দেশের চলমান জ্বালানি সংকটের মধ্যে ফিলিং স্টেশনগুলোয় তেল নেওয়ার ভোগান্তি দুদিন ধরে কমতে শুরু করেছে। জ্বালানির দাম ও সরবরাহ বৃদ্ধি করার পর বিশেষ করে মোটরসাইকেলের লাইনের দৈর্ঘ্য কমে এসেছে। আগের তুলনায় তেলও বেশি পাচ্ছেন চালকেরা। তবে প্রাইভেট কারের লাইনের দৈর্ঘ্যের খুব একটা পরিবর্তন দেখা যায়নি গতকাল বুধবার পর্যন্ত।
মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধের জেরে মার্চের শুরু থেকেই ফিলিং স্টেশনগুলোয় জ্বালানি নিতে দীর্ঘ লাইন তৈরি হয়। সরকার মজুত সংকট না থাকার কথা বললেও পাম্পে তেল সরবরাহ চাহিদার তুলনায় কমে যায়। সরকারের ভাষ্য, আতঙ্কিত হয়ে অতিরিক্ত কেনা ও একশ্রেণির লোকের মজুতের কারণে সরবরাহের ওপর চাপ তৈরি হয়েছে। সরকার ১৯ এপ্রিল জ্বালানি তেলের দাম উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়ানোর পর পরিস্থিতির উন্নতি হবে বলে ধারণা করা হলেও পুরোপুরি স্বস্তি আসেনি।
তবে সরেজমিনে দেখা গেছে, অধিকাংশ পাম্পে এখন আগের তুলনায় মোটরসাইকেলের লাইন ছোট হয়েছে। তেল পেতে অপেক্ষার সময় কমেছে। তবে প্রাইভেট কারের লাইন এখনো বেশ দীর্ঘ।
গতকাল দুপুরে দেখা যায়, তেজগাঁওয়ে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের পাশের ট্রাস্ট ফিলিং স্টেশনে ব্যক্তিগত গাড়ির লাইন প্রায় এক কিলোমিটার দূরে জাহাঙ্গীর গেট পর্যন্ত পৌঁছেছে। গাড়ির লাইনে প্রায় ২৫০টি প্রাইভেট কার ছিল। এ ছাড়া এক শর বেশি মোটরসাইকেল এবং কয়েকটি পিকআপ ভ্যান লাইনে অপেক্ষা করছিল। ব্যক্তিগত গাড়ির চালকদের তেল পেতে দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করতে হয়েছে।
এলেনবাড়ি এলাকার ট্রাস্ট পাম্পে মোটরসাইকেলের তেল নিতে আসা বেসরকারি চাকরিজীবী মহিউদ্দিন বলেন, প্রায় দুই ঘণ্টা লাইনে দাঁড়িয়ে তিনি ১ হাজার ৪০০ টাকায় প্রায় ১০ লিটার তেল নিতে পেরেছেন। ফুয়েল পাস ব্যবহার করে তুলনামূলকভাবে দ্রুত তেল পাওয়া গেছে বলে জানান তিনি। কয়েক দিন আগেও কখনো কখনো আট ঘণ্টা পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হয়েছে তাঁকে। আরেক বাইকচালক আবদুল খালেক বলেন, কয়েক দিন ধরে পাম্পগুলোয় তেল কম দেওয়া হচ্ছিল। ফলে এক দিন পরপরই লাইনে দাঁড়াতে হয়েছে। এখন ভিড় কিছুটা কমেছে, তেলও বেশি দেওয়া হচ্ছে।
পাম্পসংশ্লিষ্টরা বলছেন, তেলের দাম বাড়ানো এবং ফুয়েল পাস চালুর ফলে পরিস্থিতির উন্নতি হচ্ছে।
ট্রাস্ট ফিলিং স্টেশনের বিক্রয় সহকারী মোতালেব জানান, মোটরসাইকেলে ১০ লিটার এবং প্রাইভেট কারে প্রায় ৩২ লিটার করে তেল দেওয়া হচ্ছে। এভাবে চলতে থাকলে চার-পাঁচ দিনের মধ্যে মোটরসাইকেলের লাইনে স্বাভাবিকতা ফিরতে পারে বলে আশা প্রকাশ করেন তিনি।
