চট্টগ্রামে ১৬টি সংসদীয় আসনের মধ্যে অপরাধ, রাজনৈতিক অস্থিরতা ঘিরে বছরজুড়ে আলোচনায় ছিল চট্টগ্রাম-৬ (রাউজান) আসনটি। বিশেষ করে এই উপজেলায় বিএনপির রাজনীতিতে দুই নেতার রেষারেষির জেরে গ্রুপিং, আধিপত্য বিস্তারসহ বিভিন্ন কারণে রক্ত ঝরেছে। এই দুই নেতা এবার ভোটের মাঠেও সবার নজরে রয়েছেন। একই আসনে কেন্দ্র থেকে বিএনপির দুই হেভিওয়েট প্রার্থী বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান (পদ স্থগিত) গিয়াস উদ্দিন কাদের চৌধুরী ও দলটির প্রয়াত চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার উপদেষ্টা পরিষদের সদস্য গোলাম আকবর খন্দকারকে মনোনয়ন দিয়ে ঝুলিয়ে রাখায় তা নিয়ে আলোচনা-সমালোচনা চলছে। কেউ এখনো চূড়ান্ত না হলেও দলের প্রার্থী হিসেবে দুজনই ইতিমধ্যে মনোনয়নপত্র দাখিল করেছেন।
পর্যালোচনায় জানা গেছে, বিএনপির এই দুই হেভিওয়েট প্রার্থীর মধ্যে সম্পদের দিকে এককভাবে এগিয়ে আছেন গোলাম আকবর খন্দকার। অন্যদিকে গিয়াস উদ্দিন কাদের চৌধুরীর চেয়ে তাঁর স্ত্রী ও সন্তানদের মিলিত সম্পদের পরিমাণ বেশি। এ ছাড়া গোলাম আকবরের তুলনায় গিয়াস উদ্দিনের নামে মামলার সংখ্যা বেশি।
রিটার্নিং কর্মকর্তার কার্যালয়ে এই দুজন প্রার্থীর জমা দেওয়া হলফনামা পর্যালোচনায় জানা গেছে, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে সর্বশেষ আয়কর রিটার্নে গোলাম আকবর খন্দকার তাঁর সম্পদের পরিমাণ দেখিয়েছেন ৩৫ কোটি ৬৭ লাখ টাকার ওপরে। আয় দেখিয়েছেন ১৬ লাখ ৪৫ হাজার ৬২৪ টাকা। তাঁর স্ত্রীর নামে রয়েছে ৭ কোটি টাকার বেশি সম্পদ। দুই সন্তানের নামে রয়েছে ১০ কোটি টাকার বেশি সম্পদ। এসব স্থাবর ও অস্থাবর সম্পদের মধ্যে রয়েছে, নগদ অর্থ, ব্যাংকে জমা, ঋণপত্রের পাশাপাশি ঢাকা ও চট্টগ্রামের বাড়ি, অ্যাপার্টমেন্ট, জমি, পরিবহন, শেয়ার ব্যবসা ইত্যাদি।
একই অর্থবছরে আয়কর রিটার্নে গিয়াস উদ্দিন কাদের চৌধুরী তাঁর নামে ১৮ কোটি ২৩ লাখ টাকার ওপর সম্পদ দেখান। তিনি পেশায় নিজেকে ব্যবসায়ী দেখিয়েছেন। তবে গিয়াসের স্ত্রী ও তিন সন্তানের নামে সম্পদের পরিমাণ বেশি। তাঁর স্ত্রীর নামে ৭ কোটি ১৯ লাখ টাকা, তিন সন্তানের মধ্যে সাকের কাদের চৌধুরীর নামে রয়েছে প্রায় ৩০ কোটি টাকার বেশি সম্পদ। এ ছাড়া আরও দুই সন্তানের নামে রয়েছে ৬ কোটি টাকার সম্পদ। গিয়াস উদ্দিন কাদের চৌধুরীসহ তাঁর পরিবারের সদস্যদের সম্পদের মধ্যে রয়েছে নগদ অর্থ, ব্যাংকে জমা, ঋণপত্র। পাশাপাশি ঢাকা, চট্টগ্রাম ও রাউজানে বাড়ি, অ্যাপার্টমেন্ট, জমি, শেয়ার ব্যবসা ইত্যাদি রয়েছে।
