হোম > সারা দেশ > কক্সবাজার
পর্যটন এলাকায় দুর্ঘটনা

অনিরাপদ পর্যটন এলাকা, আড়াই মাসে ২৫ মৃত্যু

• রিসোর্টে আগুনে মৃত্যু হয়েছে ১০ জনের।

• ১০ জন মারা গেছেন পানিতে ডুবে।

• সড়ক দুর্ঘটনায় চারজনের মৃত্যু।

• প্যারাসেইলিং দুর্ঘটনায় মারা গেছেন একজন।

জয়নাল আবেদীন, ঢাকা

ফাইল ছবি

দেশে পর্যটনের প্রধান কেন্দ্র কক্সবাজারের দীর্ঘ সমুদ্রসৈকত আর তার পাশ ঘেঁষে থাকা ছোট ছোট পাহাড়। সেখানে ঘুরতে গিয়ে চার দিনের ব্যবধানে প্রাণ গেছে ১৫ জনের। এর মধ্যে ১০ জনের মৃত্যু হয়েছে রিসোর্টে অগ্নিকাণ্ডে এবং পাঁচজন সাগরে ডুবে। এই ঘটনার রেশ না কাটতেই রাঙামাটির সাজেকে ঘুরতে গিয়ে আটকে পড়ার পর গোলাগুলির শব্দ শুনে ফিরতে হয়েছে প্রায় ৩ হাজার পর্যটককে।

গত আড়াই মাসে দেশের বিভিন্ন পর্যটন এলাকায় এসব দুর্ঘটনায় অন্তত ২৫ জনের মৃত্যুর তথ্য পাওয়া গেছে। এ ছাড়া পাহাড়ে নিষিদ্ধ সংগঠনের মাধ্যমে জিম্মি ও গোলাগুলির ঘটনাও ঘটছে।

এসব মৃত্যু কি নিছক দুর্ঘটনা, নাকি পর্যটকদের নিরাপত্তায় অবহেলা ও ব্যবস্থাপনাগত দুর্বলতার দায়ও রয়েছে, সেই প্রশ্ন উঠছে। পর্যটনকেন্দ্রগুলোতে নিরাপত্তার ঘাটতি, নজরদারির বাস্তবতা এবং দুর্ঘটনা এড়াতে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের প্রস্তুতি নিয়ে প্রশ্ন তুলছেন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা।

তবে পর্যটকদের নিরাপত্তায় কোনো ঘাটতি নেই বলে দাবি করেছেন ট্যুরিস্ট পুলিশ সদর দপ্তরের মুখপাত্র পুলিশ সুপার মো. মারুফাত হোসাইন। তিনি আজকের পত্রিকাকে বলেন, পুলিশের পাশাপাশি পর্যটন এলাকায় নিরাপত্তার জন্য বিভিন্ন সংস্থা কাজ করে। নিরাপত্তা- ব্যবস্থায় পুলিশের কোনো ঘাটতি নেই। পূজা উপলক্ষে এবং পর্যটনের মূল মৌসুম শুরু হওয়ায় কক্সবাজারে অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে। তবে পর্যটকদের অসচেতনতা ও সতর্কবার্তা অমান্য করার কারণে অনেক সময় দুর্ঘটনা ঘটে।

কক্সবাজারের উখিয়ার ইনানীতে টুপটুপ নামের একটি রিসোর্টে ১৭ অক্টোবর সকালে অগ্নিকাণ্ডে নারী-শিশুসহ ১০ পর্যটকের মৃত্যু হয়। এই ঘটনার পর কক্সবাজারের হোটেল-মোটেল ও রিসোর্টগুলোর নিরাপত্তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।

কক্সবাজার জেলায় ২ হাজারের বেশি হোটেল, রিসোর্ট ও কটেজ রয়েছে। টুপটুপ রিসোর্টের মতো কক্সবাজার শহর ও আশপাশ এলাকায় অনুমোদনহীন হোটেল, রিসোর্ট ও কটেজের সংখ্যা ছয় শতাধিক। পর্যটনসংশ্লিষ্ট অনেক স্থাপনায় প্রয়োজনীয় অনুমোদন ও নিরাপত্তা-ব্যবস্থার ঘাটতি রয়েছে। সংশ্লিষ্ট সরকারি দপ্তরগুলোর তথ্য অনুযায়ী, কক্সবাজার জেলায় ১১৫টি হোটেল ও রিসোর্টের অগ্নিনিরাপত্তা সনদ রয়েছে। পরিবেশগত ছাড়পত্র রয়েছে ৪৪টি প্রতিষ্ঠানের। বাকি সব স্থাপনা অনুমোদনহীন বা অবৈধভাবে গড়ে উঠেছে।

