হোম > বিশ্লেষণ

ইউক্রেনের সামরিক নেতৃত্বে গভীর ফাটল, আমলাতন্ত্রের লড়াইয়ে ঝুঁকিতে জেলেনস্কি

আজকের পত্রিকা ডেস্ক­

কিয়েভে মিখাইলো ফেদোরভের সমর্থকদের বিক্ষোভ। ছবি: এএফপি

ইউক্রেনের সংস্কারপন্থী প্রতিরক্ষামন্ত্রী মিখাইলো ফেদোরভকে আকস্মিকভাবে বরখাস্ত করার সিদ্ধান্তটি কেবল একটি মন্ত্রিসভার রদবদল নয়, বরং এটি যুদ্ধকালীন ইউক্রেনের সামরিক কাঠামোর ভেতরে দীর্ঘদিনের পুঞ্জীভূত দ্বন্দ্বকে প্রকাশ্যে এনেছে। পরিস্থিতি সামাল দিতে প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি দেশের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা বাহিনী ‘এসবিইউ’-এর ভারপ্রাপ্ত প্রধান ইয়েভহেনী খামারাকে নতুন ভারপ্রাপ্ত প্রতিরক্ষামন্ত্রী হিসেবে নিয়োগ দিলেও, এই সিদ্ধান্ত কিয়েভের রাজনৈতিক ও সামরিক পরিমণ্ডলে এক নজিরবিহীন অস্থিরতা তৈরি করেছে।

বিশ্লেষকদের মতে, এই সংকট ইউক্রেনের তরুণ, প্রযুক্তিভিত্তিক আধুনিক সামরিক ধারা এবং প্রচলিত ধীর গতির আমলাতান্ত্রিক সামরিক নেতৃত্বের মধ্যকার মেরুকরণকে চূড়ান্ত রূপ দিয়েছে।

সংঘাতের নেপথ্যে

বিদায়ী প্রতিরক্ষামন্ত্রী মিখাইলো ফেদোরভ (৩৫) ছিলেন ইউক্রেনীয় ক্যাবিনেটের তরুণতম ও সবচেয়ে আধুনিকমনা মুখ। ডিজিটাল রূপান্তর মন্ত্রী হিসেবে সফলতার পর প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব নিয়ে তিনি ইউক্রেনের প্রতিরক্ষাব্যবস্থাকে সম্পূর্ণ প্রযুক্তি ও ডেটা-চালিত করার উদ্যোগ নেন। সামরিক কেনাকাটায় দুর্নীতি কমানো এবং আমলাতান্ত্রিক জটিলতা দূর করায় তাঁর বড় ভূমিকা ছিল।

তবে ফেদোরভের এই আধুনিকীকরণ নীতি ইউক্রেনের সামরিক বাহিনীর শীর্ষ কর্মকর্তাদের একাংশের অসন্তোষের কারণ হয়ে দাঁড়ায়। বিশেষ করে সামরিক বাহিনীর প্রধান জেনারেল ওলেকসান্দর সিরস্কির (৬০) সঙ্গে তাঁর নীতিগত অমিল ছিল স্পষ্ট।

৬০ বছর বয়সী জেনারেল সিরস্কি সোভিয়েত ঘরানার ঐতিহ্যবাহী সামরিক কৌশলে বিশ্বাসী, যা বেশ কঠোর এবং যার কারণে মাঠপর্যায়ে অনেক বেশি সেনা হতাহতের ঘটনা ঘটে বলে সমালোচনা রয়েছে। অন্যদিকে, ফেদোরভ মানবসম্পদের ক্ষতি কমিয়ে ড্রোন ও আধুনিক প্রযুক্তির সর্বোচ্চ ব্যবহারে জোর দিচ্ছিলেন।

বিদায় নিয়ে ফেদোরভ সেনাপ্রধানের বিরুদ্ধে প্রকাশ্য ক্ষোভ উগরে দিয়ে বলেছেন, ‘রাশিয়াকে কীভাবে পরাজিত করা যায় তা ভাবার বদলে জেনারেল সিরস্কি কীভাবে দেশকে বিভক্ত করা যায়, সেই ছক কষেছেন।’ তিনি অভিযোগ করেন, সিরস্কি প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের একাধিক আধুনিকায়ন উদ্যোগকে পরিকল্পিতভাবে বাধাগ্রস্ত করেছেন।

