চট্টগ্রাম-কক্সবাজার রেললাইনে দফায় দফায় টাকা ঢালার পরও এই রুটে ট্রেনের গতি আটকে দোহাজারী অংশে। দোজাহারী থেকে কক্সবাজার পর্যন্ত ট্রেনের গতি ঘণ্টায় ৮০ কিলোমিটার। অথচ চট্টগ্রাম থেকে দোহাজারী অংশে গতি মাত্র ১০ থেকে ৩০ কিলোমিটার। এর মধ্যেই আবার পাহাড়তলী-চট্টগ্রাম-দোহাজারী ৬২ কিলোমিটার রেললাইন সংস্কারে নেওয়া হয়েছে প্রায় ১১ হাজার কোটি টাকার প্রকল্প।
তা ছাড়া চট্টগ্রাম-দোহাজারী-কক্সবাজার রুটে ৩১ জোড়া ট্রেন চালুর কথা থাকলে এই রেললাইন চালুর তিন বছরে মাত্র ৪ জোড়া ট্রেন চালু করতে পেরেছে রেলওয়ে কর্তৃপক্ষ।
প্রকল্প সূত্রে জানা যায়, ১১ হাজার কোটি টাকা ব্যয়ে দোহাজারী-ঘুনধুম-কক্সবাজার ১০২ কিলোমিটার রেললাইন নির্মাণ করা হয়। ২০২৩ সালে উদ্বোধনের আগেই বন্যায় ধসে যায় এই রেললাইনের কিছু অংশ। এরপর কয়েক ধাপে সংস্কারে বিপুল টাকা ব্যয় করা হয়।
রেলওয়ে সূত্রে জানা যায়, ২০১৯ সালে ষোলশহর-দোহাজারী অংশ ও ষোলশহর-ফতেয়াবাদ-নাজিরহাট অংশের জন্য ব্যয় হয় ১৯৭ কোটি ৪৯ লাখ ৮১ হাজার টাকা। ২০২৩ সালে ঢাকা-চট্টগ্রাম-কক্সবাজার রেল চালুর আগমুহূর্তে জরুরি ভিত্তিতে কালুরঘাট সেতু মেরামত বাবদ খরচ করা হয় ৬৫ কোটি টাকা। ঠিক একই সময়ে ২০২৩ সালে আবার জরুরিভাবে ২৫ কোটি টাকা রাজস্ব তহবিল থেকে দিয়ে মেরামত করা হয় চট্টগ্রাম-দোহাজারী রেল সড়ক।
এদিকে গত মাসে কয়েক দিনের টানা বর্ষণ ও পাহাড়ি ঢলে চট্টগ্রাম-কক্সবাজার রেলপথ আবার পানিতে তলিয়ে যায়। এর মধ্যে আবার জরুরি ভিত্তিতে মেরামত করা হয় চট্টগ্রাম–দোহাজারী রেললাইন।
রেলওয়ে পূর্বাঞ্চল সূত্র জানায়, টানা বৃষ্টিতে ষোলশহর-দোহাজারী সেকশনের শমসেরপাড়া এলাকায় প্রায় ৫০০ মিটার রেললাইন পানির নিচে চলে যায়। সাধারণ অবস্থায় রেললাইনের ওপর চার থেকে পাঁচ ইঞ্চি পানি থাকলেও ট্রেন চলাচল সম্ভব। কিন্তু সেখানে পানির উচ্চতা বেড়ে প্রায় ২৪ ইঞ্চিতে পৌঁছায়। এ কারণে গত ১২ জুলাই প্রকৌশল বিভাগ অতিরিক্ত পাথর ফেলে রেললাইন প্রায় ১০ ইঞ্চি উঁচু করে। ওই দিন সীমিত গতিতে বা ‘অ্যাডভান্স পাইলটিং’-এর মাধ্যমে ট্রেন চালানো হলেও পরে স্বাভাবিকভাবে চলাচল শুরু হয়।
এবার পাহাড়তলী-চট্টগ্রাম-দোহাজারী অংশ আবার সংস্কারে নেওয়া হয়েছে ১০ হাজার ৭৯৭ কোটি টাকার প্রকল্প।
এই প্রকল্পের পরিচালক মো. আসাদুল হক জানান, আগামী মাসেই এই প্রকল্পের ঠিকাদার নিয়োগ দেওয়া হতে পারে। ২০২৮ সালের জুন মাসে এর কাজ শেষ হবে।
চট্টগ্রাম থেকে কক্সবাজার ট্রেনে নিয়মিত যাতায়াতকারী ব্যবসায়ী মো. ইসমাইল খান বলেন, ‘কক্সবাজার রুটে ট্রেন চালু হওয়ায় আমরা অনেক খুশি হয়েছিলাম। কিন্তু কিছুদিন পর সেটা যেন আশায় গুড়ে বালি। এই রুটে ট্রেনের টিকিট পাওয়া যায় না, ট্রেনের যাত্রীসেবার মানও খারাপ। আবার চলে ধীরগতিতে, সময়ত গন্তব্যে পৌঁছানো যায় না।’
রেলওয়ে সূত্র জানায়, ২০১৮ সাল পর্যন্ত ষোলশহর-দোহাজারী ৪০ কিলোমিটার রেলপথে ট্রেনের গতিবেগ ছিল ঘণ্টায় কমবেশি ২০ কিলোমিটার। ১৯৭ কোটি টাকার একটি প্রকল্পের অধীনে ষোলশহর-দোহাজারী ও ষোলশহর-নাজিরহাট সেকশন সংস্কার করা হয়েছিল। প্রকল্পের দুই-তৃতীয়াংশই ব্যয় হয়েছে ষোলশহর-দোহাজারী সেকশনে। তবে নিম্নমানের কাজের কারণে ট্রেনের গতিবেগ আশানুরূপ বাড়েনি।