টুপটুপ রিসোর্টে নিহত ফারিহা কবিরের বাবা জিয়াদুল কবির বলেন, ‘সরকারের যেসব বিভাগ ও দপ্তরের পর্যটন এলাকার অনিয়ম ও ঝুঁকি দেখার কথা, তারা সেগুলো দেখছে না। তাই মানুষের প্রাণহানি হচ্ছে। অবৈধ রিসোর্ট হচ্ছে, পর্যটন এলাকায় ফিটনেসবিহীন ঝুঁকিপূর্ণ চান্দের গাড়িও চলছে।’

কক্সবাজার উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (কউক) চেয়ারম্যান জসিম উদ্দিন বলেন, অবৈধভাবে নির্মিত দেড় শতাধিক স্থাপনাকে নোটিশ দেওয়া হয়েছে। আরও স্থাপনা সরেজমিনে পরিদর্শন করে তালিকা করা হবে।

টুপটুপের ওই ঘটনার পরদিন ১৮ অক্টোবর ঢাকা থেকে বান্দরবানে ঘুরতে গিয়েছিলেন সাত বন্ধু। পাহাড়ের সৌন্দর্যে দুই দিন কাটিয়ে গত বুধবার তাঁরা পৌঁছান কক্সবাজারে। ওঠেন হিমছড়ির প্যাঁচারদ্বীপ জাদুঘরসংলগ্ন একটি রিসোর্টে। সমুদ্রের কাছে এসে আনন্দে সময় কাটাতে সৈকতে নামেন তাঁরা। কিন্তু সেই আনন্দই মুহূর্তে রূপ নেয় বিষাদে। সাগরে গোসল করতে নেমে ভেসে যান তাঁদের দুজন। একই সৈকতে চট্টগ্রাম থেকে ঘুরতে আসা আরও দুই বন্ধুরও প্রাণ যায়। সর্বশেষ গত বৃহস্পতিবার আরও একজনের মরদেহ উদ্ধার করা হয়। এই ঘটনায় মোট পাঁচজনের মৃত্যু হয়েছে। নিহত ব্যক্তিদের মধ্যে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী ও চট্টগ্রাম থেকে আসা চাকরিজীবীরা রয়েছেন।

এদিকে পূজার টানা ছুটিতে বান্দরবান ও রাঙামাটির সাজেকে বেড়াতে গিয়েছিলেন কয়েক হাজার ব্যক্তি। এর মধ্যে গত বুধবার সাজেক পর্যটন সড়কে অনির্দিষ্টকালের জন্য অবরোধের ঘোষণা দেয় সাজেক গণ-অধিকার রক্ষা কমিটি ও সাজেক কার্বারি অ্যাসোসিয়েশন নামের দুটি সংগঠন। ওই দিনই সাজেক থেকে সব পর্যটককে চলে যেতে বলে তারা। এ অবস্থায় সাজেকে আটকা পড়েন প্রায় ৩ হাজার পর্যটক। তাঁদের সরিয়ে নেওয়ার উদ্যোগের মধ্যে অবরোধকারীদের সঙ্গে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর গোলাগুলির ঘটনাও ঘটেছে। ঘুরতে গিয়ে এমন ভয়নাক অভিজ্ঞতা নিয়ে ফিরেছেন ওই সব পর্যটক।

পাহাড়ে এমন নিরাপত্তাঝুঁকির পাশাপাশি সড়ক দুর্ঘটনা ও স্থানীয় সিন্ডিকেটের কারণে পর্যটকদের ভোগান্তিতে পড়ার অভিযোগও রয়েছে। ৫ অক্টোবর বান্দরবানের থানচি উপজেলার অন্যতম পর্যটনকেন্দ্র তিন্দুতে পর্যটকবাহী একটি চাঁদের গাড়ি নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে খাদে পড়ে যায়। এতে দুজন নিহত হন, আহত হন আরও পাঁচ পর্যটক। এর আগে গত ২৭ সেপ্টেম্বর কক্সবাজারের হিমছড়ি মেরিন ড্রাইভে পর্যটকবাহী একটি চাঁদের গাড়ি নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে গাছের সঙ্গে ধাক্কা লেগে এক পর্যটক নিহত হন। গত ২৪ আগস্ট সিলেটের জাফলং যাওয়ার পথে সিলেট-তামাবিল মহাসড়কের হরিপুর এলাকায় বাস ও সিএনজিচালিত অটোরিকশার সংঘর্ষে নিহত হন আরও এক পর্যটক।