গিয়াস উদ্দিন কাদের চৌধুরীর বিরুদ্ধে বিভিন্ন সময় দায়ের হওয়া ১৭টি মামলার সব কটিতে তিনি খালাস পেয়েছেন। যেগুলো বেশির ভাগ ছিল রাজনৈতিক মামলা। বর্তমানে তাঁর বিরুদ্ধে চারটি ফৌজদারি মামলা চট্টগ্রাম আদালতে বিচারাধীন রয়েছে, সব মামলায় তিনি স্থায়ী জামিনে আছেন। একটি মামলা উচ্চ আদালত কর্তৃক স্থগিত করা হয়েছে।
অন্যদিকে গোলাম আকবর খন্দকারের নামে বিভিন্ন সময় হত্যাচেষ্টা, বিস্ফোরক ও বিশেষ আইনে সাতটি মামলা দায়ের হয়েছিল। চলতি বছর শুরুতে একে একে ৬টি মামলা থেকে খালাস পেয়েছেন। একটি মামলা ফাইনাল রিপোর্ট আদালত কর্তৃক গৃহীত হয়।
জানা গেছে, চট্টগ্রাম-৬ (রাউজান) আসনে শুরুতে বিএনপির প্রভাবশালী নেতা গিয়াস উদ্দিন কাদের চৌধুরীকে মনোনয়ন দেওয়া হয়েছিল কেন্দ্র থেকে। কিন্তু মনোনয়নপত্র জমার কয়েক দিন আগে একই আসনে গোলাম আকবর খন্দকারকে মনোনয়ন দেওয়া হয়। আগের প্রার্থী বাতিলের বিষয় স্পষ্ট করা হয়নি কেন্দ্র থেকে। এতে গত সোমবার (২৯ ডিসেম্বর) চট্টগ্রাম-৬ আসনে বিএনপির প্রার্থী হিসেবে দুজনই মনোনয়নপত্র দাখিল করেছেন। গিয়াস উদ্দিন কাদের চৌধুরীর পক্ষে তাঁর সন্তান সাকের কাদের চৌধুরী রাউজান উপজেলার সহকারী রিটার্নিং কর্মকর্তার কাছে মনোনয়নপত্র জমা দিয়েছেন। অন্যদিকে গোলাম আকবর খন্দকার চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসক কার্যালয়ে উপস্থিত হয়ে রিটার্নিং কর্মকর্তার হাতে মনোনয়নপত্র দাখিল করেন।
গত বছর অভ্যুত্থানের আগে রাউজান উপজেলার তৎকালীন আওয়ামী লীগের সাবেক এমপি এ বি এম ফজলে করিম চৌধুরীর একক নিয়ন্ত্রণে ছিল। তাঁর ভয়ে সবাই তটস্থ থাকত বলে অভিযোগ রয়েছে। সন্ত্রাসের জনপদ হিসেবে পরিচিত উপজেলাটিতে অভ্যুত্থানের পর পুরোনো ধারা যেন আবার ফিরে আসে। বিশেষ করে উপজেলাটিতে বিএনপির কেন্দ্রীয় দুই নেতা গিয়াস উদ্দিন কাদের চৌধুরী ও গোলাম আকবর খন্দকারের মধ্যে বিরোধ সেখানে রাজনৈতিক অস্থিরতা জিইয়ে রাখছে বলে অভিযোগ রয়েছে। রাউজানে অনেকগুলো আলোচিত হত্যাকাণ্ড এই দুই নেতা ও তাঁদের অনুসারীদের মধ্যে বিরোধের জেরে হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে। আসন্ন সংসদ নির্বাচনে ভোটের মাঠেও এখন বিএনপির এই দুই নেতা মুখোমুখি অবস্থায় আছেন।
একই আসনে জামায়াতে ইসলামীর মো. শাহজাহান মঞ্জু, গণসংহতি আন্দোলনের নাছির উদ্দীন তালুকদার, বাংলাদেশ ইসলামী ফ্রন্টের মোহাম্মদ ইলিয়াছ নূরী মনোনয়নপত্র দাখিল করেছেন।