রাত ১০টার দিকেও সহকর্মীদের সঙ্গে নিজ কর্মস্থলের সামনে হাসিখুশিতে ছিলেন। বিভিন্ন বিষয় নিয়ে মজাও করেছেন নিজেরা নিজেরাই। শহরে পারিবারিক অনুষ্ঠান আছে বলে বিদায় নিয়েছিলেন সহকর্মীদের কাছ থেকে। তবে আড়াই ঘণ্টার ব্যবধানে এই বিদায় যে চিরবিদায়ে রূপ নেবে তা কি সহকর্মীদের কেউ জানতেন?
বলছিলাম চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের (চবি) প্রাণিবিদ্যা বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক আফতাব হোসেনের কথা। শুক্রবার দিবাগত রাত আনুমানিক সাড়ে ১২টার দিকে শখের স্কুটি চালিয়ে ক্যাম্পাসে ফেরার পথে বিশ্ববিদ্যালয়ের এক নম্বর গেইটের পাশে সড়ক দুর্ঘটনায় তিনি নিহত হন। পরে শনিবার জোহরের নামাজের পর বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় জামে মসজিদ প্রাঙ্গণে জানাজায় নামাজ শেষে তাঁকে দাফন করা হয়।
প্রত্যক্ষদর্শী ও পুলিশ সূত্রে জানা যায়, রাত দশটার দিকে নগরীর বায়েজিদ থানার বালুচরা এলাকায় দাওয়াতে গিয়েছিলেন আফতাব হোসেন। দাওয়াত থেকে ফেরার পথে হাটহাজারী যান স্কুটির তেল কিনতে। পরে তিনি তেল নিয়ে পৌনে ১২টার দিকে স্কুটি চালিয়ে ক্যাম্পাসের দিকে যাচ্ছিলেন। এ সময় বিশ্ববিদ্যালয়ের এক নম্বর গেইটের সামনে ইউটার্ন নেওয়ার সময় শহরের দিক থেকে আসা বেপরোয়া গতির একটা প্রাইভেটকার তাঁকে সজোরে ধাক্কা দেয়। এতে ঘটনাস্থল থেকে ৬-৭ হাত দূরে ছিটকে পড়েন আফতাব হোসেন। স্কুটি ছিটকে পড়ে ২০ হাত দূরে। পরবর্তীতে গুরুতর আহতাবস্থায় স্থানীয়রা উদ্ধার করে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে গেলে কর্তব্যরত চিকিৎসক মৃত ঘোষণা করে। এই ঘটনায় প্রাইভেটকারচালক মাসুদ পারভেজকে আটক করেছে পুলিশ।
চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল পুলিশ ফাঁড়ির দায়িত্বরত পাঁচলাইশ থানার ওসি (তদন্ত) সাদেকুর রহমান আজকের পত্রিকাকে বলেন, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক আফতাব হোসেনকে গুরুতর আহতাবস্থায় চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে আনা হয়। পরবর্তীতে কর্তব্যরত চিকিৎসক তাঁকে মৃত ঘোষণা করেন।
আফতাব হোসেনের মৃত্যুর কয়েক ঘণ্টা আগের স্মৃতির বর্ণনা দিয়ে ফলিত রসায়ন ও কেমিকৌশল বিভাগের অধ্যাপক ড. সুমন বড়ুয়া আজকের পত্রিকাকে বলেন, ‘রাত দশটার দিকেও বিভাগের সামনে দেখা হয়েছিল। আমরা বিভিন্ন বিষয় নিয়ে মজা করতাম। উনাকে শেভ করা দেখে তখনো মজা করলাম। স্বভাবসুলভ হাসি দিয়ে জানালেন শহরে একটা পারিবারিক অনুষ্ঠান আছে, সেখানে যাবেন। এরপর আমাদের থেকে বিদায় নিলেন। এই বিদায় যে শেষ বিদায় তা কি আমরা জানতাম? এটা কোনোভাবেই মেনে নেওয়ার মতো না।’
প্রাণিবিদ্যা বিভাগের সভাপতি ড. মনজুরুল কিবরিয়া বলেন, ‘আফতাব হোসেন শখের বশে স্কুটিটি কিনেছিলেন। এটি চালিয়ে বাসা থেকে ক্লাসে যেতেন। মাঝেমধ্যে ক্যাম্পাসের বিভিন্ন জায়গায় যেতেন। তবে শহরে তেমন একটা যেতেন না।’
আফতাব হোসেন পারিবারিক জীবনে এক সন্তানের জনক। তাঁর স্ত্রী একই বিভাগের শিক্ষক।
এদিকে আফতাব হোসেনের মৃত্যু যেন কোনোভাবেই মেনে নিতে পারছেন না তাঁর সহকর্মী ও শিক্ষার্থীরা। নিরাপদ সড়ক, এক নম্বর গেইট এলাকায় গতি নিরোধক ও পদচারী-সেতু নির্মাণের দাবিতে সড়ক অবরোধ করে মধ্যরাতেই বিক্ষোভ করেন তাঁরা। দাবির মুখে বিশ্ববিদ্যালয়ের এক নম্বর গেইটে জেব্রা ক্রসিং ও গতিরোধক বসানো হয়েছে। আগামী দেড় মাসের মধ্যে পদচারী-সেতু নির্মাণের কাজ শুরু হবে।
চট্টগ্রাম জেলা সড়ক বিভাগের উপবিভাগীয় প্রকৌশলী সৌম্য তালুকদার আজকের পত্রিকাকে বলেন, ‘বিশ্ববিদ্যালয়ের এক নম্বর গেইটে জেব্রা ক্রসিং ও গতিরোধক বসানো হয়েছে। পদচারী-সেতুর নকশা করা হয়েছে। তা অনুমোদনের জন্য ঢাকায় পাঠানো হয়েছে। নকশা অনুমোদন হলে আগামী দেড় মাসের মধ্যে টেন্ডার আহ্বান করা হবে।’
উল্লেখ্য, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ১ নম্বর গেট এলাকায় দুর্ঘটনায় মৃত্যুর ঘটনা এবারই প্রথম নয়। গত তিন বছরে এই এলাকায় চারটি পৃথক দুর্ঘটনায় পাঁচজন নিহত হয়েছেন। গত বছর ২০ অক্টোবর বাসের ধাক্কায় দুই শ্রমিক নিহত হন। এরপর থেকেই বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ও শিক্ষার্থীরা ১ নম্বর গেট এলাকায় জেব্রাক্রসিং, ফুটওভার ব্রিজ নির্মাণের দাবি জানিয়ে আসছেন।