পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভা নির্বাচনে পরাজয়ের পর তৃণমূল কংগ্রেসের দীর্ঘ ১৫ বছরের সুনিয়ন্ত্রিত ও সুরক্ষিত দুর্গে বড় ধরনের ফাটল দেখা দিয়েছে। ভারতীয় জনতা পার্টির (বিজেপি) টানা দেড় দশকের আক্রমণ সামলে যে তৃণমূল এত দিন নিজেদের ‘অপরাজেয়’ হিসেবে জাহির করে আসছিল, নির্বাচনী বিপর্যয়ের পর সেই দেয়াল ধসে পড়তে শুরু করেছে।
অতীতে বিভিন্ন সময়ে দলের অভ্যন্তরীণ কোন্দল মাথাচাড়া দিলেও পরপর নির্বাচনে জয়ের আড়ালে তা ধামাচাপা পড়ে যেত। তবে এবারের পরাজয় দলটিতে এমন এক অভ্যন্তরীণ কলহ ও ক্ষোভের জন্ম দিয়েছে, যা এখন প্রকাশ্য বিদ্রোহে রূপ নিয়েছে। তৃণমূলের শীর্ষ নেতারা এখন খোদ মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের রণকৌশল, তাঁর প্রতি নিজেদের আনুগত্য এবং একসময়ের অপরাজেয় এই রাজনৈতিক শক্তির ভবিষ্যৎ নিয়ে প্রশ্ন তুলতে শুরু করেছেন।
দলের ভেতরের এই অসন্তোষ সবচেয়ে বেশি স্পষ্ট হয়েছে বর্ষীয়ান নেত্রী কাকলি ঘোষ দস্তিদারের পদত্যাগের মাধ্যমে। তৃণমূলের রাজ্য সভাপতি সুব্রত বক্সীর কাছে পাঠানো চিঠিতে তিনি কেবল পদত্যাগের কথাই বলেননি, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে দল পরিচালনার ক্ষেত্রে পুরোনো ও চেনা পদ্ধতিতে ফিরে যাওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন।
চারবারের এই সংসদ সদস্য তৃণমূলের নির্বাচনী পরামর্শক প্রতিষ্ঠান আইপ্যাক-এর দিকেই আঙুল তুলেছেন। প্রশান্ত কিশোরের হাত ধরে ২০২১ সালের নির্বাচনে এই সংস্থা তৃণমূলকে ২৯৪টি আসনের মধ্যে ২১৫টিতে বিশাল জয় এনে দিয়েছিল। তবে কাকলি ঘোষ দস্তিদারের অভিযোগ, ‘এই ভুঁইফোড় সংস্থার তরুণ ছেলেমেয়েরা মাঠপর্যায়ের প্রবীণ কর্মীদের সঙ্গে অত্যন্ত খারাপ আচরণ করেছে এবং তাঁদের ওপর অন্যায় চাপ সৃষ্টি করেছে।’
তৃণমূল প্রতিষ্ঠার সময় থেকে মমতার পাশে থাকা কাকলি বারাসাত সাংগঠনিক জেলার সভাপতির পদসহ দলের সব সাংগঠনিক পদ থেকে ইস্তফা দিয়েছেন। একই সঙ্গে তিনি দলজুড়ে চলা দুর্নীতি ও দলের কর্মীদের অপরাধপ্রবণতার বিরুদ্ধে তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেছেন, ‘দলের এই অধঃপতন আমি মেনে নিতে পারছি না।’
তৃণমূলের এই অভ্যন্তরীণ ফাটল আরও স্পষ্ট হয়েছে, যখন কাকলির এই মন্তব্যের পর দলের আরেক বর্ষীয়ান সংসদ সদস্য কল্যাণ বন্দ্যোপাধ্যায় তাঁকে লক্ষ্য করে পাল্টা আক্রমণ শুরু করেন। এদিকে জনসমক্ষে দলের সমালোচনা করার অপরাধে তৃণমূল ইতিমধ্যে পাঁচ সদস্যের একটি শৃঙ্খলা রক্ষা কমিটি গঠন করেছে এবং এর প্রথম কোপ পড়েছে দলের মুখপাত্র ঋজু দত্তের ওপর, তাঁকে ছয় বছরের জন্য দল থেকে বহিষ্কার করা হয়েছে।
তৃণমূলের অন্দরে অস্বস্তি আরও বাড়িয়েছেন দলের তিনজন কাউন্সিলর আনিসুর রহমান, বীণা মণ্ডল এবং মোহাম্মদ আব্দুল মতিন। তাঁরা পশ্চিমবঙ্গের নতুন মুখ্যমন্ত্রী ও বিজেপি নেতা শুভেন্দু অধিকারীর নেতৃত্বাধীন একটি প্রশাসনিক বৈঠকে যোগ দেওয়ায় জল্পনা শুরু হয়েছে, তৃণমূলের একটি বড় অংশ দল ছাড়তে প্রস্তুত।
এ ছাড়া তৃণমূলের দুই বিধায়ক ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায় এবং সন্দীপন সাহা বিধানসভার স্পিকার রথীন্দ্র বোসের কক্ষে শুভেন্দু অধিকারীর সঙ্গে সাক্ষাৎ করেছেন। যদিও তাঁরা একে ‘সৌজন্য সাক্ষাৎ’ বলে দাবি করেছেন, তবে গত সপ্তাহে দিল্লির একটি সরকারি গেস্টহাউসেও ঋতব্রতকে শুভেন্দুর সঙ্গে দেখা গেছে।
