হোম > নারী

তেঁতুলিয়ার ‘লিলি আপা’: ১,৪২০টি স্বাভাবিক প্রসব করিয়েছেন যিনি

ফাহিম হাসান, পঞ্চগড়

মেহেরুন নেহার লিলি।

সমতলের চা-বাগান আর কাঞ্চনজঙ্ঘা দেখার জন্য বেশ খ্যাতি লাভ করেছে দেশের একেবারে উত্তরের জনপদ তেঁতুলিয়া। হিমালয়ের খুব কাছের এই এলাকায় বছরের বেশির ভাগ সময় থাকে তীব্র শীত, ঝড়-বৃষ্টি আর প্রতিকূল আবহাওয়া। আধুনিক চিকিৎসা-সুবিধা এখানকার মানুষের কাছে এখনো অনেকটা স্বপ্নের মতো। সেই সীমান্তঘেঁষা প্রান্তিক জনপদের এক নারী নিজের দায়িত্ববোধ, মমতা আর দৃঢ়সংকল্পে বদলে দিয়েছেন হাজারো মায়ের জীবন। তাঁর নাম মেহেরুন নেহার লিলি। তিনি স্থানীয় কাজীপাড়া কমিউনিটি ক্লিনিকের কমিউনিটি হেলথ কেয়ার প্রোভাইডার বা সিএইচসিপি।

লিলির নাম শুনলে স্থানীয় মানুষের চোখমুখে দেখা দেয় কৃতজ্ঞতার অভিব্যক্তি। কারণ, তিনি এ পর্যন্ত করিয়েছেন ১ হাজার ৪২০টি স্বাভাবিক প্রসব। এটি শুধু সংখ্যা নয়, বরং প্রান্তিক নারীর জীবনে নিরাপদ মাতৃত্ব নিশ্চিত করার এক ঐতিহাসিক রেকর্ড।

শুরুর গল্প: ভয়ের মাঝেই সাহস

২০১১ সালে সিএইচসিপি হিসেবে কাজীপাড়া কমিউনিটি ক্লিনিকে যোগ দেন লিলি। শুরুর দিকে তাঁর দায়িত্ব ছিল রোগীর সাধারণ চিকিৎসা ও স্বাস্থ্যসেবা দেওয়া। কিন্তু ভেতরে-ভেতরে তিনি আরও বড় কিছু করার সংকল্প করেছিলেন, যা ছিল অপ্রকাশ্য। ২০১৪ সালে ঠাকুরগাঁও সদর হাসপাতালে ছয় মাসের কমিউনিটি স্কিল বার্থ অ্যাটেনডেন্ট বা সিএসবিএ প্রশিক্ষণ নেন লিলি। সেই প্রশিক্ষণই হয়ে ওঠে তাঁর জীবনের মোড় ঘোরানো অধ্যায়। এক বছর পর, ২০১৫ সালে প্রথমবার স্বাভাবিক প্রসব করান তিনি। ‘প্রথমবার যখন প্রসব করাতে হলো, বুক কাঁপছিল’, স্মৃতিচারণা করলেন লিলি। ‘মুহূর্তটা ছিল ভয়ের। কিন্তু যখন নবজাতকের কান্না শুনলাম, মনে হলো এটাই আমার জীবনের সবচেয়ে বড় পাওয়া। এরপর আর থেমে থাকিনি।’

ঝড়বৃষ্টির রাতেও নির্ভরতার নাম

প্রান্তিক জনপদের মায়েদের কাছে লিলি এখন আস্থার প্রতীক। মাঝরাত হোক অথবা ভোরবেলা; মুষলধারায় বৃষ্টির রাত হোক কিংবা কুয়াশাঘেরা শীতের সকাল—সংবাদ পেলেই ছুটে যান তিনি। শুধু প্রসব নয়, গর্ভকালীন ও প্রসব-পরবর্তী চিকিৎসা, প্রেগন্যান্সি চেকআপ, প্রেশার-ডায়াবেটিস পরীক্ষা, অপারেশন-পরবর্তী সেলাই কাটা, এমনকি ২২ প্রকার সরকারি ওষুধ সরবরাহ—সবকিছু একাই সামলান লিলি।

এই শীতে যখন তাঁর সঙ্গে কথা হচ্ছিল, জানালেন, ঝড়বৃষ্টির গভীর রাতেও যখন কোনো মায়ের পাশে শুয়ে থাকা নবজাতকের মুখ দেখেন, সব কষ্ট আর ক্লান্তি উবে যায়। মনে হয়, যাক, কষ্ট সফল হলো।

বদলে গেছে অসংখ্য মায়ের জীবন

মেহেরুন নেহার লিলির সেবায় সবচেয়ে বেশি উপকৃত হয়েছে দরিদ্র ও সুবিধাবঞ্চিত পরিবারগুলো। চা-শ্রমিক, দিনমজুর, নির্মাণশ্রমিকের মতো অর্থনীতির নিচের স্তরে থাকা সাধারণ চিকিৎসা ও মাতৃসেবাবঞ্চিত পরিবারগুলোর ভরসার নাম এখন লিলি। তারা পেয়েছে স্বাভাবিক প্রসবের নিশ্চয়তা, প্রায় বিনা মূল্যের সেবা। তাঁর কারণে কমেছে মাতৃ ও শিশুমৃত্যুর হার।