এ কারণে ২০২০ সালের জানুয়ারিতে রেলের ওয়ার্কিং টাইমটেবিলে (ডব্লিউটিটি) সেকশনটিতে ট্রেনের গতিবেগ নির্ধারণ করা হয় মাত্র ৩০ কিলোমিটার। পরে আবার সংস্কার করে গতিবেগ দ্বিগুণ করা হলেও এখন ট্রেন চলছে ১০ থেকে ৩০ কিলোমিটার গতিতে।
প্রকল্প সূত্রে জানা গেছে, দোহাজারী-কক্সবাজার রেলপথ নির্মাণের পর ঢাকা-কক্সবাজার দ্রুতগতির ট্রেনের সঙ্গে সমন্বয় করতে ২০২৩ সালের শেষার্ধে ষোলশহর-দোহাজারী রেলপথটি আবার সংস্কার করে পূর্বাঞ্চল রেলের প্রকৌশল বিভাগ। প্রায় ২৫ কোটি টাকার বেশি ব্যয়ে এই সংস্কারকাজের পর রেলপথটির অনুমোদিত গতিবেগ বাড়িয়ে ঘণ্টায় ৬০ কিলোমিটার করা হয়। দ্বিতীয় দফা সংস্কারকাজও মানসম্মত না হওয়ায় শুরু থেকে সেকশনটির গতিবেগ কমিয়ে ঘণ্টায় ৪০ কিলোমিটারে নামিয়ে এনেছে রেলওয়ে, যা ঢাকা-চট্টগ্রাম ও দোহাজারী-কক্সবাজার রেলপথে ট্রেনের গতিবেগের সঙ্গে বড় ব্যবধান তৈরি করেছে।
রেলের অপারেশন-সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, ২০২৩ সালের অক্টোবরে কক্সবাজারে ট্রেন সার্ভিস চালুর আগে চট্টগ্রাম-দোহাজারী রেলপথটি দ্রুত সংস্কার করা হয়। তা ছাড়া কর্ণফুলী নদীতে নতুন সেতু নির্মাণে দেরি হওয়ায় ৬৫ কোটি টাকা ব্যয়ে কালুরঘাট সেতুটি মেরামত করা হয়।
রেলওয়ে পূর্বাঞ্চলের কক্সবাজার রুটের এক লোকোমাস্টার নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, ‘চট্টগ্রাম-ষোলশহর ও ষোলশহর-দোহাজারী রেলপথটি সংস্কার করে জিআইবিআর (গভর্নমেন্ট ইন্সপেক্টর অব রেলওয়ে)। অনুমোদন নিয়ে ৬০ কিলোমিটার গতিবেগ নির্ধারণ করা হলেও শুরু থেকে ৪০ কিলোমিটারের কম গতিতে ট্রেন চালাতে হচ্ছিল।
ওই লোকোমাস্টার জানান, দোহাজারী থেকে কক্সবাজার পর্যন্ত তিনটি জায়গায় ২০ কিলোমিটার গতিতে ট্রেন চালাতে হয়। এগুলো হলো-লোহাগড়ার চুনতি (হাতি পারাপারে সংরক্ষিত জোন) হারবাং, চকরিয়া থেকে ডুলাহাজারা এবং ঈদগাঁও ইসলামাবাদ এলাকা।
জানতে চাইলে রেলওয়ের পূর্বাঞ্চলের জেনারেল ম্যানেজার (জিএম) সুবক্তগীন আজকের পত্রিকার কাছে চট্টগ্রাম-কক্সবাজার রেল সড়কে ধীরগতিতে ট্রেন চলার কথা স্বীকার করেন। তিনি বলেন, চট্টগ্রাম থেকে দোহাজারী পর্যন্ত ১০ থেকে ৩০ কিলোমিটার এবং দোজাহারী থেকে কক্সবাজার পর্যন্ত ৮০ কিলোমিটার গতিতে রেল চলে।
এর কারণ জানতে চাইলে এই কর্মকর্তা বলেন, চট্টগ্রাম থেকে দোহাজারী পর্যন্ত ৪৭ কিলোমিটার লাইন অনেক পুরোনো। তবে এই অংশে মেরামতের জন্য ঠিকাদার নিয়োগ প্রক্রিয়া চলছে।
সুবক্তগীন জানান, চট্টগ্রাম-কক্সবাজার বর্তমানে মিটারগেজ হিসেবে চালু আছে, সেখানে ব্রডগেজ করা থাকলেও চালু হয়নি। এই ব্রডগেজ লাইন চালু হলে এবং চট্টগ্রাম থেকে দোহাজারী পর্যন্ত রেল সড়ক যদি মেরামত করা হয়, তাহলে রেলের গতি অনেক বেড়ে যাবে। এতে বর্তমান সময় থেকে ট্রেন কমপক্ষে এক ঘণ্টা আগে নির্ধারিত গন্তব্যে পৌঁছাবে।