টেলিনর গ্রুপের প্রেসিডেন্ট ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তার (সিইও) সাম্প্রতিক বাংলাদেশ সফরের প্রেক্ষাপটে গ্রামীণফোনের সাবেক কর্মীরা জিপি হাউসের সামনে ‘গণসমাবেশ’ কর্মসূচি পালন করেছেন। ‘গ্রামীণফোন ৫% বিলম্ব বকেয়া আদায় ঐক্য পরিষদ’-এর ব্যানারে আজ বুধবার বেলা সাড়ে ১১টা থেকে শুরু করে আড়াইটা পর্যন্ত চলে এই সমাবেশ। সমাবেশে অংশগ্রহণকারীরা আন্তর্জাতিক শ্রম মানদণ্ড অনুযায়ী তাঁদের পাওনা দ্রুত নিষ্পত্তির দাবি জানান।
সমাবেশে ক্ষোভ প্রকাশ করে বক্তারা বলেন, টেলিনর সিইও তাঁর সফরে ‘স্মার্ট বাংলাদেশ’ ও ‘শ্রম মান উন্নয়ন’ নিয়ে যে আশা ব্যক্ত করেছেন, গত ১৫ বছরের বাস্তবতায় তার কোনো প্রতিফলন দেখা যায়নি। উল্টো ১৭ মাস ধরে চলমান আন্দোলনের পরও ৪ হাজার পরিবারের পাওনা পরিশোধে কোম্পানিটি কোনো কার্যকর পদক্ষেপ বা আগ্রহ দেখায়নি। গ্রামীণফোনের মতো একটি শীর্ষস্থানীয় বহুজাতিক প্রতিষ্ঠানের এই অবস্থান ‘দায়িত্বশীল ব্যবসায়িক আচরণ’ এবং বৈশ্বিক নৈতিকতার পরিপন্থী।
পরিষদের আহ্বায়ক আবু সাদাত মো. শোয়েব বলেন, ‘টেলিনর সিইও ঢাকায় উন্নয়নের যে রূপরেখা দিয়েছেন, তা তখনই বিশ্বাসযোগ্য হবে, যখন ৪ হাজার পরিবারের বকেয়া পাওনা বুঝিয়ে দেওয়া হবে। আমরা দীর্ঘ ১৬ বছর আইনের প্রতি সর্বোচ্চ শ্রদ্ধা দেখালেও জিপি ম্যানেজমেন্ট আমাদের ধৈর্যকে দুর্বলতা হিসেবে গণ্য করেছে। আমরা চাই, বর্তমান সরকার টেলিনরকে তাদের বৈশ্বিক ব্যবসায়িক প্রতিশ্রুতি এবং আন্তর্জাতিক নীতিমালা মেনে এই সংকট নিরসনে বাধ্য করুক।’
মানববন্ধনে বক্তারা জানান, তাঁরা কেউ কেউ ১৫ থেকে ২০ বছর গ্রামীণফোনে চাকরি করেছেন। একেক সময় একেকজনকে চাকরিচ্যুত করা হয়েছে। কিন্তু নিয়মানুযায়ী বকেয়া পরিশোধ করা হয়নি। তাঁরা বলেন, এই লড়াইয়ের সঙ্গে প্রায় ৩ হাজার ৩৬০টি পরিবার ও হাজারো শ্রমিকের বহু বছরের বঞ্চনা জড়িয়ে আছে। এর মধ্যে অনেকে মারাও গেছেন।
মানববন্ধনে অংশ নেওয়া সাবেক কর্মী আদিবা জেরিন বলেন, ‘ইউনিয়ন করার কারণে ২০১২ সালে আমাকে চাকরিচ্যুত করা হয়, যা বাংলাদেশ শ্রম আইন, ১৮৬ ধারার লঙ্ঘন। সে সময় দুই শতাধিক কর্মীকে ই-মেইলের মাধ্যমে চাকরিচ্যুত করা হয়। ইউনিয়নের নিবন্ধন আবেদন ২৩ জুলাই শ্রম অফিসে জমা দিই। বিষয়টা জানতে পেরে পরদিন রাত সাড়ে ১১টার দিকে আমাদের ই-মেইলের মাধ্যমে চাকরিচ্যুত করে। তারপর ফোন করে আবার বলা হয়, তারা স্বেচ্ছায় রিজাইন করলে টারমিনেশন লেটার উইথড্র করা হবে। নানাভাবে ভয়ভীতি দেখানো হয় এবং বলা হয়, স্বেচ্ছায় রিজাইন না করলে প্রভিডেন্ট ফান্ডসহ এ ধরনের সুবিধাগুলো আটকে দেওয়া হবে। সে সময় তিনজন বাদে সবাই রিজাইন করতে বাধ্য হয়।’
আদিবা জেরিন জানান, সে সময় তিনিসহ তিনজন গ্রামীণফোনের এই পদক্ষেপের বিরুদ্ধে আদালতে মামলা করেন। সেই মামলা এখনো চলমান।
সমাবেশে কর্মীরা আলোচনার মাধ্যমে দ্রুত সম্মানজনক সমাধান চান। দাবি আদায় না হওয়া পর্যন্ত এই আন্দোলন চালিয়ে যাওয়ার ঘোষণা দেন তাঁরা। সাবেক কর্মী ফজলুল করিম প্রিন্স বলেন, ‘৫ শতাংশ লভ্যাংশ হিসাব করলে জিপির কাছে আমাদের পাওনা হাজার কোটি টাকার ওপরে। তবে আমরা তাদের কাছে ভ্যাট-ট্যাক্স বাদে প্রতিজন “মিনিমাম ১০ কোটি টাকা” করে দাবি করছি।’
সাবেক কর্মীদের দাবির বিষয়ে গ্রামীণফোন এক বার্তায় জানায়, ‘গ্রামীণফোনের কিছু সাবেক কর্মী চাকরি-সংক্রান্ত নানাবিধ দাবিদাওয়া নিয়ে গত কয়েক মাসে বিভিন্ন সময়ে জিপি হাউসের সামনে সমবেত হয়েছেন। আমাদের জানামতে, তাদের বেশির ভাগ বেশ কয়েক বছর আগেই প্রতিষ্ঠান ছেড়ে যান এবং আইন অনুযায়ী তাঁদের প্রাপ্য গ্রহণ করেন। এ ছাড়া তাঁরা যে দাবিগুলো তুলেছেন, সেগুলো বর্তমানে মহামান্য আদালতে বিচারাধীন। বিচারিক ব্যবস্থার প্রতি গ্রামীণফোন শ্রদ্ধাশীল। তাই আইনি প্রক্রিয়ার মাধ্যমে আদালতেই এসব বিষয়ের নিষ্পত্তি হবে বলে বিশ্বাস করে গ্রামীণফোন। সম্প্রতি আমরা আরও লক্ষ করছি যে এই ব্যক্তিরা গ্রামীণফোন সম্পর্কে গণমাধ্যম এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিভ্রান্তিকর তথ্য ছড়াচ্ছেন।’