জেনারেল সিরস্কিও অবশ্য পাল্টা জবাব দিতে ছাড়েননি। ২০২২ সালে কিয়েভ রক্ষায় নিজের ঐতিহাসিক ভূমিকার কথা মনে করিয়ে দিয়ে তিনি ইঙ্গিত করেন যে, পেছনের নিরাপদ কার্যালয়ে বসে আধুনিক রূপরেখা বা প্রেস ব্রিফিং করা সহজ, কিন্তু বাস্তব যুদ্ধক্ষেত্র সম্পূর্ণ ভিন্ন।

ড্রোন যুদ্ধের মেরুকরণ ও সামরিক বাহিনীতে অসন্তোষ

এই রদবদলের সবচেয়ে বড় ধাক্কাটি লেগেছে ইউক্রেনের বিমান ও ড্রোন যুদ্ধ পরিচালনাকারী দলগুলোর ওপর। ফেদোরভকে বরখাস্তের প্রতিবাদে ইউক্রেন বিমানবাহিনীর ডেপুটি কমান্ডার ও ড্রোন যুদ্ধের অন্যতম প্রধান পরিকল্পনাকারী পাভলো ইয়েলিজারভ পদত্যাগ করেছেন।

সামরিক বিশ্লেষকদের মতে, ড্রোন প্রযুক্তি ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলা পরিচালনার দায়িত্বে থাকা কর্মকর্তাদের মধ্যে ফেদোরভের ব্যাপক জনপ্রিয়তা ছিল। তাঁর অপসারণকে তাঁরা সামরিক আধুনিকায়নের একটি বড় অবনতি হিসেবে দেখছেন।

সাধারণত রাশিয়ার সর্বাত্মক হামলার মুখে ইউক্রেনে যেকোনো ধরনের অভ্যন্তরীণ বিক্ষোভ বিরল ঘটনা। কিন্তু ফেদোরভের অপসারণের পর কিয়েভে প্রেসিডেন্ট কার্যালয়ের বাইরে এক হাজারের বেশি মানুষ জড়ো হয়ে বিক্ষোভ প্রদর্শন করেন। বিক্ষোভকারীদের কণ্ঠে কেবল ফেদোরভকে ফিরিয়ে আনার দাবিই ছিল না, বরং সেনাপ্রধান সিরস্কির অপসারণের স্লোগানও শোনা গেছে।

এই দৃশ্যটি ২০২৫ সালের জুলাইয়ের সেই ঐতিহাসিক গণবিক্ষোভের কথা মনে করিয়ে দেয়, যখন ব্যাপক প্রতিবাদের মুখে জেলেনস্কি দুর্নীতি দমন সংস্থাগুলোর স্বাধীনতা কেড়ে নেওয়ার একটি বিতর্কিত বিল প্রত্যাহার করতে বাধ্য হয়েছিলেন।

ইয়েভহেনী খামারার অন্তর্ভুক্তি ও নতুন কৌশল

সংকট মোকাবিলায় প্রেসিডেন্ট জেলেনস্কির তুরুপের তাস হলেন ইয়েভহেনী খামারা। তিনি দেশের অভ্যন্তরীণ গোয়েন্দা সংস্থা এসবিইউ-এর প্রধান ছিলেন এবং তাঁর নেতৃত্বাধীন বিশেষ ‘আলফা’ টিম গত কয়েক মাসে রাশিয়ার অভ্যন্তরে একের পর এক সফল ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলা পরিচালনা করেছে।

জেলেনস্কি খামারার নিয়োগকে সমর্থন করে লিখেছেন, ‘যুদ্ধের এই পর্যায়ে আমাদের কৌশল হবে প্রযুক্তিগত যুদ্ধ পরিচালনা করা, যেখানে খামারার অভূতপূর্ব অভিজ্ঞতা রয়েছে।’

খামারার নিয়োগ স্পষ্ট করে যে, ইউক্রেন এখন রাশিয়ার তেল শোধনাগার এবং প্রতিরক্ষা শিল্প কারখানায় দূরপাল্লার হামলা আরও বাড়াতে চায়, যা রাশিয়ার যুদ্ধ সক্ষমতা ও অর্থনৈতিক মেরুদণ্ড ভেঙে দেবে।

এ ছাড়া প্রতিরক্ষামন্ত্রীর পদে একজন অভিজ্ঞ গোয়েন্দা কর্মকর্তাকে বসানোর মাধ্যমে সামরিক পরিকল্পনা ও গোয়েন্দা তথ্যের সমন্বয় আরও দ্রুত হবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

