ফেনীর পরশুরামে কিশোরীকে ধর্ষণের অভিযোগে গ্রেপ্তার হয়ে এক মাস দুই দিন কারাভোগ করা এক মসজিদের ইমাম শেষ পর্যন্ত ডিএনএ পরীক্ষায় নির্দোষ প্রমাণিত হয়েছেন। তদন্তে উঠে এসেছে, কিশোরীর ভূমিষ্ঠ সন্তানের জৈবিক পিতা তারই আপন বড় ভাই, মসজিদের ইমাম নয়। ভাইকে আড়াল করতে পরিকল্পিতভাবে ওই ইমামকে ধর্ষণ মামলায় ফাঁসানো হয়েছিল বলে জানিয়েছে পুলিশ।
পরশুরাম মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. আশ্রাফুল ইসলাম বলেন, শুধু অভিযোগের ভিত্তিতে নয়, ডিএনএ ও অন্যান্য তথ্যপ্রমাণের ওপর ভিত্তি করে পুলিশ শুরু থেকে গুরুত্ব দিয়ে তদন্ত করেছে। প্রকৃত সত্য উদ্ঘাটিত হওয়ার পর ওই ইমামের নাম চার্জশিট থেকে বাদ দেওয়া হয়েছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, জেলার পরশুরাম উপজেলার বক্সমাহমুদ ইউনিয়নের উত্তর টেটেশ্বর গ্রামের ১৪ বছরের এক কিশোরী ২০১৯ সালে স্থানীয় একটি মক্তবে পড়াশোনা শেষ করে। পরে ওই কিশোরী অন্তঃসত্ত্বা হয়ে সন্তান প্রসব করলে পরিবারের পক্ষ থেকে ওই মক্তবের শিক্ষক ও স্থানীয় জামে মসজিদের ইমাম মোজাফফর আহমদের (২৫) বিরুদ্ধে ধর্ষণের অভিযোগ আনা হয়।
২০২৪ সালের ২৪ নভেম্বর কিশোরীর মা বাদী হয়ে পরশুরাম মডেল থানায় নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনের ৯ (১) ধারায় মামলা করেন। অভিযোগটি মিথ্যা দাবি করে ২৬ নভেম্বর মোজাফফর আহমদ ফেনীর আদালতে পাল্টা মামলা করতে গেলে আদালত প্রাঙ্গণ থেকে তাঁকে পুলিশের হাতে তুলে দেওয়া হয়। পরে তিনি এক মাস দুই দিন কারাভোগের পর জামিনে মুক্তি পান।
মামলার তদন্তের অংশ হিসেবে ২০২৪ সালের ২২ ডিসেম্বর অভিযুক্ত মোজাফফর আহমদ ও কিশোরীর সংরক্ষিত ভ্যাজাইনাল সোয়াব ঢাকার মালিবাগে সিআইডির ফরেনসিক ল্যাবরেটরিতে পরীক্ষার জন্য পাঠানো হয়। ২০২৫ সালের ২১ জানুয়ারি প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়, ভ্যাজাইনাল সোয়াবে পুরুষের বীর্যের উপস্থিতি পাওয়া যায়নি। ফলে মোজাফফরের ডিএনএর সঙ্গে তুলনামূলক মতামত দেওয়া সম্ভব হয়নি।
পরে কিশোরী ও তার ভূমিষ্ঠ শিশুকন্যার জৈবিক পিতা শনাক্তে নতুন করে ডিএনএ পরীক্ষার আবেদন করে পুলিশ। তদন্ত চলাকালে জিজ্ঞাসাবাদে কিশোরী একপর্যায়ে স্বীকার করে, তার আপন বড় ভাই (২২) দীর্ঘদিন ধরে তাকে ধর্ষণ করছিল। বিষয়টি আড়াল করতে পরিবারের সদস্যরা স্থানীয় মসজিদের ইমাম মোজাফফরকে ফাঁসানোর চেষ্টা করেন।
এরপর ২০২৫ সালের ১৯ মে অভিযুক্ত ভাইকে গ্রেপ্তার করে আদালতে পাঠায় পুলিশ। পরদিন আদালতে ১৬৪ ধারায় দেওয়া জবানবন্দিতে তিনি আপন বোনকে ধর্ষণের কথা স্বীকার করেন।
আদালতের নির্দেশে একই বছরের ৪ আগস্ট কিশোরী, তার শিশুকন্যা এবং অভিযুক্ত ভাইয়ের ডিএনএ নমুনা সংগ্রহ করে ফরেনসিক পরীক্ষার জন্য ঢাকায় পাঠানো হয়। ৯ আগস্ট প্রকাশিত প্রতিবেদনে নিশ্চিত করা হয়, অভিযুক্ত ভাইয়ের সঙ্গে শিশুটির জৈবিক পিতা হিসেবে ৯৯ দশমিক ৯৯ শতাংশ মিল রয়েছে। একই প্রতিবেদনে বলা হয়, কারাভোগ করা মোজাফফর আহমদ ওই শিশুর জৈবিক পিতা নন।
মামলার তদন্ত কর্মকর্তা ও পরশুরাম মডেল থানা-পুলিশের উপপরিদর্শক শরীফ হোসেন অভিযোগপত্রে উল্লেখ করেন, মোজাফফর আহমদের বিরুদ্ধে আনীত ধর্ষণের অভিযোগের সত্যতা পাওয়া যায়নি। ফলে নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন, ২০০০-এর ৯(১) ধারার মামলা থেকে তাঁকে অব্যাহতি দেওয়া হয়েছে। অপর দিকে কিশোরীর ভাইয়ের বিরুদ্ধে একই ধারায় অভিযোগপত্র দাখিল করা হয়েছে। বর্তমানে তিনি ফেনী জেলা কারাগারে রয়েছেন।
এ বিষয়ে মোজাফফর আহমদ বলেন, ‘আমি সম্পূর্ণ নির্দোষ হয়েও কারাভোগ করেছি। সামাজিকভাবে অপমানিত হয়েছি, মসজিদের ইমামতি ও ইসলামিক ফাউন্ডেশনের চাকরি হারিয়েছি। মামলার খরচ চালাতে বাড়ির পাশের জমিও বিক্রি করতে হয়েছে। মানসিকভাবে এতটা ভেঙে পড়েছিলাম যে এত দিন বিষয়টি কাউকে বলতে পারিনি। এখন মানুষ সত্যটা জানতে পারছে। আমি এই ঘটনার ন্যায়বিচার চাই।’
মোজাফফর আহমদের আইনজীবী আবদুল আলিম মাকসুদ বলেন, ‘তদন্ত শেষ হওয়ার আগেই কাউকে দোষী আখ্যা দিলে নিরপরাধ মানুষের জীবনে কতটা ভয়াবহ পরিণতি হতে পারে, এই ঘটনা তার উদাহরণ। ডিএনএ পরীক্ষার মতো বৈজ্ঞানিক তদন্ত না হলে প্রকৃত অপরাধী হয়তো আড়ালেই থেকে যেত।’