‘মে দিবস কী জানি না, আমাদের সব দিনই সমান। কাজ পাইলে দিন ভালো, না পাইলে উপোস থাকতে হয়।’ ভোরের আলো ফুটতেই ফেনী শহরের ট্রাংক রোডের খেজুর চত্বরে দাঁড়িয়ে কথাগুলো বলছিলেন কুড়িগ্রাম থেকে আসা দিনমজুর রহমত উল্লাহ।
ফেনী শহরের ট্রাংক রোডের খেজুর চত্বর এলাকায় প্রতিদিন ভোরে বসে একধরনের অঘোষিত ‘শ্রমিকের হাট’। স্থানীয়দের কাছে এটি ‘মানব হাট’ নামেও পরিচিত। এখানে প্রতিদিন ৪০০ থেকে ৫০০ শ্রমিক কাজের আশায় জড়ো হন।
ভোর হতেই কাস্তে, কোদাল, ঝুড়ি আর কাপড়ের ঝোলা নিয়ে হাজির হন শ্রমিকেরা। কিছুক্ষণের মধ্যেই হাঁকডাকে মুখর হয়ে ওঠে এলাকা। ভোর ৫টা থেকে সকাল ৯টা পর্যন্ত চলে শ্রমিক বাছাই ও দরদাম। কাজের ধরন অনুযায়ী দৈনিক মজুরি নির্ধারিত হয় ৫০০ থেকে ৮০০ টাকার মধ্যে।
জানা যায়, কুড়িগ্রাম, গাইবান্ধা, রংপুর, রাজশাহী, সিরাজগঞ্জ, চাঁপাইনবাবগঞ্জসহ উত্তরাঞ্চলের বিভিন্ন জেলা এবং নোয়াখালীর চরাঞ্চল থেকে আসা শ্রমিকেরাই এখানে বেশি। নিজ এলাকায় কাজের সংকট, নদীভাঙন ও দ্রব্যমূল্যের চাপে তাঁরা ফেনীতে আসেন।
সরেজমিন দেখা গেছে, দীর্ঘ সারিতে দাঁড়িয়ে শ্রমিকেরা কাজের অপেক্ষা করছেন। কেউ নিজের মজুরি হাঁকছেন, কেউ চুপচাপ বসে আছেন। দরদাম শেষে যাঁদের নেওয়া হয়, তাঁরা অটো বা ভ্যানে করে কাজে চলে যান। আর যাঁদের ভাগ্যে কাজ জোটে না, তাঁরা হতাশ হয়ে ফিরে যান।
শ্রমিকদের অভিযোগ, এখানে কোনো নিয়োগপত্র, নির্দিষ্ট কর্মঘণ্টা বা শ্রমিক অধিকার নেই। অনেক সময় ১০-১২ ঘণ্টা কাজ করেও ন্যায্য মজুরি পান না।
গাইবান্ধার শ্রমিক গফফার আলী বলেন, ‘কাজে নেওয়ার সময় এক কথা কয়, শেষে আরেক কথা। অনেক সময় ঠিকমতো টাকাও দেয় না। কিছু বললে পরের দিন আর ডাকে না।’
রংপুরের হাশেম মিয়া বলেন, ‘১০-১২ ঘণ্টা কাজ করি, মজুরি পাই ৭০০ টাকা। এর মধ্যে খাওয়ার পেছনে ২০০ টাকা চলে যায়। বাকি টাকায় সংসার চলে না।’
ফেনীতে ২২ বছর ধরে শ্রমিকের কাজ করা বরিশালের আবুল কালাম বলেন, ‘এলাকায় কাজ নেই, তাই বেশি আয়ের আশায় এখানে আসি। কিন্তু দ্রব্যমূল্যের কারণে এখন আর কুলায় না। অনেক দিন কাজই পাই না।’
নোয়াখালীর চরাঞ্চল থেকে আসা সাকিব বলেন, ‘অনেক দিন খালি হাতে ফিরতে হয়। রুম ভাড়া আর খাওয়ার খরচ চালানো কঠিন হয়ে পড়ে।’
ভোলার কৃষক মো. আলম বলেন, ‘মে দিবস পালনে অনেক টাকা খরচ হয়, কিন্তু শ্রমিক-কৃষকের বাস্তব অবস্থার উন্নতি হয় না।’
আরেক শ্রমিক নুর ইসলাম বলেন, ‘আমাদের কোনো চুক্তি নেই। কাজ করতে গিয়ে অসুস্থ বা দুর্ঘটনা হলে নিজের টাকায় চিকিৎসা করতে হয়।’
স্থানীয় গৃহস্থ শাহ আলম বলেন, এই হাট প্রায় ৩০ বছর ধরে চলছে। মৌসুমভেদে শ্রমিকের চাহিদা ওঠানামা করে। অধিকাংশ শ্রমিক উত্তরাঞ্চল থেকে আসেন এবং কাজও ভালো করেন।
মোশাররফ হোসেন নামের ফেনীর এক বাসিন্দা বলেন, ‘ধান কাটার জন্য ছয়জন শ্রমিক নিতে এখানে এসেছি। প্রতিদিন ভোর থেকে সকাল ৯টা পর্যন্ত এখানে বিভিন্ন বয়সী শ্রমিক পাওয়া যায়। অনেকের সঙ্গে কথা বলেছি, কিন্তু দাম একটু বেশি চাওয়ায় এখনো কাউকে নিইনি।’
এদিকে ১ মে শ্রমিক দিবস উপলক্ষে ফেনীতে বিভিন্ন শ্রমিক সংগঠন, পরিবহন ইউনিয়ন ও প্রগতিশীল রাজনৈতিক দল শোভাযাত্রা ও আলোচনা সভার আয়োজন করেছে। তবে খেজুর চত্বরের এই শ্রমিকদের জীবনে মে দিবসের কোনো বাস্তব প্রতিফলন নেই।