একসময়ের হেভিওয়েট মন্ত্রী ও মমতার সার্বক্ষণিক সঙ্গী ইন্দ্রনীল সেন, শশী পাঁজা, ব্রাত্য বসু, মলয় ঘটক এবং অরূপ বিশ্বাসদের মতো নেতারা এখন জনসমক্ষ থেকে কার্যত অদৃশ্য। ১১ মে নিয়োগ কেলেঙ্কারির অভিযোগে সাবেক মন্ত্রী সুজিত বসুকে ইডি (ইডি) গ্রেপ্তার করার পর দলের সংকট আরও ঘনীভূত হয়েছে।
এর মধ্যে গত মঙ্গলবার দুর্নীতির অভিযোগে উত্তর চব্বিশ পরগনার বাদুড়িয়া পৌরসভার চেয়ারম্যান দীপঙ্কর ভট্টাচার্যকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। তৃণমূলের এই নেতাকে ৮০ লাখ টাকাসহ গ্রেপ্তার করা হয়। এরপর বুধবার তাঁর বন্ধু শামীম গাজীর পাটখেত থেকে পাঁচটি বস্তায় রাখা আরও ২ কোটি ২৪ লাখ টাকা উদ্ধারের কথা জানায় পুলিশ।
স্থানীয় ব্যক্তিদের অভিযোগ, দীপঙ্করের কাছে আরও টাকা ও সোনার গয়না রয়েছে। সেই সব অবৈধ সম্পদ উদ্ধারের দাবিও তুলেছেন তাঁরা।
তৃণমূলের রাজনীতিতে যোগ দেওয়ার আগে দীপঙ্কর রাজমিস্ত্রির কাজ করতেন। এ ছাড়া স্কুটারও চালাতেন। তৃণমূলে যোগ দেওয়ার পর তিনি ধীরে ধীরে প্রভাবশালী হয়ে ওঠেন। পরে বাদুড়িয়ার পৌরসভার চেয়ারম্যানও নির্বাচিত হন।
এদিকে ভোটের ফল প্রকাশের ২০ দিন পার হয়ে গেলেও মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় এখনো পরাজয় মেনে নিতে পারছেন না বলে মনে করছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকেরা। ২৪ মে ৩২ মিনিট ২৮ সেকেন্ডের একটি ফেসবুক লাইভে তিনি দাবি করেছেন, চক্রান্ত করে তাঁদের ১৫০টি আসন ‘লুট’ করা হয়েছে। গত চার দশকের মধ্যে এই প্রথম মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় লোকসভা কিংবা বিধানসভা কোনোটিরই সদস্য নন।
তিনি সম্প্রতি ভোট-পরবর্তী সহিংসতার শিকার হওয়া কর্মীদের পক্ষে লড়তে কলকাতা হাইকোর্টে আইনজীবী হিসেবে গিয়েছিলেন। আদালত চত্বর থেকে বের হওয়ার সময় তাঁকে লক্ষ্য করে ‘চোর চোর’ স্লোগান দেওয়া হয়।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক তৃণমূল নেতা এনডিটিভিকে জানিয়েছেন, দলটির মূল ভিত্তি ‘মা, মাটি, মানুষ’ থেকে তারা অনেক দূরে সরে গেছে। শীর্ষ নেতৃত্বের কাছে সাধারণ কর্মীদের পৌঁছানোর কোনো সুযোগ নেই।
সবচেয়ে গুরুতর অভিযোগ উঠেছে আইপ্যাকের বিরুদ্ধে। অভিযোগ রয়েছে, এই সংস্থাটি অর্থের বিনিময়ে দলের বিভিন্ন পদ বিক্রি করেছে। ক্ষুব্ধ এক নেতা এনডিটিভিকে জানান, সরাসরি না হলেও পঞ্চায়েতের পদ থেকে শুরু করে বিধানসভার টিকিট দেওয়ার নাম করে এবং সামনের নির্বাচন ‘কঠিন’ এমন অজুহাতে বিপুল অঙ্কের টাকা দাবি করা হতো।
অর্থাৎ যে তৃণমূলের মূল ভিত্তি ছিল ‘মা, মাটি, মানুষ’; সেই তৃণমূলই টাকা বিনিময়ে পঞ্চায়েত, বিধানসভার টিকিট বেচেছে। এভাবেই রাজমিস্ত্রি থেকে দীপঙ্কর ভট্টাচার্যের মতো মানুষ তৃণমূলের আশীর্বাদে বাদুড়িয়া পৌরসভার চেয়ারম্যান হয়েছেন, যাঁর অবৈধ সম্পদ উদ্ধারে এখন স্থানীয় বাসিন্দারা সরকারি হস্তক্ষেপ চাইছেন। সব মিলিয়ে দেড় দশকের শাসন হারানোর পর নানা অভিযোগে অস্তিত্ব সংকটের মুখে দাঁড়িয়ে আছে তৃণমূল কংগ্রেস।