‘এক বেলার খাবার রানতি ঘণ্টার পর ঘণ্টা পাতা কুড়াতি হয়। কোমরব্যথা, ঘাড়ব্যথা—এইগুলা তো আছেই। এরপর ঘণ্টার পর ঘণ্টা কাটাতি হয় পাকঘরে। চুলার ধোঁয়ায় শ্বাসকষ্ট, প্রেশার—আরও কত রোগ!’ বলছিলেন জামালপুরের দেওয়ানগঞ্জের চুকাইবাড়ি গ্রামের গৃহবধূ তাসলিমা বেগম। তিনি জানান, প্রতিদিনের রান্নার জন্য জ্বালানি সংগ্রহ করা নারীদের জন্য অত্যন্ত পরিশ্রমের কাজ। দীর্ঘ সময় পাতা কুড়ানোর কারণে তাঁর এলাকার অনেক নারী কোমরব্যথায় ভুগছেন। আর পাতা ও খড়ি দিয়ে রান্নার ফলে যে ধোঁয়া তৈরি হয়, তার কারণে তাসলিমার গ্রামের অনেক নারী শ্বাসকষ্ট, উচ্চ রক্তচাপসহ বিভিন্ন রোগে আক্রান্ত হয়েছেন বলে জানান তিনি।
শুধু তাসলিমা কিংবা তাঁর গ্রামের নারীরা নন, গবেষণায় দেখা গেছে, বাংলাদেশের গ্রামীণ নারীদের সারা দিনে গড়ে ৩ ঘণ্টা ১৭ মিনিট রান্নাঘরেই কাটে। এ সময় তাঁদের বড় অংশের রান্নার কাজ হয় লাকড়ি, তুষ, শুকনা গোবর এবং শুকনা পাতায়। এতে যে ধোঁয়া তৈরি হয়, তা মূলত রান্নাঘরেই ঘুরপাক খায়। নিশ্বাসের সঙ্গে ওই ধোঁয়া শরীরে ঢোকে। ফলে নারীদের ২৩ শতাংশ উচ্চ রক্তচাপে ভোগে। গ্যাস, বিদ্যুৎ বা কম দূষণ হয়, এমন জ্বালানি চুলায় রান্না করা নারীদের তুলনায় ওই নারীদের উচ্চ রক্তচাপের ঝুঁকি ৩৫ শতাংশ বেশি। ২০২৩ সালে প্রকাশিত ‘বাংলাদেশের গ্রামীণ নারীদের উচ্চ রক্তচাপের সঙ্গে রান্নার জ্বালানি ব্যবহারের সম্পর্ক’ শীর্ষক গবেষণায় এই চিত্র উঠে আসে। গবেষণাটিতে উচ্চ রক্তচাপ ছাড়াও নারীরা আরও নানা ধরনের রোগে আক্রান্ত হচ্ছেন বলে উল্লেখ করা হয়।
বেসরকারি সংস্থা মানুষের জন্য ফাউন্ডেশনের পরিচালক (রাইটস অ্যান্ড গভর্ন্যান্স) বনশ্রী মিত্র নিয়োগী জানান, রান্নাঘরে দীর্ঘ সময় লাকড়ি, তুষ, পাতা, শুকনা গোবর ইত্যাদি দিয়ে রান্না করার কারণে শুধু শ্বাসতন্ত্রের সমস্যা তৈরি হয়, তা নয়। উদ্বেগের বিষয় হলো, এটি নারীর প্রজনন স্বাস্থ্যে প্রভাব ফেলে; বিশেষ করে গর্ভবতীদের ক্ষেত্রে বিষয়টি অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। এতে গর্ভের শিশুর শ্বাসকষ্টজনিত সমস্যা, বিকাশগত জটিলতা বা জন্মগত নানা স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি হওয়ার আশঙ্কা থাকে। ফলে এটি বড় ধরনের জনস্বাস্থ্য সমস্যা হিসেবে দেখা দেয়।
