং বেকার যুবসমাজের কর্মসংস্থানের জন্য চিনিকলটি পুনরায় চালু করলে হাজারো বেকার বেকারত্বের অভিশাপ থেকে মুক্তি পাবে।
রংপুর চিনিকলের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (ইনচার্জ) মোহাম্মদ শাহিনুর ইসলাম বলেন, চিনিকলের বিপুল সম্পদ রক্ষায় বর্তমানে সাতজন স্থায়ী কর্মকর্তা এবং ৭৫ জন অস্থায়ী শ্রমিক-কর্মচারীর বেতন-ভাতা প্রদানে ১৮ লাখ টাকা ব্যয় হচ্ছে। চিনিকল চালুর বিষয়টি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের সিদ্ধান্তের ব্যাপার মাত্র। সরকার চাইলে যেকোনো সময় চালু করতে পারে।