চাঁদপুরের হাইমচর উপজেলার আলগী দুর্গাপুর উত্তর ইউনিয়ন পরিষদের (ইউপি) চেয়ারম্যান মো. আতিকুর রহমান ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর থেকে আত্মগোপনে আছেন। তাঁর বিরুদ্ধে জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে হামলার ঘটনায় একাধিক মামলা রয়েছে। সেসব মামলায় তিনি ওয়ারেন্টভুক্ত আসামি। এরপরও আত্মগোপনে থেকে তিনি ইউনিয়ন পরিষদের কার্যক্রম পরিচালনা করছেন। গোপনে স্বাক্ষর করছেন পরিষদের দাপ্তরিক কাগজে। এই কাজে তাঁর সঙ্গে জড়িত ইউনিয়ন পরিষদের প্রশাসনিক কর্মকর্তা মো. আজহারুল ইসলামসহ একটি চক্র। ওয়ারেন্টভুক্ত আসামি হলেও পুলিশ তাঁকে গ্রেপ্তার করতে গিয়ে বারবার ব্যর্থ হচ্ছে।
সরেজমিনে স্থানীয় বাসিন্দাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, আতিকুর রহমান হাইমচর উপজেলা যুবলীগের সাবেক সভাপতি। ছাত্র-জনতার আন্দোলনে শিক্ষার্থীদের বিরুদ্ধে ভূমিকা রাখায় তাঁর বিরুদ্ধে হাইমচর ও চাঁদপুরে একাধিক মামলা হয়েছে। যে কারণে স্থানীয় লোকজন তাঁর বিরুদ্ধে ক্ষুব্ধ।
সম্প্রতি ইউনিয়ন পরিষদে গিয়ে দেখা গেছে, হিসাব সহকারী কাম কম্পিউটার অপারেটর প্রশাসনিক কর্মকর্তার স্বাক্ষর করেছেন সেবা নিতে আসা নাগরিকদের জন্মসনদে। প্রশাসনিক কর্মকর্তা আজহারুল ইসলাম ছুটি না নিয়েই অফিসে অনুপস্থিত। আর চেয়ারম্যানের স্বাক্ষর রাতের আঁধারে নিয়ে আসেন গ্রাম পুলিশের সদস্যরা। এতে বিড়ম্বনার শিকার হচ্ছেন ইউনিয়নের বাসিন্দারা।
স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, আতিকুর রহমান আত্মগোপনে থেকে পরিষদের টাকাপয়সা ভাগাভাগি করে নিচ্ছেন। রাজনৈতিক কিছু নেতাকে টাকার ভাগ দেওয়ায় তিনি মামলার আসামি হয়েও ধরাছোঁয়ার বাইরে।
এই ইউনিয়নের কমলাপুর গ্রামের বাসিন্দা জাহাঙ্গীর বলেন, ‘আমি নিজে কয়েকবার পরিষদে এসেছি। চেয়ারম্যান আত্মগোপনে। তাঁকে পুলিশ খুঁজছে। ৫ আগস্টের পর থেকে পরিষদে আসেন না এই চেয়ারম্যান।’
সম্প্রতি ঢাকা থেকে জন্মসনদ অনলাইন করার জন্য এসেছেন কামরুন নাহার নামে ইউনিয়নের এক বাসিন্দা। তিনি এসে চেয়ারম্যান ও প্রশাসনিক কর্মকর্তা কাউকে পাননি। বিউটি আক্তার নামের আরেক নারী এসেছেন তাঁর শিশুসন্তানের জন্মসনদ নেওয়ার জন্য। তিনিও একই ধরনের বিড়ম্বনায় পড়েছেন।
ফোনে যোগাযোগ করা হয় ইউনিয়ন পরিষদের প্রশাসনিক কর্মকর্তা মো. আজহারুল ইসলামের সঙ্গে। তিনি বলেন, চেয়ারম্যান মাঝেমধ্যে অফিসে আসেন। কোন সময় এবং সর্বশেষ কবে এসেছেন, এমন তথ্য জানতে চাইলে এলোমেলো কথা বলেন আজহারুল ইসলাম। কোথায় আছেন জানতে চাইলে তিনি ছুটি নিয়ে অফিসের বাইরে আছেন বলেও জানান আজহারুল। তবে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) জানালেন, তিনি ছুটি নেননি এবং তাৎক্ষণিক ফোন করে ইউএনও নিজেও আজহারুল ইসলামকে পাননি।
ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মো. আতিকুর রহমানের ব্যক্তিগত মোবাইল ফোনে একাধিকবার কল দেওয়া হয় বক্তব্য নেওয়ার জন্য। তিনি ফোন না ধরায় তাঁর বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
হাইমচর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) নাজমুল হোসেন বলেন, ‘আমি এক মাস আগে এই থানায় যোগদান করেছি। এ পর্যন্ত দুবার তাঁকে গ্রেপ্তার করার জন্য বাড়িতে গিয়েছি, কিন্তু পাইনি। তিনি বাড়িতে থাকেন না।’
থানা-পুলিশের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, এই চেয়ারম্যানকে গ্রেপ্তার করার জন্য এর আগের ওসি বহুবার চেষ্টা করেছেন। তিনি পরিষদে আসেন এমন তথ্য সঠিক না। কারণ, সিসিটিভি ক্যামেরা চেক করলে বিষয়টি স্পষ্ট হবে। তাঁকে গ্রেপ্তার করার জন্য বিভিন্ন কায়দায় চেষ্টা করা হয়। তাঁর সঙ্গে একটি সংঘবদ্ধ চক্র আছে। যারা পুলিশের অভিযানের বিষয় আগেই টের পায় এবং খবর পেয়ে ঘটনাস্থল থেকে পালিয়ে যায়।
চেয়ারম্যান আতিকুর রহমান আত্মগোপনে থেকে কীভাবে দাপ্তরিক কাজ করেন, এ বিষয়ে জানার জন্য সরাসরি উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) অমিত রায়ের সঙ্গে কথা হয়। তিনি বলেন, ‘আমি এসেছি প্রায় ছয় মাস হলো। এই চেয়ারম্যান আত্মগোপনে, আমি বিষয়টি অবগত না। তবে এখন যেহেতু জেনেছি, অবশ্যই যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।’