দূষণ বাড়ছে, নষ্ট হচ্ছে নদীর পরিবেশ। আর এতে মারা পড়ছে মাছ ও ডলফিন। এই চিত্র চট্টগ্রামের হালদার। হালদা নদীতে গত সাড়ে ছয় বছরে অন্তত ৫১টি ডলফিনের মৃত্যু হয়েছে। সাড়ে পাঁচ বছরে ২৫-৩০টি বড় কার্পজাতীয় মৃত মা মাছ উদ্ধারের রেকর্ড রয়েছে।
অন্যদিকে শিল্পকারখানার অপরিশোধিত বর্জ্য, নগরের পয়োবর্জ্য, প্লাস্টিক ও মাইক্রোপ্লাস্টিক দূষণ, অবৈধ দখলে স্বাভাবিক প্রবাহ, নাব্যতা ও জীববৈচিত্র্য হারাচ্ছে কর্ণফুলী।
হালদার দূষণের নথি আছে সরকারি দপ্তরেই। চট্টগ্রাম পরিবেশ অধিদপ্তর, বিজিসি ট্রাস্ট বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য ও হালদা রিসার্চ ল্যাবরেটরি থেকে প্রাপ্ত তথ্যমতে, হালদা নদীদূষণের সুনির্দিষ্ট কারণগুলোর মধ্যে নদীর তীরবর্তী বিভিন্ন শিল্পকারখানা এবং অপরিকল্পিত পোলট্রি ও ডেইরি ফার্মের বর্জ্য নদীতে ফেলার ফলে পানিতে অ্যামোনিয়ার মাত্রা বেড়ে যায় এবং মাছসহ জলজ প্রাণীর মৃত্যু হয়। এ ছাড়া চট্টগ্রাম শহর ও আশপাশের উপজেলার ড্রেনেজ ও সুয়ারেজের ময়লা পানি বিভিন্ন সংযোগ খালের (কাটাখালী, কৃষ্ণখালী, খন্দকিয়া ও মাদারি খাল) মাধ্যমে হালদায় প্রবেশ করে। এতে বাড়ছে দূষণ।
অন্যদিকে নদীর উজানে মানিকছড়ি এলাকায় তামাক চাষ করা হয়। তামাক প্রক্রিয়াজাতকরণ ও চাষের জমিতে ব্যবহৃত বিষাক্ত রাসায়নিক বৃষ্টি বা ঢলের পানিতে মিশে নদীর পরিবেশ নষ্ট করে। তবে তামাক চাষ চলতি বছর বন্ধ করে দেওয়ায় এবার হালদার দূষণ খানিকটা কমেছে বলে বিশেষজ্ঞরা জানিয়েছেন।
এ ছাড়া হালদার পরিবেশ নষ্ট হচ্ছে বালু উত্তোলনের কারণে। উজানে (ভুজপুর এলাকায়) রাবার ড্যাম নির্মাণের ফলে শুষ্ক মৌসুমে নদীর স্বাভাবিক পানিপ্রবাহ মারাত্মকভাবে বিঘ্নিত হচ্ছে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। তাঁদের মতে, এর ফলে নদীর কিছু অংশ পানিশূন্য হয়ে পড়ে এবং লবণাক্ততা বৃদ্ধি পায়। নদীর বুকে বালুবাহী ও বেপরোয়া গতির ইঞ্জিনচালিত নৌকার চলাচল মা-মাছ ও বিপন্ন প্রজাতির ডলফিনের জন্য মারাত্মক হুমকি সৃষ্টি করে।
এ নিয়ে কথা হয় চট্টগ্রাম পরিবেশ অধিদপ্তর, বিজিসি ট্রাস্ট বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য ও হালদা রিসার্চ ল্যাবরেটরি সমন্বয়ক ড. মনজুরুল কিবরিয়ার সঙ্গে। তিনি বলেন, যেসব দূষণ এখন হচ্ছে এগুলো রোধ করতে না পারলে হালদা বিপন্ন হবে।
সম্প্রতি এক গবেষণায় দেখা গেছে, হালদার সব প্রজাতির মাছের মধ্যেই মাইক্রোপ্লাস্টিক পাওয়া গেছে। ড. মনজুরুল কিবরিয়া বলেন, মাছের মধ্যে মাইক্রোপ্লাস্টিকের দূষণ পরিবেশগত ঝুঁকি তৈরি করে এবং এর পাশাপাশি এই নদীর মাছ খাওয়া মানুষের স্বাস্থ্যের জন্যও ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।
এদিকে চট্টগ্রামের আরেক গুরুত্বপূর্ণ নদী কর্ণফুলীও বহুমাত্রিক সংকটের মুখে। শিল্পকারখানার অপরিশোধিত বর্জ্য, নগরের পয়োবর্জ্য, প্লাস্টিক ও মাইক্রোপ্লাস্টিক দূষণ, অবৈধ দখল এবং পলি জমে ভরাট হওয়ার কারণে নদীটি ধীরে ধীরে তার স্বাভাবিক প্রবাহ, নাব্যতা ও জীববৈচিত্র্য হারাচ্ছে। পরিবেশবিদেরা বলছেন, কর্ণফুলীর এই সংকট শুধু একটি নদীর সংকট নয়; এটি চট্টগ্রাম বন্দর, উপকূলীয় পরিবেশ, জনস্বাস্থ্য এবং দেশের অর্থনীতির জন্যও বড় হুমকিতে পরিণত হয়েছে।