গতকাল মহাখালী মোড়ের ইউরেকা এন্টারপ্রাইজ পাম্পে ফুয়েল পাসের মাধ্যমে এক হাজার টাকার তেল দিতে দেখা যায়। আর সরাসরি নিলে ৫০০ টাকার। পাস ব্যবহারকারীরা প্রতি ২৪ ঘণ্টায় একবার তেল নিতে পারছেন। পাম্পটির কর্মী সবুজ মিয়া আজকের পত্রিকাকে বলেন, ফুয়েল পাসে শৃঙ্খলা কিছুটা ফিরেছে এবং অতিরিক্ত তেল নেওয়ার প্রবণতা কমেছে।
তবে প্রাইভেট কারের চালকদের ভোগান্তি এখনো কাটেনি। রামপুরা থেকে মহাখালী মোড়ে আসা ব্যবসায়ী মোকলেছুর মাহমুদ জানান, এখনো দীর্ঘ সময় লাইনে দাঁড়িয়ে থাকতে হচ্ছে। উত্তরা থেকে আসা প্রাইভেট কারের চালক ফারুক বলেন, ‘বাইকে ফুয়েল পাস বাধ্যতামূলক হওয়ায় অপেক্ষার সময় কমেছে। তবে গাড়ির লাইন ছোট হচ্ছে না। ঘণ্টার পর ঘণ্টা আমাদের অপেক্ষা করতে হচ্ছে।’
নিকুঞ্জ মডেল সার্ভিস সেন্টারসহ কিছু পাম্পে ভিড় তুলনামূলকভাবে কম ছিল। তেজগাঁও লিংক রোডের শিকদার ফিলিং স্টেশন ও মেসার্স এস এস ফিলিং স্টেশনে গতকাল উল্লেখযোগ্য ভিড় দেখা যায়।
তেজগাঁও রিং রোডে আড়ংয়ের বিপরীতে থাকা মেসার্স এস এস ফিলিং স্টেশনে গতকাল বেলা দেড়টা পর্যন্ত তেল সরবরাহ শুরু হয়নি। সেখানে তেল নেওয়ার অপেক্ষায় প্রাইভেট কারের লাইন হাতিরঝিলের মুখ পর্যন্ত পৌঁছে যায়। পাম্প থেকে প্রায় এক কিলোমিটার দূরে দাঁড়িয়ে থাকা তুহিন নামের প্রাইভেট কারের চালক বলেন, সাধারণত লাইন এত বড় হয় না। কিন্তু তেল দেওয়া শুরু করেনি বলে এত বড় হয়েছে।
এদিকে রাজধানীতে ‘ফুয়েল পাস’ অ্যাপের মাধ্যমে জ্বালানি বিতরণ কার্যক্রম গতিশীল করতে নির্ধারিত সাতটি পেট্রলপাম্পে অকটেন সরবরাহ বাড়িয়েছে বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন (বিপিসি)। আগের তুলনায় ৫ শতাংশ বাড়িয়ে এখন মোট ২৫ শতাংশ অতিরিক্ত অকটেন সরবরাহ করা হচ্ছে। গতকাল সকাল থেকেই এই সরবরাহ শুরু হওয়ার পর সংশ্লিষ্ট পাম্পগুলোয় কিছুটা স্বস্তি দেখা গেছে।
ফিলিং স্টেশনের মালিক ও কর্মচারীদের মতে, সরবরাহ স্বাভাবিক রাখা, অ্যাপভিত্তিক ব্যবস্থার প্রসার এবং ব্যবহারকারীদের সচেতন আচরণ নিশ্চিত করা গেলে জ্বালানি সংকটের ভোগান্তি দ্রুত কমে আসবে।
জ্বালানি বিভাগের যুগ্ম সচিব ও মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র মনির হোসেন চৌধুরী বলেন, ‘পেট্রলপাম্পে গত বছরের এই সময়ের চেয়ে অকটেন ২০ শতাংশ এবং ডিজেল ও পেট্রল ১০ শতাংশ বর্ধিত হারে সরবরাহ অব্যাহত আছে। যত দিন প্যানিকড বায়িং বা বাড়তি কেনাকাটার চাহিদা অব্যাহত থাকে, তত দিন আমরাও সরবরাহ অব্যাহত রাখব। সরকারের হাতে এপ্রিল ও মে মাসের চাহিদা পূরণ করার মতো তেল মজুত আছে।’