বাগেরহাটের ফকিরহাটে সুপেয় পানির তীব্র সংকট দেখা দিয়েছে। তিন বছর আগে জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের জরিপে উপজেলায় প্রায় ৫০ ভাগ গভীর-অগভীর নলকূপের পানিতে সহনীয় মাত্রার ১০ গুণ বেশি পর্যন্ত আর্সেনিকের উপস্থিতি পাওয়া যায়। কিন্তু এরপর সরকারি উদ্যোগে নিরাপদ পানির কোনো ব্যবস্থা করা হয়নি।
এর মধ্যে দুই বছর ধরে জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের গভীর নলকূপ স্থাপনও বন্ধ রয়েছে। এ ছাড়া আধুনিক পানি পরিশোধন ব্যবস্থা বা রিভার্স অসমোসিস (আরও) প্ল্যান্টও রয়েছে হাতে গোনা কয়েকটি।
ফলে অসহনীয় মাত্রায় আর্সেনিকের উপস্থিতি পাওয়া গভীর-অগভীর নলকূপে লাল রং করে দেওয়ার পরও সেগুলোর পানি পান করছে মানুষ। এতে উপজেলা বাসিন্দাদের স্বাস্থ্যঝুঁকি বাড়ছে।
ফকিরহাট জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের তথ্য মতে, উপজেলায় ২৮ হাজার ৪২৬টি গভীর নলকূপ রয়েছে। এগুলোর মধ্যে ১৩ হাজার ৯৭১টি নলকূপে অতিমাত্রায় আর্সেনিকের উপস্থিতি পাওয়া গেছে। উপজেলা জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের কার্যালয় ২০২১ সালের অক্টোবর থেকে ২০২৩ সালের আগস্ট পর্যন্ত এক জরিপ চালিয়ে এ তথ্য পায়।
জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, অধিদপ্তরের পক্ষ থেকে ২০২২-২৩ অর্থবছরে উপজেলার ৮টি ইউনিয়নের জন্য ২০৮টি গভীর নলকূপ স্থাপনের জন্য অর্থ বরাদ্দ দেয়। ২০২৩-২৪ অর্থবছরে উপজেলায় মাত্র ৯৬টি নলকূপ বরাদ্দ দেওয়া হয়। ২০২৪ সালের আগস্ট মাসের পর অধিদপ্তর ফকিরহাটে কোনো নলকূপ বরাদ্দ দেয়নি।
উপজেলা জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের সহকারী প্রকৌশলী মো. আমিনুল ইসলাম জানান, বিশ্বস্বাস্থ্য সংস্থা পানিতে আর্সেনিকের সহনীয় মাত্রা নির্ধারণ করেছে প্রতি লিটারে ১০ মাইক্রোগ্রাম। আর বাংলাদেশ সরকারের নির্ধারিত সহনশীল মাত্রা প্রতি লিটারে ৫০ মাইক্রোগ্রাম। কিন্তু ফকিরহাটের অনেক নলকূপে আর্সেনিকের মাত্রা প্রতি লিটারে ৫০০ মাইক্রোগ্রাম পাওয়া গেছে; যা সহনীয় মাত্রার ১০ গুণ বেশি।
সম্প্রতি উপজেলার সদর, নলধা-মৌভোগ, বাহিরদিয়া-মানসা ও পিলজংগ ইউনিয়ন ঘুরে দেখা যায়, বেশির ভাগ নলকূপে লাল রং করা।
ফকিরহাট সদর ইউনিয়নের আট্টাকী গ্রামের বাসিন্দা রামেছা বেগম, নাজনীন বেগমসহ কয়েকজন নারী জানান, তাঁদের একই আঙিনায় পাঁচটি পরিবার রয়েছে। এসব পরিবারসহ আশপাশের আরও ৮-১০টি পরিবারের অন্তত ৪০ সদস্য একটি অগভীর নলকূপের ওপর নির্ভরশীল। নিরাপদ পানির ব্যবস্থা না থাকায় তাঁরা আর্সেনিকযুক্ত পানিই পান করছেন।
উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের আবাসিক চিকিৎসা কর্মকর্তা তানভীর হাসান অনিক বলেন, বিভিন্ন সময় পানিবাহিত রোগে আক্রান্ত রোগীরা চিকিৎসা নিতে আসেন। কিন্তু ঠিক আর্সেনিকে আক্রান্ত রোগীর হিসাব রাখার ব্যবস্থা নেই।
উপজেলা জনস্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সহকারী প্রকৌশলী মো. সাব্বির হোসেন বলেন, নলকূপের পানিতে অসহনীয় মাত্রায় আর্সেনিক থাকায় নিরাপদ পানির তীব্র সংকট চলছে। এ ছাড়া লবণাক্ততা ও পানিতে ভারী ধাতুর উপস্থিতির বিষয়ে স্বতন্ত্র জরিপ করা প্রয়োজন।
ফকিরহাট উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. রোকনুজ জামান বলেন, নলকূপে অসহনীয় মাত্রার আর্সেনিক থাকায় নিরাপদ পানির সংকট চলছে। এই সংকট মোকাবিলায় ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে আধুনিক পানি পরিশোধন ব্যবস্থা বা রিভার্স অসমোসিস প্ল্যান্ট স্থাপনের জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
বাগেরহাট জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের নির্বাহী প্রকৌশলী জয়ন্ত মল্লিক বলেন, অতিরিক্ত আর্সেনিক বিবেচনায় ফকিরহাটে এখন পর্যন্ত কোনো প্রকল্প গ্রহণ করা হয়নি। বরাদ্দ না পাওয়ায় নলকূপ স্থাপন করা যায়নি। বরাদ্দ পেলে নলকূপ স্থাপন করা হবে।