আকলিমা নামের এক নারী জানালেন, তাঁদের এলাকার সকল মায়ের কাছে ‘লিলি আপা’ মানে ভরসা। তাঁর ওপর অগাধ আস্থা এলাকার নারীদের। আলপনা বেগম বললেন, ‘নরমাল ডেলিভারির সময় লিলি আপাকে ডাকলেই পাওয়া যায়। খুব সুন্দরভাবে সবকিছু করে দেন তিনি। তাঁর কাজের প্রশংসা করে শেষ করা যাবে না।’

পরিবার ও সমাজের সমর্থন

লিলির সাফল্যের পেছনে রয়েছে তাঁর পরিবারের অবদান। স্বামী মকসেদ আলী জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে চাকরি করেন। সব সময় পাশে থেকে স্ত্রীর কাজে সহায়তা করে চলেছেন। মকসেদ বললেন, ‘আমার স্ত্রীর কাজকে আমি গর্বের চোখে দেখি। সে অসহায় মানুষের জীবন বাঁচাচ্ছে। মৃত্যুঝুঁকি কমাচ্ছে। পাশাপাশি মানুষ অপ্রয়োজনীয় অর্থ ব্যয় থেকেও রক্ষা পাচ্ছে।’ তিন কন্যার জননী লিলি পরিবার সামলে নিখুঁতভাবে এই সেবা চালিয়ে যাচ্ছেন।

স্বীকৃতি ও সম্মাননা

দায়িত্ব নিয়ে নিষ্ঠার সঙ্গে কাজ করে যাওয়ার জন্য শুধু এলাকার মানুষ নয়, সরকারিভাবেও মেহেরুন নেহার লিলি পেয়েছেন একাধিক স্বীকৃতি ও সম্মাননা। জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে শ্রেষ্ঠ সিএইচসিপি নির্বাচিত হয়েছেন তিনি। তাঁর ক্লিনিক পেয়েছে শ্রেষ্ঠ কমিউনিটি ক্লিনিকের পুরস্কার। রোকেয়া দিবসে পেয়েছেন জয়িতা পুরস্কার, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে রংপুর বিভাগীয় পর্যায়ে ‘অদম্য নারী’ সম্মাননা পেয়েছেন লিলি। এই স্বীকৃতিগুলো শুধু তাঁর নয়, বরং প্রান্তিক অঞ্চলের নারীদের যুদ্ধজয়ের গল্পও বটে।

সীমান্ত অঞ্চলে মাইলফলক

ইউপি সদস্য ও ক্লিনিক গ্রুপ সভাপতি রাইতু মোহাম্মদ জানিয়েছেন, স্বাভাবিক প্রসবের ক্ষেত্রে কাজীপাড়া ক্লিনিক রেকর্ড করেছে। লিলি এখন সীমান্ত অঞ্চলের স্বাস্থ্যসেবায় এক মাইলফলক। তিনি শুধু একজন স্বাস্থ্যকর্মী নন, হয়ে উঠেছেন অসংখ্য মায়ের আস্থার নাম, নির্ভরতার প্রতীক।

হিমালয়ের পাদদেশে সীমান্তঘেঁষা তেঁতুলিয়ার প্রত্যন্ত গ্রামে এক নারীর প্রচেষ্টা বদলে দিয়েছে হাজারো জীবন। মেহেরুন নেহার লিলির স্বাভাবিক প্রসবের রেকর্ড শুধু পরিসংখ্যান নয়, বরং এক প্রান্তিক সমাজের নারীস্বাস্থ্য সুরক্ষার অনন্য ইতিহাস। তিনি প্রমাণ করেছেন, দায়িত্ববোধ, মমতা আর সেবার মানসিকতা থাকলে একজন মানুষই বদলে দিতে পারে পুরো প্রান্তিক জনপদের চিত্র।

১০১ বছরেও কিশোরীর প্রাণশক্তিতে জিয়াং

পৌরোহিত্য শুধু ধর্ম নয়, এটি নারীর সমান অংশীদারত্বের দাবি

চলমান এক নদীর নাম অপরাহ উইনফ্রে

নারী ও সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তা নিশ্চিতে ইসির কাছে ৭১ সংগঠনের ১০ সুপারিশ

জামায়াত সমর্থকদের ‘সাইবার বুলিংয়ের’ শিকার ডাকসু সদস্য হেমা চাকমা

ইরান পরিস্থিতি: নারীত্বের জয়গান যেখানে বিদ্ধ বুলেট আর শৃঙ্খলে

ক্রমাগত নেতিবাচক চিন্তা ও মন খারাপ বিষণ্নতার কারণ

কেমন হবে নতুন দিন

সার্জনস হল রায়ট ও সোফিয়া জ্যাকস-ব্লেক

শুভ জন্মদিন, অ্যাগনেস মঙ্গান