জেলেনস্কির আধিপত্য ও রাজনৈতিক ঝুঁকি

যুদ্ধ শুরুর পর থেকে পশ্চিমা বিশ্ব ও ইউক্রেনীয় জনগণের কাছে প্রেসিডেন্ট জেলেনস্কি একজন অবিসংবাদিত নেতা হিসেবে সমাদৃত। তবে দেশের ভেতরে তাঁর সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়া নিয়ে সমালোচনা তীব্র হচ্ছে।

ইউক্রেনীয় প্রভাবশালী সংবাদমাধ্যম ‘এনভি’-এর প্রধান সম্পাদক ভিতালি সিচ অত্যন্ত কড়া ভাষায় লিখেছেন, ‘কঠিন মুহূর্তে জেলেনস্কি বীরের মতো আচরণ করেন ঠিকই, কিন্তু আমাদের ভুলে যাওয়া উচিত নয় যে অনেক কঠিন মুহূর্ত মূলত তাঁর নিজের নেওয়া কিছু কাণ্ডজ্ঞানহীন সিদ্ধান্তের কারণেই তৈরি হয়।’

বিশ্লেষকদের মতে, যুদ্ধের এই সংকটময় মুহূর্তে যখন পূর্ব সীমান্তে তীব্র সেনা ঘাটতি রয়েছে এবং আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থার সংকটে রুশ ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিনিয়ত আঘাত হানছে, তখন সামরিক নেতৃত্বের এই প্রকাশ্য গৃহযুদ্ধ ইউক্রেনের অভ্যন্তরীণ স্থিতিশীলতাকে বড় ঝুঁকিতে ফেলতে পারে।

প্রশাসনিক জটিলতা ও ভবিষ্যতের অনিশ্চয়তা

যদিও গতকাল বৃহস্পতিবার ইউক্রেনের পার্লামেন্ট দেশের নতুন প্রধানমন্ত্রী হিসেবে জ্বালানি খাতের সাবেক নির্বাহী সের্গেই কোরেৎস্কিকে অনুমোদন দিয়েছে, তবে নতুন প্রতিরক্ষামন্ত্রী হিসেবে ইয়েভহেনী খামারার স্থায়ী নিয়োগের বিষয়টি এখনো ঝুলে রয়েছে। আগামী ১৮ আগস্টের আগে পার্লামেন্টের পরবর্তী সাধারণ অধিবেশন বসার সম্ভাবনা নেই। ফলে অন্তর্বর্তীকালীন সময়ে প্রতিরক্ষা খাতে এক ধরনের নীতিগত শূন্যতা দেখা দিতে পারে।

এদিকে, ক্রেমলিনের মুখপাত্র জানিয়েছেন, মস্কো ইউক্রেনের এই অভ্যন্তরীণ রদবদলের ওপর অত্যন্ত নিবিড় নজর রাখছে। ইউক্রেনের নেতৃত্বের এই বিভাজনকে মস্কো কোনো সামরিক সুযোগ হিসেবে ব্যবহার করার চেষ্টা করবে কি না, সেটিই এখন দেখার বিষয়।

বিশ্বকাপ আয়োজনে সর্বাধিক মুনাফা করল কারা, লোকসান গুনল যারা

হরমুজ নিয়ে যুদ্ধ এখানেই শেষ নয়

হেঁটেও যেভাবে সবচেয়ে সফল ‘ওয়াকিং ফুটবলের অবিসংবাদিত রাজা’ মেসি

২০১৬ সালের ব্যর্থ অভ্যুত্থান: তুরস্কে যেভাবে বদলে গেল সেনাবাহিনী ও জনগণের সম্পর্ক

আহমেদিনেজাদকে ‘অ্যাসেট’ বানানোসহ ইরান নিয়ে ইসরায়েলি মহাপরিকল্পনা যেভাবে ভেস্তে গেল

হরমুজ ইস্যুতেই ফের যুদ্ধ, ইরানের ‘সক্ষমতা কমাতে পারবে না’ যুক্তরাষ্ট্র

হরমুজকে হাতিয়ার করে আঞ্চলিক আধিপত্যের আকাঙ্ক্ষা, যুদ্ধসহ সর্বস্ব বাজিতে প্রস্তুত ইরান

ফ্রান্সে দাবদাহ: রাজনৈতিক বিতর্কের কেন্দ্রে এসি

পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র যেভাবে বদলে দেবে বাংলাদেশের জ্বালানি খাত

আর্জেন্টাইন ফুটবলের আইকনিক প্রতীকের ইহুদি কারিগর এবং বিশ্বকাপে ফিলিস্তিন-ইসরায়েল ইস্যু