বনশ্রী জানান, পাতা ও লাকড়ি দিয়ে রান্না নিরাপত্তাঝুঁকিও তৈরি করে। গ্রামীণ বাস্তবতায় দেখা যায়, অনেক নারী; বিশেষ করে একা থাকা কিংবা অসহায় অবস্থায় থাকা নারীরা—জ্বালানি সংগ্রহের জন্য বিভিন্ন জায়গায় যেতে বাধ্য হন। অনেকে বন বা আশপাশের এলাকা থেকে জ্বালানি সংগ্রহ করেন। এই প্রক্রিয়ায় তরুণী বা যুবতী নারীরা আরও বেশি ঝুঁকিতে পড়েন। জ্বালানি সংগ্রহ করতে গিয়ে হয়রানি, অপহরণ কিংবা যৌন সহিংসতারও শিকার হন তাঁরা। অর্থাৎ, জ্বালানি সংগ্রহের মতো একটি সাধারণ কাজও তাঁদের জন্য বড় ধরনের নিরাপত্তাঝুঁকি তৈরি করে। তা ছাড়া জ্বালানি সংগ্রহ করতে গিয়ে নারীদের অনেক সময় ব্যয় হয়, যা তাঁরা চাইলে অন্য কোনো উৎপাদনশীল কাজে ব্যবহার করতে পারতেন।
গবেষণায় দেখা গেছে, গ্রামের নারীরা রান্নার কাজে মোট আট ধরনের জৈব জ্বালানি ব্যবহার করেন। সেগুলো হলো গাছের কাঠ, ডালপালা, ধানের তুষ, শুকনা পাতা, গোবর, পাটখড়ি, খড় এবং পাটখড়ির ওপর শুকনা গোবরের প্রলেপ দিয়ে তৈরি বিশেষ জ্বালানি। একজন নারী টানা এক ঘণ্টার বেশি ধোঁয়াযুক্ত রান্নাঘরে অবস্থান করলে তাঁর উচ্চ রক্তচাপ বাড়তে থাকে। সকাল, দুপুর ও রাত মিলিয়ে গড়ে একেকজন নারী ৩ ঘণ্টা ১৭ মিনিট রান্নাঘরে ব্যয় করেন। এতে রক্তচাপ বাড়ার পাশাপাশি মেজাজ খিটখিটে থাকা, হঠাৎ রেগে যাওয়া, চোখ জ্বালাপোড়া করা এবং ডায়াবেটিসের সমস্যা তৈরি হয়।
গ্রামীণ নারীদের জীবন কিছুটা সহজ করতে ‘বন্ধু চুলা’ স্থাপনে উদ্বুদ্ধ করছে জাতিসংঘের নারীবিষয়ক সংস্থা ইউএন উওমেন। তাদের ‘ক্ষমতায়ন: জলবায়ুসহিষ্ণু সমাজের জন্য নারী’ প্রকল্পের আওতায় তারা জ্বালানি সংকট নিরসনে ও নবায়নযোগ্য জ্বালানি ব্যবহার বৃদ্ধিতে নারীদের সচেতনতায় কাজ করছে। এর পরিপ্রেক্ষিতে জামালপুরের দেওয়ানগঞ্জের চুকাইবাড়িতে ৩০ জন প্রান্তিক নারীকে বন্ধু চুলা স্থাপন করে দেওয়া হয়েছে। এ চুলায় ধোঁয়াজনিত সমস্যা অনেকটাই কম; এ ছাড়া জ্বালানি সাশ্রয় এবং পরিবেশদূষণ কম হয়।
দেওয়ানগঞ্জের গৃহবধূ মোসাম্মাত শারমিন বেগম জানান, তিনি পাঁচ মাস ধরে বন্ধু চুলা ব্যবহার করছেন। আগে দিনে দুই বস্তার বেশি শুকনা পাতা দরকার হতো তাঁর। এখন এক বস্তা পাতায় দিনের রান্না শেষ করতে পারছেন শারমিন। তবে এই চুলায় রান্নাঘরের মধ্যে ধোঁয়া জমে থাকে না। তাই শ্বাসকষ্ট থেকে মুক্তি মিলেছে বলে জানান এই গৃহবধূ।