সন্তানের স্বপ্ন ছিল চিকিৎসক হবেন। সেই স্বপ্ন পূরণের লক্ষ্যে ভারতের জম্মু-কাশ্মীর থেকে ছেলেকে নিয়ে বাংলাদেশে এসেছিলেন মা নিঘাত বেগম। ভেবেছিলেন, বিদেশের মাটিতে হলেও সন্তানের পড়াশোনাটা শেষ হবে, একদিন সাদা অ্যাপ্রোন গায়ে জড়িয়ে চিকিৎসক হিসেবে মানুষের সেবা করবে তাঁর সন্তান। কিন্তু সেই স্বপ্নের করুণ পরিসমাপ্তি হলো সন্তানের রহস্যজনক মৃত্যুতে।
ছেলের পাশে থাকার জন্য যে মা বাংলাদেশে এসেছিলেন, সেই মায়ের সামনেই শেষ হলো ছেলের জীবনের পথচলা। এখন ছেলেকে ঘিরে তাঁর সব স্বপ্ন, প্রত্যাশা আর অপেক্ষা যেন আটকে আছে হাসপাতালের হিমাগারে।
নিহত ওই শিক্ষার্থীর নাম আদনান আলতাফ। তিনি ভারতের জম্মু-কাশ্মীরের বারামুল্লা জেলার সুপুর এলাকার বুনপাড়া, দাঙ্গালপাড়ার বাসিন্দা আলতাফ হোসাইন রাথারের ছেলে। কুমিল্লার বুড়িচং উপজেলার কাবিলায় অবস্থিত ইস্টার্ন মেডিকেল কলেজের পঞ্চম বর্ষের শিক্ষার্থী ছিলেন আদনান। আজ বুধবার সকালে কলেজের পাশের একটি পুকুর থেকে তাঁর মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ। কলেজ ক্যাম্পাস থেকে প্রায় ৫০০ গজ দূরে ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কসংলগ্ন ওই জলাশয়ে ভাসছিল তাঁর নিথর দেহ। গত সোমবার রাত থেকে নিখোঁজ ছিলেন তিনি।
কলেজ সূত্রে জানা যায়, আদনান দীর্ঘদিন ধরে পড়াশোনায় অনিয়মিত ছিলেন। শারীরিক অসুস্থতার কারণে নিয়মিত ক্লাস ও পড়াশোনা করতে পারেননি। এতে তাঁর শিক্ষাজীবনে পিছিয়ে পড়ার পরিস্থিতি তৈরি হয়। পরিবারের সদস্যরা বিষয়টি নিয়ে উদ্বিগ্ন ছিলেন। তাঁকে চিকিৎসা ও কাউন্সেলিংয়ের জন্য দেশে নিয়ে যাওয়া হয়।
পরে সুস্থ হয়ে আবার পড়াশোনা শুরু করবেন, পরীক্ষায় অংশ নেবেন—এমন প্রত্যাশা থেকেই পরিবারের উদ্যোগে তাঁকে আবার বাংলাদেশে নিয়ে আসা হয়। গত ৩০ অক্টোবর পরীক্ষায় অংশ নেওয়ার উদ্দেশ্যে মাকে নিয়ে বাংলাদেশে আসেন আদনান। সন্তানের পড়াশোনার বিষয়টি যাতে আর বাধাগ্রস্ত না হয়, সে জন্য মা নিজেও তাঁর সঙ্গে থেকে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেন।
গত ২ নভেম্বর রাতে কলেজের হোস্টেল থেকে বের হন আদনান। এরপর আর তাঁর খোঁজ পাওয়া যাচ্ছিল না। কোথায় গেলেন, কার সঙ্গে গেলেন, কী ঘটেছিল তাঁর সঙ্গে, কোনো প্রশ্নের উত্তরই মিলছিল না। সন্তানের সন্ধান না পেয়ে উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েন মা।
পরদিন ৩ নভেম্বর কলেজ কর্তৃপক্ষ ও আদনানের মা বুড়িচং থানায় একটি সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করেন। নিখোঁজ শিক্ষার্থীকে উদ্ধারে পুলিশ বিভিন্ন স্থানের সিসিটিভি ক্যামেরার ফুটেজ পর্যালোচনা করে অনুসন্ধান শুরু করে। একদিকে পুলিশের তৎপরতা, অন্যদিকে সন্তানের ফিরে আসার অপেক্ষায় প্রতিটি মুহূর্ত কাটছিল মায়ের।