এর আগে ১ আগস্ট কক্সবাজারের দরিয়ানগর প্যারাসেইলিং পয়েন্টে প্যারাসেইলিং করার সময় সমুদ্রে পড়ে শৌভিক রায় নামে এক ব্যক্তির মৃত্যু হয়। এই ঘটনা নিয়ে তখন বেশ শোরগোল হয়। অনিরাপদ প্যারাসেইলিং নিষিদ্ধ করা হয়।

এ ছাড়া ২৬ আগস্ট ও ১৮ সেপ্টেম্বর কক্সবাজারের লাবণী পয়েন্টে ও সুগন্ধা পয়েন্টে পৃথক ঘটনায় ডুবে মারা যান তিনজন। এ ছাড়া ৭ আগস্ট সুনামগঞ্জের টাঙ্গুয়ার হাওরের ওয়াচ টাওয়ার এলাকায় গোসলে নেমে একজন এবং ১৫ আগস্ট সিলেটের কোম্পানীগঞ্জের সাদাপাথরে পানিতে ডুবে আরও একজন মারা যান।

পর্যটনকেন্দ্রগুলোতে পর্যাপ্ত নজরদারি না থাকা, ঝুঁকিপূর্ণ অবকাঠামো, প্রশাসনের নির্লিপ্ততা এবং পর্যটকদের অসচেতনতার কারণে প্রাণহানির ঘটনা ঘটছে বলে মনে করেন রোড সেফটি ফাউন্ডেশনের নির্বাহী পরিচালক সাইদুর রহমান। তিনি বলেন, পর্যটনকেন্দ্রের অনেক স্থাপনা অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। সেখানে অগ্নিনির্বাপণের ব্যবস্থা, জরুরি উদ্ধারের ব্যবস্থা ও সড়ক অবকাঠামোর ঘাটতি রয়েছে। পাশাপাশি প্রশাসনিক ব্যবস্থাপনায় অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগও রয়েছে।

সাইদুর রহমান বলেন, সাঁতার না জানা সত্ত্বেও অনেকে সাগরে গোসল করতে নামছেন। অনেক জায়গায় পর্যাপ্ত লাইফ সেভিং সরঞ্জাম ও লাইফ জ্যাকেটের ব্যবস্থা নেই। পর্যটনকেন্দ্রগুলোতে নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সরকারের নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে কার্যকর কৌশল গ্রহণ করা প্রয়োজন।

কক্সবাজারে হোটেলে হঠাৎ আগুন, আতঙ্কে বাইরে দুই শতাধিক অতিথি

চকরিয়ায় বাস-পিকআপের মুখোমুখি সংঘর্ষে নিহত ২

কক্সবাজারের সৈকত: অসচেতনতা, বৈরী আবহাওয়ায় বাড়ছে প্রাণহানি

২৬ ঘণ্টা পর সৈকতে ভেসে এল বিশ্ববিদ্যালয়ছাত্র নিবিড়ের মরদেহ, নিহত বেড়ে ৫

কক্সবাজারে সাগরে মিলল আরও একজনের মরদেহ, এখনো নিখোঁজ বিশ্ববিদ্যালয়শিক্ষার্থী নিবিড়

রামুতে বিদেশি পিস্তল-গুলিসহ কিশোর গ্যাংয়ের সদস্য গ্রেপ্তার

কক্সবাজার সৈকতে গোসলে নেমে ৩ পর্যটকের মৃত্যু, নিখোঁজ ৩

সৈকতে বিসর্জনের প্রস্তুতি, পর্যটকের ঢল

টানা ছুটিতে কক্সবাজারে পর্যটকের ঢল

কক্সবাজারে বেড়াতে গিয়ে টমটমের ধাক্কায় এক সন্তান নিহত, আহত আরেকজন