চলতি বছর প্রকাশিত গবেষণায় দেখা গেছে, কালুরঘাট থেকে পতেঙ্গা পর্যন্ত নদীপথে শিল্পকারখানার অপরিশোধিত বর্জ্যের কারণে পানির গুণগত মান মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। নদীর তলদেশের পলিতে আন্তর্জাতিক নিরাপদ সীমার চেয়ে কয়েক গুণ বেশি ক্রোমিয়াম, ক্যাডমিয়াম, সিসা ও তামার উপস্থিতি পাওয়া গেছে। জাতীয় নদী রক্ষা কমিশনের সমীক্ষা অনুযায়ী, কর্ণফুলীর ৭৯টি স্থানের মধ্যে ৭৭টিতেই ভয়াবহ দূষণ রয়েছে। নগরের অন্তত ১৯টি খাল দিয়ে গৃহস্থালি বর্জ্য, ডায়িং কারখানার বর্জ্য এবং শিল্পকারখানার রাসায়নিক পদার্থ সরাসরি নদীতে পড়ছে।
নদী রক্ষা কমিশনের তথ্য অনুযায়ী, চট্টগ্রাম নগরী থেকে প্রতিদিন সাড়ে ৩ কোটি লিটার সুয়ারেজ বর্জ্য এবং প্রায় আড়াই শ টন পলিথিন ও প্লাস্টিক বর্জ্য বিভিন্ন উপায়ে কর্ণফুলীতে গিয়ে মিশছে। অন্যদিকে পূর্ববর্তী এক সমীক্ষায় দৈনিক ২২ হাজার টন কঠিন ও তরল বর্জ্য নদীতে ফেলার তথ্য উঠে এসেছে।
রাঙ্গুনিয়ার চন্দ্রঘোনা থেকে পতেঙ্গা পর্যন্ত প্রায় ১০০ কিলোমিটার এলাকায় অন্তত ৩০০ শিল্পপ্রতিষ্ঠান রয়েছে। এর মধ্যে তেল শোধনাগার, বিদ্যুৎকেন্দ্র, পেপার মিল, সিমেন্ট কারখানা, জাহাজ নির্মাণ ও মেরামত শিল্পসহ বহু ভারী শিল্পের বর্জ্য সরাসরি বা পরোক্ষভাবে নদীতে পড়ছে।
সাম্প্রতিক বছরগুলোতে কর্ণফুলীর জন্য নতুন উদ্বেগ হয়ে উঠেছে মাইক্রোপ্লাস্টিক দূষণ। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকদের পরিচালিত গবেষণায় নদীর পানি ও পলিতে উদ্বেগজনক মাত্রায় মাইক্রোপ্লাস্টিক পাওয়া গেছে। গবেষণায় দেখা যায়, প্রতি ঘনমিটার পানিতে ১৪ থেকে ২৭টি এবং প্রতি কেজি পলিতে ৭৬ থেকে ২৭২টি পর্যন্ত মাইক্রোপ্লাস্টিক কণা রয়েছে। এর বেশির ভাগই ফাইবারজাতীয়, যা পোশাকশিল্পের বর্জ্য, পরিত্যক্ত জাল ও প্লাস্টিকসামগ্রী থেকে উৎপন্ন হচ্ছে।
এই বিষয়ে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণরসায়ন বিভাগের অধ্যাপক ড. মনিরুল হক বলেন, ‘মাইক্রোপ্লাস্টিক এখন শুধু পরিবেশগত সমস্যা নয়, এটি জনস্বাস্থ্যের জন্যও বড় হুমকি। কর্ণফুলী ও উপকূলীয় জলজ প্রাণীর শরীরে পাওয়া মাইক্রোপ্লাস্টিক খাদ্যচক্রের মাধ্যমে মানুষের শরীরেও প্রবেশ করছে। দীর্ঘ মেয়াদে এটি বিভিন্ন জটিল রোগের ঝুঁকি বাড়াতে পারে।’
সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) এক গবেষণায় বলা হয়েছে, দেশের উপকূলীয় নদীগুলোর মধ্যে সবচেয়ে বেশি প্লাস্টিক বর্জ্য জমা হচ্ছে কর্ণফুলীতে, যার হার ৩৯ শতাংশ। এই বর্জ্য শুধু নদী ভরাটই করছে না, বরং মাছ, জলজ উদ্ভিদ ও পরিবেশের জন্যও মারাত্মক ক্ষতির কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
পরিবেশ অধিদপ্তরের জরিপ অনুযায়ী, একসময় কর্ণফুলীতে প্রায় ১৪০ প্রজাতির মাছ পাওয়া যেত। দূষণ ও আবাসস্থল ধ্বংসের কারণে অন্তত ৩৫টি প্রজাতি বিলুপ্ত হয়ে গেছে। আরও প্রজাতি এখন বিপন্ন।
এই বিষয়ে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূগোল ও পরিবেশবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক ড. ইকবাল সরওয়ার বলেন, ‘বায়ু, শব্দ ও পানিদূষণকে আলাদা করে দেখার সুযোগ নেই। এগুলো এখন একটি সমন্বিত পরিবেশগত সংকটে পরিণত হয়েছে। কর্ণফুলীকে বাঁচাতে হলে কঠোর আইন প্রয়োগ, শিল্পকারখানার বর্জ্য নিয়ন্ত্রণ এবং কার্যকর নগর ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করতে হবে।’