কিন্তু সেই অপেক্ষার অবসান হয় এক ভয়াবহ খবরে। আজ সকালে কলেজের পাশের একটি পুকুরে মরদেহ ভাসতে দেখেন স্থানীয় লোকজন। খবর পেয়ে পুলিশ ঘটনাস্থলে যায়। পরে কলেজ কর্তৃপক্ষ ও আদনানের মা সেখানে উপস্থিত হয়ে মরদেহটি তাঁর বলে শনাক্ত করেন।
বুড়িচং থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) লুৎফুর রহমান জানান, স্থানীয় লোকজনের কাছ থেকে খবর পেয়ে পুলিশ পুকুর থেকে মরদেহ উদ্ধার করে। পরে ময়নাতদন্তের জন্য কুমিল্লা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মর্গে পাঠানো হয়। ময়নাতদন্ত শেষে মরদেহ ইস্টার্ন মেডিকেল কলেজে নেওয়া হয়। প্রাথমিকভাবে মরদেহে কোনো আঘাতের চিহ্ন পাওয়া যায়নি।
তিনি আরও জানান, মরদেহ ঢাকায় মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের হিমাগারে রাখা হবে। সেখানে স্বজনদের কাছে মরদেহ হস্তান্তর করা হবে। পরবর্তী আইনগত প্রক্রিয়া শেষে মরদেহ ভারতে নিয়ে যাওয়ার ব্যবস্থা করা হবে। তবে আদনানের মৃত্যু কীভাবে হয়েছে, তা এখনো নিশ্চিত হওয়া যায়নি। এটি দুর্ঘটনা, আত্মহত্যা নাকি অন্য কোনো কারণে তাঁর মৃত্যু হয়েছে, তা তদন্ত ও ময়নাতদন্তের প্রতিবেদন পাওয়ার পরই স্পষ্ট হবে।
ইস্টার্ন মেডিকেল কলেজের বিদেশি শিক্ষার্থীদের সমন্বয়ক শিক্ষক রাজীব আশ্রাফ বলেন, ‘আদনান কলেজের ফাইনাল বর্ষের শিক্ষার্থী ছিলেন। তবে অনিয়মিত হওয়ায় পড়াশোনায় পিছিয়ে পড়েছিলেন। অসুস্থতার কারণে নিয়মিত লেখাপড়া করতে পারেননি। পরে তিনি দেশে চলে যান। বাড়িতে চিকিৎসা শেষে আবার পরীক্ষায় অংশ নেওয়ার জন্য মাকে সঙ্গে নিয়ে বাংলাদেশে আসেন।’
কলেজের চেয়ারম্যান শাহ মো. সেলিম বলেন, আদনান মানসিকভাবে কিছুটা বিপর্যস্ত ছিলেন। নিয়মিত ক্লাস করতেন না। বিষয়টি তাঁর অভিভাবকদের জানানো হলে তাঁরা তাঁকে দেশে নিয়ে কাউন্সেলিং করান।
তিনি বলেন, ‘শিক্ষার্থীর মানসিক অবস্থার কথা বিবেচনা করে তাঁর মাকেও সঙ্গে রাখা হয়েছিল। ঘটনার দিন রাতে মাকে খাবার দিতে বলে নিজের কক্ষ থেকে বের হন। ধারণা করা হচ্ছে, কোনো একসময় পুকুরপাড়ে গিয়ে বসেছিলেন। হয়তো পানিতে পড়ে যাওয়ার পর আর উঠতে পারেননি। তবে প্রকৃত ঘটনা ময়নাতদন্তের প্রতিবেদন পাওয়ার পর জানা যেতে পারে।’
আদনানের মৃত্যুর ঘটনায় ইস্টার্ন মেডিকেল কলেজের শিক্ষার্থী ও স্থানীয়দের মধ্যে চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়েছে। একজন বিদেশি শিক্ষার্থীর এমন মৃত্যু নানা প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে। এসব প্রশ্নের উত্তর খুঁজছেন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা।